সুরা অাল্ কাহাফ-১১০ নং অায়াতের তাফসীর ও হুযুর কারিম (صلى الله عليه و آله وسلم) এঁর বাশারিয়াত।

পোষ্টটি অন্যকে পড়ার সুযোগ করে দিতে শেয়ার করুন প্লিজ।

সুরা অাল্ কাহাফ-১১০ নং অায়াতের তাফসীর ও হুযুর কারিম (صلى الله عليه و آله وسلم) এঁর বাশারিয়াত।

قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ يُوحَىٰ إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَٰهُكُمْ إِلَٰهٌ وَاحِدٌ ۖ
অর্থাৎঃ “আপনি বলুন, বাহ্যিক অবয়বে আমি তোমাদের মত মানুষ, আমার প্রতি প্রত্যাদেশ হয় যে, তোমাদের ইলাহ্ একমাত্র ইলাহ্”।
[সুরা আল্ কাহাফ; ১৮/১১০]।
এ অায়াতখানার বাহ্যিক অর্থ দিয়ে কেউ যুক্তির অবতারণা করে যে, হুযুর আকরাম (صلى الله عليه و آله وسلم)  খাওয়া- পরা, চলা- ফিরা, জীবন- মৃত্যুর দিক হতে আমাদেরই মত সাধারণ মানুষ।
কিন্তু ঈমানী দৃষ্টিতে চিন্তা করলে প্রতীয়মান হয় যে, আয়াতখানা হুযুর আকরাম (صلى الله عليه و آله وسلم)   এর প্রশংসায় ভরপুর। আয়াতখানাকে চারটি দিক হতে ব্যাখ্যা করতে হবে।

প্রথমতঃ এ আয়াতখানার উদ্দেশ্য কি?
দ্বিতীয়তঃ তাঁকে মানুষ ইত্যাদি সাধারণ শব্দ দ্বারা সম্বোধন করা শরীয়ত সম্মত কিনা!
তৃতীয়তঃ শরীয়ত এবং যুক্তি বিজ্ঞান, যে কোন দিক হতে হুযুর বাস্তবিকই কি আমাদের মত মানুষ? যদি না হন, তাহলে আয়াতে مثلكم দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে?
চতুর্থতঃ يوحى الى দ্বারা কি বুঝা গেল?
(১) সমস্ত মু’মিন এবং কাফিররা জানে, হুযুর আকরাম (صلى الله عليه و آله وسلم) মানব জাতিতেই তাশরীফ আনয়ন করেছেন। কাফিররা তো এ কথাই বলে বেড়াত ما انتم الابشر مثلنا অর্থাৎ আপনি আমাদের মত মানুষ ছাড়া আর কিছুই নন। আর মুসলমানদের আক্বিদা বা বিশ্বাস এই যে, হুযুর আকরাম (صلى الله عليه و آله وسلم) নবী এবং নবী আল্লাহর ঐ বান্দাই হয়, যাকে আহকামে শরীয়তের প্রচারের জন্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো হয়। বস্তুতঃ গোটা পৃথিবীই এ সত্যটি জানে এবং মানে। তারপরও এ ধরনের সুষ্পষ্ট জানা- মানা বিষয়টি কুরআনে আবারও এত গুরুত্বের সাথে কেন আলোচিত হলো? উদ্দেশ্য কি?
এর কারণ এই যে, ঈসায়ীরা হযরত ঈসা (আলাইহিস সালাম) এর শুধুমাত্র দুটি মুজিযা দেখেছিল। পিতা ছাড়া জন্ম নেয়া, মৃতকে জীবিত করা এবং রোগীকে ভাল করা। এ দুটি মুজিযা দেখেই তারা তাঁকে আল্লাহর পুত্র বলতে শুরু করল। ইয়াহুদীরা হযরত উজায়ের (আলাইহিস সালাম) এর মধ্যে শুধুমাত্র একটি মুজিযা দেখেছিল। তা হচ্ছে একশত বৎসর পর তাঁর জীবিত হওয়া। আর এতেই তারা তাঁকে আল্লাহর পুত্র বলে ফেললো। এ দিকে মুশরিকরা ফেরেশ্তাগণকে আল্লাহর কন্যা বিশ্বাস করতে লাগল। কেউ আবার জ্বিন এবং আল্লাহর মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক জুড়ে দিল। বস্তুতঃ এ সমস্ত মূর্খরা নবীগণের শক্তিশালী এবং সুন্দর সুন্দর মু’জিযা দেখে তাঁদের মর্যাদা নিরুপণে সীমা অতিক্রম করল। আবার অনেক বেদ্বীন লোক নবীগণকে আমাদের মত সাধারণ মানুষ আক্বিদা পোষণ করে তাঁদের আসল মর্যাদা ক্ষুন্ন করতে লাগল। অথচ ইসলামের আবেদন এই যে মুসলমানগণকে নবীদের মর্যাদাকে তাঁর আসল অবস্থা হতে বাড়ানো কমানো হতে বেঁচে থাকতে হবে। এ সমস্ত পূর্বের কাউমরা তো তাঁদের নবীগণের কয়েকটি মু’জিযা দেখে তাঁদেরকে আল্লাহর পুত্র ইত্যাদি বলতে লাগল। অথচ হুজুর আকরাম (صلى الله عليه و آله وسلم) এর শুধু হাত মুবারাক সত্যের পুঁজারীদের সামনে অনেক মহান মহান মু’জিযা করিয়েছিল। যেমন চাঁদ দু’টুকরা হয়ে গিয়েছিল, এক ইশারায় অস্তমিত সূর্য পুনরায় ফিরে আসলো, তাঁর ইশারায় বৃষ্টি বর্ষিত হতে লাগলো এবং ইশারা পেয়ে আবার বন্ধ হয়ে গেল। সে মহান সত্ত্বার ইঙ্গিত পেয়ে দূরবর্তী দুটি বৃক্ষ একত্রিত হয়ে গেল। কঙ্করসমূহ তাঁর নূরানী হাত মোবারকের ছোঁয়া পেয়ে কালিমায়ে শাহাদাত উচ্চারণ করতে লাগল। শুকনো কাঠ তাঁর বিরহে কান্নাকাটি করলো। সামান্য খাদ্য দিয়েই তিনি বিরাট মুজাহিদ বাহিনীকে পেট ভরে খাইয়েছিলেন। তাঁর আঙ্গুল মুবারক হতে পানির ফোয়ারা প্রবাহিত হয়েছিল। তাঁর ইশারা পেয়ে মৃত জীবিত হয়ে গিয়েছিল। বস্তুতঃ এভাবে অগণিত মু’জিযা প্রকাশ হওয়ার কারণে আশংকা হচ্ছিল, হুজুর আকরাম (صلى الله عليه و آله وسلم) কেও তারা আল্লাহ অথবা আল্লাহর পুত্রই বলে বসে নাকি। এজন্যেই হুযুর আকরাম (صلى الله عليه و آله وسلم) তাঁর প্রত্যেকটি আলাপ আচরণেই আল্লাহর বন্দেগীর কথা প্রকাশ করেছেন এবং কালেমার মধ্যেও উম্মতদেরকে عبده ورسوله পড়িয়েছেন। কুরআনও এই ঘোষণাই দিয়ে বলল- انما انا بشر مثلكم অর্থাৎ ‘আমি তো তোমাদেরই মত মানুষ।’

(২) প্রত্যেক মুসলমানেরই এই আকীদা রয়েছে যে, নবীগণ আল্লাহরই বান্দা আর তাঁর মাহবুব (صلى الله عليه و آله وسلم) এঁর শুভাগমন মানুষের মধ্যেই হয়েছিল। কিন্তু তাই বলে তাঁকে বশর, ভাই, বাবা অথবা ইনসান বা মানুষ বলে ডাকা হারাম, আর যদি কেউ বিদ্রুপ করে এভাবে ডাকে, সে কাফির হয়ে যাবে। (ফতোয়ায়ে আলমগীরী ইত্যাদি) যেমন কুরআন করীমে ইরশাদ হচ্ছে-

وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَن تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنتُمْ لَا تَشْعُرُونَ
অর্থাৎঃ “নিজদিগের মধ্যে যেভাবে উচ্চস্বরে কথা বল, তাঁর সাথে সেভাবে উচ্চস্বরে কথা বল না। কারণ এতে তোমাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে তোমাদের অজ্ঞাতসারে”।
[সুরা হুজরাত, ৪৯/০২]।
আয়াতের মধ্যে স্পষ্ট করে বলা হলো, যে সমস্ত শব্দ দ্বারা অত্যন্ত সাধারণভাবে একে অন্যকে সম্বোধন করা হয়, তা দ্বারা হুজুর আকরাম (صلى الله عليه و آله وسلم) কে সম্বোধন কর না। অন্যথায় তোমাদের সমস্ত আমল তোমাদের অজান্তেই নষ্ট হয়ে যাবে, আর আমল নষ্ট হয় একমাত্র কুফরীর কারণেই। এ জন্য আয়াতখানাকে قل শব্দ দ্বারা শুরু করা হয়েছে। অর্থাৎ হে মাহবুব (صلى الله عليه و آله وسلم) আপনি বিনয় স্বরুপ বলে দিন- আমি তোমাদের মত মানুষ। কিন্তু তাই বলে আমি আল্লাহও আপনাকে বশর বা মানুষ বলে আহ্বান করবো না অথবা কোন মানুষকেও আপনাকে এ শব্দ দ্বারা ডাকার অনুমতি দেয়া হয়নি। এ জন্যই কুরআনে কোথাও হুজুর আকরম (صلى الله عليه و آله وسلم) কে বশর, মানুষ অথবা মু’মিনদের ভাই শব্দ দ্বারা ডাকা হয়নি।
বরঞ্চ
ياايهاالنبى- ياايهاالرسول- ياايهاالمزمل- ياايهالمدثر
অর্থাৎ- হে আমার পয়গাম পৌঁছানে ওয়ালা! হে মহান মর্যাদার অধিকারী! হে বস্ত্রাচ্ছাদিত! হে বস্ত্রাবৃত! ইত্যাদি সম্মানিত শব্দ দ্বারা আহ্বান করা হয়েছে। এখন যখন রাব্বুল আলামীন তাঁকে বশর ইত্যাদি শব্দে ডাকেননি, তখন আমরা গোলামদের কি অধিকার রয়েছে যে, আমরা এ জাতীয় শব্দ দ্বারা তাঁকে স্মরণ করবো। কোন জাগতিক মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তিকেও তো সাধারণ শব্দ দ্বারা সম্বোধন করা তার মর্যাদাকে অস্বিকার করার শামিল। কোন খাঁন বাহাদুর নওয়াব বা কালেক্টর সাহেবকে হে লোক, হে ভাই, ইত্যাদি সম্বোধনকারী শাস্তি প্রাপ্ত হয়। সুতরাং যে সমস্ত নবীগণ আল্লাহ্ হতে মহান খেতাব প্রাপ্ত হয়েছেন, তাঁদেরকে সাধারণ শব্দ দ্বারা সম্বোধনকারী ব্যক্তি বেদ্বীন হয়ে যাবে। যদি কেউ মাতাকে হে আমার পিতার স্ত্রী, হে আমার বোন বলে ডাকে, অথবা পিতাকে হে ভাই, হে ব্যক্তি বলে সম্বোধন করে, তাহলে তাকে বেয়াদব বলা হবে। অতএব হুজুর আকরাম (صلى الله عليه و آله وسلم) কে এ সমস্ত শব্দ দ্বারা সম্বোধনকারী ব্যক্তিকে কেন বেয়াদব বলা হবে না!
এজন্যই অনেক চিন্তাশীল আলেমগণের দৃষ্টিতে কুরআন মজিদের ياايهاالذين امنوا এর মধ্যে হুজুর পাক (صلى الله عليه و آله وسلم) শামিল নেই। এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে।
প্রথমতঃ হুজুর পাক (صلى الله عليه و آله وسلم) কে অন্যের মত সাধারণ শব্দ দ্বারা ডাকা যাবে না। অথচ এটি সাধরণভাবে সবার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।
দ্বিতীয়তঃ অন্যান্য মু’মিনগণ হুজুর পাক (صلى الله عليه و آله وسلم) হতে ঈমান গ্রহণকারী আর হুজুর পাক (صلى الله عليه و آله وسلم) ঈমান প্রদানকারী। এখানে امنوا এর মধ্যে ঈমান গ্রহণকারীদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে।
তৃতীয়তঃ امنوا দ্বারা ঐ সকল লোককেই বুঝানো হয়েছে যারা দুনিয়ায় এসে মু’মিন হয়েছে। অথচ হুজুর পাক (صلى الله عليه و آله وسلم) তো মু’মিন বরঞ্চ নবী হয়েই দুনিয়ায় আগমন করেছেন।
চতুর্থতঃ অন্যান্য মু’মিনগণের উপর শরীয়তের বিধান আসার পর তা ফরয হয়েছে। মু’মিনগণ আবেদ, জাহেদ, নামাযী এবং আহকামের অনুসারী ছিলেন। কুরআন হুজুর পাক (صلى الله عليه و آله وسلم) আমল করার জন্য অবতীর্ণ হয়নি বরঞ্চ আহকামের তাবলীগের জন্যই এসেছেন।
হুজুর পাক (صلى الله عليه و آله وسلم) মি’রাজের রাত্রিতে নামায পড়িয়েছেন এবং নবুয়্যতের প্রকাশের পূর্বেই হেরা গুহায় তিনি নামায আদায় করেছেন। অথচ শরীয়তের বিধান নাযিলও হয়নি।
পঞ্চমতঃ الذين امنوا এর পর এমন বিধানও এসেছে, যেগুলো হুজুর আকরম (صلى الله عليه و آله وسلم) এর উপর জারী হওয়া সম্ভব নয়। যেমন ‘হে ঈমানদাররা! তোমাদের আওয়াজকে আমার মাহবুব (صلى الله عليه و آله وسلم) এর আওয়াজ হতে উঁচু করো না। অথচ হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল (صلى الله عليه و آله وسلم) হতে অগ্রগামী হয়োনা। আর হুজুর পাক (صلى الله عليه و آله وسلم)  যে সমস্ত আহকামের উপর আমল করেছেন, তাও আমাদের একান্ত শিক্ষার জন্যই- যেমন মুসাফির নদী পার হওয়ার জন্যই জাহাজে চড়ে আর ক্যাপ্টেন তাকে পার করাবার জন্যই। মুসাফির ভাড়া পরিশোধ করে জাহাজে উঠে আর ক্যাপ্টেন বেতন নিয়ে জাহাজে উঠে।

(৩) হুজুর আকরম (صلى الله عليه و آله وسلم) নকল (কুরআন হাদীছের অকাট্য দলীল) এবং আকল কোন দিক দিয়েই আমাদের মত নন। নকল অর্থাৎ শরীয়তের দৃষ্টিকোণ হতে তিনি তো আমাদের মত নয়ই- ঈমান, আমল, আহকাম এবং মুয়ালিমাত কোন দিক দিয়েই তাঁর সাথে আমাদের সাদৃশ্য নেইই। যেমন তাঁর কালিমা হচ্ছে اشهد انى رسولالله অর্থাৎ ‘আমি আল্লাহর রাসুল’ আমরা যদি এই কালেমা পড়ি তাহলে কাফির হয়ে যাব। এতে প্রিয় নবী (صلى الله عليه و آله وسلم) এবং আমাদের কালিমার মধ্যে পার্থক্য হলো। আমাদের উপর পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয আর হুজুর পাক (صلى الله عليه و آله وسلم)  এর উপর ছয় ওয়াক্ত। তাঁর উপর তাহাজ্জুদও ফরয ছিল (কুরআন)।
আমাদের জন্য ইসলামের আরকান পাঁচটি অথচ প্রিয় নবী (صلى الله عليه و آله وسلم) এর উপর চারটি। (যাকাত তাঁর জন্য ফরয নয়। শামী, যাকাত অধ্যায়) আমাদের জন্য চারজন পর্যন্ত স্ত্রী হালাল। আর তাঁর জন্য কোন সীমাবদ্ধতা নেই।
আমাদের স্ত্রী আমাদের মৃত্যুর পর পুনঃ স্বামী গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু হুজুর পাক (صلى الله عليه و آله وسلم) এর বিবিগণ তা পারবেন না। (কুরআন) আমাদের মিরাছ (মৃত্যুর পর সম্পত্তি) বন্টিত হবে, কিন্তু হুজুর পাক (صلى الله عليه و آله وسلم) এর মিরাছ বন্টিত হবে না। (হাদীছ) আমরা খোদায়ী বিধানের অধীন, কিন্তু খোদায়ী বিধান প্রিয় নবী (صلى الله عليه و آله وسلم) এর ফরমানেরই নামান্তর মাত্র। তিনিই যা চান হালাল করেন আর যা চান হারাম করেন। এর উপর যথেষ্ট প্রমাণাদি বিদ্যমান।
তিনি আবু খুজাইমার একজনের সাক্ষীকে দু’জনের বরাবর করে দিলেন, খাতুনে জান্নাত ফাতিমা (রাদি আল্লাহু আনহা) এর বর্তমানে হযরত আলী (রাদি আল্লাহু আনহু) এর জন্য তিনি দ্বিতীয় বিবাহ্ হারাম করে দিলেন। এক ব্যক্তির কাফ্ফারা তার নিজের জন্যই হালাল করে দিলেন, ইত্যাদি ইত্যাদি।
হুজুর পাক (صلى الله عليه و آله وسلم)  নিজেই ধারাবাহিক রোজা রাখার ব্যাপারে ইরশাদ করেন,

ايكم مثلى يطعمنى ربى ويسقينى
অর্থাৎঃ তোমাদের মাঝে আমার মত কে আছ? আমাকে তো আমার আল্লাহ্ খাওয়ান, পান করান।”
বসে নফল নামায পাঠকারীদের সম্পর্কে তিনি ইরশাদ করেন-

لكنى لست كاحد منكم
অর্থাৎ “আমি তোমাদের কারও মত নই”।
বস্তুতঃ এ যাবতীয় বিষয় হতে বুঝা গেল হুজুর পাক (صلى الله عليه و آله وسلم) শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকেও তিনি আমাদের মত নন। কেননা হুজুর পাক (صلى الله عليه و آله وسلم) যে সব বিষয়ের উপর ঈমান এনেছেন তা আবার দেখেছেনও। তিনি আল্লাহ্, জান্নাত, জাহান্নাম ইত্যাদি দেখেছেন, তাঁর মি’রাজ হয়েছিল, কিন্তু আমাদের তা হয়নি।
মাওলানা রুমীর ভাষায়-
“আমরা যা কিছু খাই তা প্রস্বাব, পায়খানা ইত্যাদি অপবিত্র জিনিষে পরিণত হয়, আর হুজুর পাক (صلى الله عليه و آله وسلم) যা খান তা আল্লাহর নুরে পরিণত হয়’।
যেমন- মধুপোকা যা খায় তা মধুতে পরিণত হয় আর ভোমরের খাওয়া বিষে পরিণত হয়। হুজুর পাক (صلى الله عليه و آله وسلم) রহমাতুল্লিল আলামীন, আমরা তা নই। হুজুর আকরম (صلى الله عليه و آله وسلم) ঈমান আর আমরা মু’মিন। তাঁর পবিত্র শরীর মুবারকের ছায়া নেই, আমাদের আছে। হুজুর আকরাম (صلى الله عليه و آله وسلم) চলার সময় মেঘ তাঁকে রোদ হতে ছায়া দান করতো, অথচ আমাদের তো এমনতর মর্যাদা নেই। বস্তুতঃ যুক্তি বিজ্ঞানও বলেঃ হুজুর আকরম (صلى الله عليه و آله وسلم) কোন দিক হতেই আমাদের মত নন।
মৌলভী আব্দুল হাই সাহেব তাঁর ‘ফতোয়ায়ে আব্দুল হাই’-র মধ্যে একখানা হাদীছ নকল করে বলেছেন, হুজুর আকরম (صلى الله عليه و آله وسلم)  ইরশাদ করেছেন, আমি আমার আম্মাজানের গর্ভ হতে খোদায়ী কলমের লিখার ধ্বনি শুনতাম। এখন বলুন, কে এমন মহান মর্যাদার অধিকারী হতে পারে? হুজুর পাক (صلى الله عليه و آله وسلم)  আরিফবিল্লাহ্ হয়েই দুনিয়ায় তাশরীফ এনেছেন। আর আমরা জন্ম লাভ করে বহু জ্ঞান অর্জন করার পরও এমনতর মর্যাদায় উপনীত হতে পারি না। এরপরও হুজুর পাক (صلى الله عليه و آله وسلم)  এর সাথে আমাদের তুলনা এবং সামঞ্জস্য কিভাবে? এখন উপরোক্ত আয়াতখানার অর্থ কি?
অর্থ এই যে, হে পিয়ারা মাহবুব (صلى الله عليه و آله وسلم)! আপনি বলে দিন, বাহ্যিক মানবীয় সূরতে আমি তোমাদের মত, নতুবা তোমাদের আর আমার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। শুধু কয়েকটি বাহ্যিক মানবীয় আচার-আচরণে আমি তোমাদের ন্যায়ই। যেমন বাহ্যিকভাবে খাওয়া-দাওয়া চলা-ফেরা, রোগ-শোক হওয়া ইত্যাদি। নতুবা এতদসত্ত্বেও তাঁর অাসল অবস্থা অামাদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। مثلكم দ্বারা এ কথায় বুঝানো হয়েছে, যেভাবে তোমরা নিরেটভাবে আল্লাহরই বান্দা- না তোমরা আল্লাহ্ আর না আল্লাহর কোন গুণ দ্বারা গুনান্বিত। এভাবে আমিও তো আল্লাহরই বান্দা। আমি খোদাও নই অথবা আমার মধ্যে খোদায়ীত্বও নেই। বা আমি আল্লাহর পুত্রও নই বরঞ্চ আমি আল্লাহরই শ্রেষ্ঠ বান্দা এবং সকল বান্দাদের আমি দিশারী। অতএব তোমাদের আর আমার মধ্যে শুধু এদিক দিয়েই সামঞ্জস্য রয়েছে। নতুবা আর কোন দিক দিয়েই নয়।

(৪) يوحي الي দ্বারা ঐ সন্দেহেরই অপনোদন করা হয়েছে, যা مثلكم দ্বারা সৃষ্টি হতে পারতো, অর্থাৎ কেউ হয়তো এ কথা বলে দিতে পারে, হুজুর আকরম (صلى الله عليه و آله وسلم) প্রত্যেক দিক থেকেই আমাদের মত।
সুতরাং ইরশাদ হলো, না বরঞ্চ আমি ওহী প্রাপ্ত আর তোমরা আমার উম্মত বা অনুগামী। ওহী প্রাপ্ত সত্ত্বা উম্মতের মত কি করে হতে পারে! يوحى গুণটি আনার কারণে নবী এবং উম্মতের মধ্যে এমন ব্যবধান সৃষ্টি হয়ে গেল যেমন ‘নাতেক’ বা বাকশক্তি সম্পন্ন বলার কারণে মানুষ এবং অন্যান্য জীবের মধ্যে ব্যবধান সৃষ্টি হয়ে গেল। অতএব বাকশক্তি সম্পন্ন বলার কারণে যায়েদের আসল সত্ত্বা সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে গেল এবং অন্যান্য জীবদের সত্ত্বাও ভিন্ন।
হযরত কেবলায়ে আলম পীর সাইয়্যেদ জামায়াত আলী মুহাদ্দিছ আলীপুরী (রহমাতুল্লহি আলাইহি) বলতেন জাওহার এবং ইনসানের মধ্যে মোট পাঁচ স্তরের ব্যবধান রয়েছে। অর্থাৎ ইনসানের উপর হায়ওয়ান, এর পর ‘জিসমে নামি’ এর পর ‘জিসমে মাতলাক’ এর পর ‘জাওহার’। কিন্তু ‘বশর’ (মানুষ) এবং হুজুর আকরম (صلى الله عليه و آله وسلم) এর মধ্যে সাতাশ স্তর ব্যবধান বিদ্যমান। অর্থাৎ বশরিয়্যত হতে আরও সাতাশ স্তর পার হওয়ার পর প্রিয় নবী (صلى الله عليه و آله وسلم) এর মহান অবস্থান, যার পরে একমাত্র একত্ববাদেরই সর্বোচ্চ মর্যাদা। এখানে আবদিয়্যতের সকল মর্যাদা বিলীন হয়ে গেছে। অর্থাৎ বশরের পর মু’মিন তার পর সালেহ, তার পর শহীদ, তা পর মুত্তাকী, তার পর মুজতাহিদ, তার পর আবদাল, তার পর কুতুব, তার পর কুতুবুল আকতাব, তার পর গাউছ, তার পর গাউছুল আজম ইত্যাদি, এর পর আবার তাবেয়ী, সাহাবী, আনসারী, মুহাজির; তার পর সিদ্দীক, তার পর নবী, তার পর রাসূল, তার পর উলুল আজম পয়গম্বর, তার পর খলীল, তার পর খাতামুন নাবিয়্যিন, এ মর্যাদার উপরও রাহমাতুল্লিল আলামীন তার পর হাবীব তারপরে শানে মুস্তাফা (صلى الله عليه و آله وسلم) এটি একটি মোটামুটি বর্ণনা মাত্র। এখন আমরা সাধারণ মানুষরা যখন নুরের তৈরী ফেরেশতাগণের বরাবর নই, অথচ তাঁরাও জাওহার আর আমরাও জাওহার, শুধুমাত্র পাঁচটি স্তরের ব্যবধান আমাদের উভয়ের মধ্যে বিরাট ব্যবধান সৃষ্টি করে দিয়েছে। তাহলে আমরা হুজুর আকরম (صلى الله عليه و آله وسلم) এর মত হই কিভাবে! অথচ এখানে তাঁর সর্বোচ্চ মর্যাদা আর আমাদের মধ্যে সাতাশ স্তরের ব্যবধান বিদ্যমান।

সূক্ষ্মতত্ত্বঃ কোন না’ত পাঠকারী ডক্টর ইকবালের সামনে নিম্নের না’তটি পাঠ করলো-
“যে মহান সত্ত্বার নাম মুবারাক মুহাম্মাদ (صلى الله عليه و آله وسلم) , তাঁর উভয় জাহান উজালা।”
এ না’ত শুনে ডক্টর ইকবাল বললেন, এর সাথে আমারও দুটি লাইন এভাবে লিখে নাও-
“যে মহান নূরানী সত্ত্বার নাম মুবারাক মুহাম্মাদ (صلى الله عليه و آله وسلم) প্রত্যেক মু’মিন তাঁর প্রেমে মাতোয়ারা। অতএর ইয়া রাসুলুল্লাহ্! আপনি আমাদের জন্য তাকদীর নির্ধারণের কুদরতী কলম হয়ে যান, ‘উম্মী’ তথা আমাদের মূল এবং আমাদের পক্ষে বক্তব্য প্রদানকারী তথা সুপারিশকারী হয়ে যান। আপনি আমাদের গুণাহ মার্জনার তাদবীর হয়ে যান। তবেই আমাদের কামিয়াবী। যার নাম মুবারাক মুহাম্মাদ (صلى الله عليه و آله وسلم)  প্রত্যেক মু’মিন তাঁর প্রেমে মাতোয়ারা। মুহূর্তে আরশে আপনার গমন, আবার মুহূর্তেই জমিনে অবতরণ, আপনি পবিত্র মক্কার সূর্য, দুনিয়ার আলোকবর্তিকা। যে পবিত্র সত্ত্বার নাম মুবারাক মুহাম্মাদ (صلى الله عليه و آله وسلم)  প্রত্যেক মু’মিন তাঁর জন্য মাতোয়ারা।”

তাফসীর রুহুল বায়ান ষোল পারার শুরুতে সূরা মরিয়মের كهيعص এর ব্যাখ্যায় বলা হচ্ছে, হুজুর পাক (صلى الله عليه و آله وسلم) এর তিনটি সুরত ছিল। প্রথম বশরী বা মানবীয়, যার বর্ণনা উপরোক্ত আয়াতে এসেছে। দ্বিতীয় হাক্কী এ সম্পর্কে হুজুর (صلى الله عليه و آله وسلم) নিজেই ইরশাদ করেন- من راني فقد راي الحق অর্থাৎ যে আমাকে দেখেছে সে হককেই দেখেছে। তৃতীয়তঃ মালাকী বা ফেরেশতার সুরত।
যেমন হুজুর (صلى الله عليه و آله وسلم) ইরশাদ করেছেন-
لى مع الله وقت ….
অর্থাৎ ‘অনেক সময় আল্লাহর সাথে আমার এমন অবস্থা অতিবাহিত হয় যে, সে পর্যন্ত কোন ফেরেশতা বা নবীও পৌঁছতে পারে না।’
মোট কথা, বিশ্লেষণী দৃষ্টিতে এ আয়াতখানি হুজুর আকরম (صلى الله عليه و آله وسلم)  এর নানা প্রশংসায় ভরপুর।

হযরত শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী রহমাতুল্লহি আলাইহি তাঁর ‘মাদারেজুন নবুয়্যত’ কিতাবের তৃতীয় অধ্যায়ে ইরশাদ করেছেন, যে সমস্ত আয়াত দ্বারা হুজুর আকরম (صلى الله عليه و آله وسلم) কে আমাদের মত বলে মনে হয়, এগুলো ‘মুতাশাবেহাত’ অস্পষ্ট আয়াতের মতই।
যেমন- পরওয়ারদিগারে আলম স্বীয় নূরের দৃষ্টান্ত প্রদীপের সাথে দিয়ে বলেছেন- كمشكوة فيها مصباح অর্থাৎ ‘যেন একটি দীপাধার যার মধ্যে অাছে এক প্রদীপ। এতে এখন কেউ একথা বলতে পারে না যে, আল্লাহর নূর প্রদীপের মতই আলো। অতএব এমন কথাও কেউ বলতে পারবে না যে, হুজুর আকরম (صلى الله عليه و آله وسلم) অামাদের মতই বশর বা মানুষ।
দেওবন্দ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মৌলভী কাসেম নানুতভী বলেন-
‘ইয়া রাসুলুল্লাহ্ (صلى الله عليه و آله وسلم), আপনার অাসল সৌন্দর্য মানবীয় পর্দা দ্বারা ঢাকা রয়েছে। আর আপনাকে আল্লাহ্ ভিন্ন কেউই বুঝতে পারেনি।’
অর্থাৎ হুজুর আকরম (صلى الله عليه و آله وسلم) হচ্ছেন নূর অার নূরকে অবলোকন করার মত শক্তি মানুষের মধ্যে নেই। যেমন সূর্যের প্রতি মানুষ তাকাতে পারে না। কিন্তু যখন হালকা মেঘ এসে সূর্যকে আড়াঁল করে রাখে, সে মেঘের আড়াঁলে মানুষ তাকে কিছুটা দেখে নেয়। ঠিক তদ্রুপই নূরনবী (صلى الله عليه و آله وسلم) এর নূর মোবারককে দেখাবার জন্য তাঁকে মানবীয় আবরণ বা পোষাক পরিধান করানো হয়েছে। নতুবা তাঁর আসল সত্ত্বা আল্লাহ্ ভিন্ন আর কেউ-ই দেখেনি।
সূফীয়ানে ক্বিরামের পরিভাষায় ‘বশর’ হুজুর আকরম (صلى الله عليه و آله وسلم) এর প্রশংসাই। কেননা বশরের অর্থ হচ্ছে আল্লাহর কুদরতী হাত দ্বারা বিশেষভাবে যাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। ‘মুবাশারাত বিল্ইয়াদ’ হতে বশর শব্দটি বের হয়েছে। গোটা আলম ফেরেশতাগণের দ্বারা বানানো হয়েছে। কিন্তু হযরত আদম (আলাইহিস সালাম) কে রাব্বুল আলামীন নিজেই আপন কুদরতের হাত দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। অতএব বশরিয়াত হচ্ছে উঁচুমানের শিল্পকর্ম। আল্লাহ্ শয়তানকে বললেন- مالك ان لاتسجد لما خلقت يبدى অর্থাৎ তোমার কি হলো যে তুমি সিজদা করছো না অথচ আমি তাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছি।
অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে-

لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ
‘নিশ্চয় আমি মানুষকে সুন্দরতম গঠনে সৃষ্টি করেছি।’
[সুরা আত্ ত্বীন, ৯৫/৪]।
আর এজন্যই মুমিনের ক্বলবকে আল্লাহর তাজাল্লীর স্থান বানানো হয়েছে।
কবির ভাষায়ঃ
“পবিত্র কাবা সাইয়িদুনা হযরত ইব্রাহীম খলীল (আলাইহিস সালাম) এর তৈরিকৃত আর দিল আল্লাহ তাআলার তাজাল্লীর প্রকাশস্থল। অতএব হাজার হাজার কা’বা হতে একটি দিল অনেক শ্রেষ্ঠ। কিন্তু যেহেতু আমরা গুনাহ দ্বারা বশরিয়াতের এ মহান মর্যাদাকে অপবিত্র করে দিয়েছি। এজন্য শব্দটি প্রায়ই বদনামের মতই হয়ে গেছে এবং নবীগণকে এ শব্দে স্মরণ করতে আমাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে।

তোতা পাখিকে কথা বলা শিক্ষা দেয়ার পদ্ধতি এই যে, তার সম্মুখ বরাবর একটি আয়না রেখে আয়নার পেছন হতে মানুষ নিজেই কথা বলতে থাকে। আর তোতা এ আওয়াজকে স্বজাতির আওয়াজ ধারণা করে নিজেও বলতে আরম্ভ করে। হুজুর আকরম (صلى الله عليه و آله وسلم) আল্লাহর কুদরতের আয়না, আল্লাহ্ এবং আমাদের মাঝখানে যদি এ আয়না না থাকতো, তবে বান্দারা আল্লাহর ফায়েজ হাসিল করতে সক্ষম হতো না, এ অায়নার দুটি দিক রয়েছে। একটি দিক বান্দার দিকে অন্যটি আল্লাহর দিকে। বান্দার দিকের আহ্বান হচ্ছে انما انا بشر مثلكم অর্থাৎ তোমরা আমা হতে পালাইও না। আমি তোমাদেরই মত। আর আয়নার আল্লাহর দিকের আহ্বান হচ্ছে-
وَمَا يَنطِقُ عَنِ الْهَوَىٰ
এবং তিনি কোন কথা নিজের থেকে বলেন না।
إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَىٰ
(যা বলেন) তা তো ওহীই, যা তার প্রতি  (নাযিল) করা হয়।
[সুরা আন্ নজম; ৫৩/৩-৪।]।
মাওলানা রুমী বলেন, “মাহবুবে খোদা (صلى الله عليه و آله وسلم) বললেন, আমি আমার বন্ধুর (আল্লাহ) স্বচ্ছ আয়না। তুর্কী হিন্দি সবাই আমার মধ্যে তারা নিজেকেই দেখে।
আ’লা হযরত রহমাতুল্লহি আলাইহি বড়ই চমৎকার বলেছেন-
“ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনার মূল নূরানী সত্ত্বাকে খোদায়ী আয়নার পর্দার আড়ালে রেখেই আপনাকে উম্মিদের মাঝে পাঠানো হয়েছে হিদায়তের আলোকবর্তিকা স্বরুপ।”
সুবহানাল্লাহ্, কি চমৎকার!

পোষ্টটি ভালো লেগে থাকলে আপনার মূল্যবান মতামত জানান প্লিজ!

Leave a Comment