শরীয়ত, ত্বরীক্বত, মা’রিফাত ও হাক্বীক্বতে সমৃদ্ধ সিলসিলার মহান শায়খ হযরত আল্লামা সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটী

পোষ্টটি অন্যকে পড়ার সুযোগ করে দিতে শেয়ার করুন প্লিজ।

মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান

ভূমিকা
আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর সৃষ্টির সেরা মানব জাতিকে শ্রেষ্ঠত্ব ও পরিপূর্ণতার স্তরে পৌঁছানোর জন্য নবীকুল শ্রেষ্ঠ, রসূলকুল সরদার ও আল্লাহ্ তা‘আলার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি, আমাদের আক্বা ও মাওলা হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে শ্রেষ্ঠতম দ্বীন ইসলাম দান করেছেন। এ দ্বীনের যাহেরী (বাহ্যিক) দিক ‘শরীয়ত’কে সুন্দর ও সাবলীলভাবে প্রতিষ্ঠা করে যাচ্ছেন এ দ্বীনের দক্ষ ও নিষ্ঠাবান ওলামা-ই কেরাম। আর এর বাত্বেনী (আত্মিক/অভ্যন্তরীণ) দিক ‘ত্বরীক্বত’, ‘মা’রিফাত’ ও ‘হাক্বীক্বত -এর যথাযথ দীক্ষা দিচ্ছেন ও প্রতিষ্ঠা করে যাচ্ছেন হক্বক্বানী- রব্বানী পীর-মাশাইখ, আউলিয়া কেরাম। হযরত আল্লামা সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি আলায়হির রাহমাহ্ তেমনি এক মহান ওলী।

শরীয়ত মানুষের যাহেরী অবস্থাকে সংশোধন তথা সৌন্দর্যম-িত করে আর ত্বরীক্বত ওই সৌন্দর্যম-িত মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। আর তাঁদেরই বিশেষ দীক্ষার ফলে ওই সৌভাগ্যবান মানুষ ‘মা’রিফাত’ ও ‘হাক্বীক্বত’র বিশেষ মর্যাদায় উন্নীত হন। ফলে একজন শরীয়তের অনুসারী ও তরীক্বত ইত্যাদির সাধনাকারী ব্যক্তি ‘কামিল’ (পূর্ণ-মর্যাদাবান) মানুষে পরিণত হন। তাই, প্রতিটি মানুষের জন্য শরীয়তের শিক্ষা ও চর্চা যেমন জরুরী, তেমনি ত্বরীক্বত গ্রহণ ও অবলম্বন করে এগিয়ে যাওয়া অপরিহার্য।

ইসলামের প্রকৃত ও সঠিক রূপরেখা ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জমা‘আত’ (সংক্ষেপে সুন্নী মতাদর্শ)। উপরিউক্ত কারণে এ মতাদর্শ শরীয়ত, তরীক্বত, মা’রিফাত ও হাক্বীক্বত সব ক’টির প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেয়। সুতরাং ইসলামের সৌন্দর্য এবং আল্লাহ্ ও তাঁর হাবীবের নিকট গ্রহণযোগ্যতা কারো মধ্যে তখনই অর্জিত হয়, যখন তিনি সুন্নী আক্বীদা পোষণ করে শরীয়তের অনুসরণ ও তরীক্বতের অনুশীলন করেন, তারপর মা’রিফাত ও হাক্বীক্বতের পথে সঠিকভাবে অগ্রসর হয়ে সফলতা অর্জন করেন। সুখের বিষয় যে, মুসলিম সমাজে ইসলামের এ পূর্ণাঙ্গ অবয়ব সর্বত্র দীর্ঘকাল যাবৎ আলোকোজ্জ্বলভাবে বিরাজিত হয়ে আসছে। এখনো দুনিয়ার অনেকাংশে ইসলামের এ মহিমা বিদ্যমান। অবশ্য মহাকালের ¯্রােতে কোন কোন স্থানে এর ব্যত্যয়ও ঘটছে বৈ-কি। আমাদের সমাজে এমনটিও পরিলক্ষিত হয়ে এসেছে যে, কিছুলোক ইসলামের গণ্ডি ও সুশীতল ছায়ায় আসা থেকে বঞ্চিত। আর যারা ইসলামের গ-িতে মুসলিম সমাজের অর্ন্তভুক্ত হয়েছে তারাও তিন ধরনের দেখা যায়ঃ
১. যাঁদের আক্বীদাও বিশুদ্ধ, আমলও বিশুদ্ধ। তাঁরা হলেন প্রকৃত অর্থে সুন্নী মুসলমান। ২. আরেক শ্রেণীর মুসলমান এমনই দেখা যায়, যারা সুন্নী আক্বীদা পোষণ করে; কিন্তু আমলের ব্যাপারে উদাসীন, আর ৩. তৃতীয় প্রকারের মুসলমান, যারা আমলের উপর খুব জোর দেয়; কিন্তু তাদের আক্বীদায় যথেষ্ট ত্রুটি পরলক্ষিত হয়। এমতাবস্থায় ইসলামী আক্বীদা, শরীয়তের অনুশীলন এবং সহীহ্ তরীক্বতের শিক্ষা ও দীক্ষা দিয়ে প্রকৃত মু’মিন মুসলমান হিসেবে গড়ে তোলার মতো দ্বীনী পথ-প্রদর্শকের উপস্থিতি যে আল্লাহর মহা নি’মাতই, তাতে সন্দেহ নেই। আমাদের মহান মুর্শিদ, সিলসিলাহ্-ই আলিয়া ক্বাদেরিয়া সিরিকোটিয়ার মহান শায়খ পীরে কামিল, মুর্শিদ-ই বরহক হযরতুল আল্লামা সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটী আলায়হির রাহমাহ্ এমনই এক মহান দ্বীনী পথ-প্রদর্শক। তিনি একাধারে সুন্নী আক্বীদার প্রবাদ পুরুষ, শরীয়তের এক দক্ষ আলিমে দ্বীন ও দ্বীনী শিক্ষা প্রসারের পথিকৃত, পীর-ই ত্বরীক্বত এবং আল্লাহ্র এক মহান ওলী। তিনি এ উপমহাদেশে বরং সুন্নী দুনিয়ায় সহীহ্ আক্বীদা (সুন্নী আক্বীদা) সমৃদ্ধ এবং শরীয়ত ও ত্বরীক্বতের অনন্য সমন্বিত ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠায় এক যুগান্তকারী অবদান রেখেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত আদর্শের মত শরীয়ত ও ত্বরীক্বতের এমন সমন্বয় অন্যত্র খুব কমই দেখা যায়। তাই, যাঁরা তাঁর সান্নিধ্যে গেছেন এবং তাঁর তরীক্বতের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অকল্পনীয় আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ ও পার্থিব উন্নতি আজ সর্বজন স্বীকৃত। এর কারণাদিও সুস্পষ্ট। হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটী আলায়হির রাহমাহ্ একদিকে আল্লাহর হাবীব-ই করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর বংশধর, নজীবুত্ব তরফাঈন হয়ে বেলায়তের উচ্চাসনে সমাসীন হয়েছেন, অন্যদিকে তিনি যে-ই ত্বরীক্বায় সম্পৃক্ত সেটার ‘শাজরা’ও নিখুঁতভাবে নবী-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। স্বর্ণের খনি থেকে স্বর্ণই পাওয়া যায়।

জন্ম
হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটী আলায়হির রাহমাহ ১৮৫৬ সালে পাকিস্তানের উত্তম-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের হাজারা জিলার সিরিকোট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পিতার দিক দিয়ে হাসানী এবং মাতার দিক দিয়ে হোসাঈনী। তাই তিনি নজীবুত্ব ত্বরফাঈন। তাঁর বংশ-পরম্পরা হযরত ইমাম হাসানা ও ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা হয়ে রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছে। সুতরাং তিনি রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম- এর ৩৮তম অধস্তন বংশধর। [সূত্র. শাজরা শরীফ, আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট কর্তৃক প্রকাশিত]

ইমাম হোসাঈন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর পঞ্চম অধস্তন বংশধর সৈয়্যদ রিজাল রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি মদীনা পাক থেকে ইরাকের ‘আউস’-এ চলে আসেন। পরবর্তীতে তাঁর ৫ম অধস্তন বংশধর সৈয়্যদ মুহাম্মদ গেসূ দরায সুলতান মাহমূদ গযনভীর সময়ে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে আফগানিস্তানে হিজরত করেন এবং তাঁর সাথে ভারত অভিযানেও শরীক হন। আফগান-বেলুচিস্তানের সীমান্তের ‘কোহে সুলায়মানী’তে তিনি শায়িত আছেন। এ জায়গাটা তিনি সুলতান মাহমূদ গযনভীর উপহার হিসেবে লাভ করেছিলেন। এখান থেকে তিনি সুদূর মুলতান পর্যন্ত ইসলামের দাওয়াত ছড়িয়ে দিয়ে ৪২১ হিজরীতে ওফাত বরণ করেন। উল্লেখ্য যে, এ সময়টা ছিলো হযরত খাজা গরীব নাওয়ায মুঈন উদ্দীন চিশ্তী আলায়হি রাহমাহর ভারত আগমনের দু’শ বছর আগের। এ হযরত গেসূ দরায (আউয়াল)-এরই দ্বাদশ অধস্তন পুরুষ হলেন সিরিকোট বিজয়ী (ফাতিহে সিরিকোট) হযরত সৈয়্যদ গফূর শাহ্ ওরফে কাফূর শাহ্ রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি।  [সূত্র. Local Govt: (Ref-15) Hazara 1871 ]
তিনি (হযরত সৈয়্যদ গফূর শাহ্) আফগানিস্তানের ‘কোহে সুলায়মানী’ হতে হিজরত করে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের ‘কোহে গঙ্গর’-এ আসেন এবং অত্যাচারী শিখ রাজাদের প্রতিহত করে ওই এলাকাকে ইসলামের জন্য আবাদ করেন। এর বর্তমান কেন্দ্রস্থল হচ্ছে ‘সিরিকোট’। ‘সিরিকোট’ নামকরণের কারণ হলো- ‘সর’ মানে মাথা বা চূড়া, আর ‘কোহ’ মানে পাহাড়। জায়গাটা হলো ‘সর-ই কোহ্’ অর্থাৎ পাহাড়ের চূড়া। এতদ্ঞ্চলে ইসলামের এ মহান প্রচারক বীরপুরুষ হযরত সৈয়্যদ গফূর শাহ্ ওরফে কাফূর শাহ্ আলায়হির রাহমাহ্ পাহাড়ের একদম চূড়ায় বসবাস করতেন। তাই তাঁর আবাসস্থল বুঝাতে ‘সরকোহ্’ শব্দটি ব্যবহার করা হতো। কালের বিবর্তনে মানুষের মুখে শব্দ পরিবর্তনের স্বাভাবিক ধারায় বর্তমানে ওই এলাকা ‘সিরিকোট’ নামে প্রসিদ্ধ হয়েছে। ফাতেহে সিরিকোট সৈয়্যদ গফূর শাহ্ আলায়হির রাহমার ১৩শ অধস্তন পুরুষ হযরত সৈয়্যদ সদর শাহ্ আলায়হির রাহমার শাহযাদা হলেন এ গ্রন্থে আলোচিত শাহানশাহ্-এ সিরিকোট হযরত আল্লামা সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটী আলায়হির রাহমাহ্। [সূত্র. শাজরা শরীফ, আনজুমান ট্রাস্ট]

শিক্ষা
অতি অল্প বয়সে তিনি পবিত্র ক্বোরআন হিফয (মুখস্থ) করে নেন। এরপর তিনি ইলমে ক্বিরাআত, ফিক্বহ্, আক্বাইদ, দর্শন (মানত্বিক), তাফসীর এবং হাদীস শরীফ ইত্যাদি বিষয়ে বুৎপত্তি অর্জন করেন। তিনি ১৮৮০ ইংরেজি সালে প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি স্বরূপ ‘ফাযিল সনদ’ লাভ করেন। তাঁর সনদে লিখিত হিজরী সন হিসেবে ১২৯৭ হিজরী এবং শা’বান মাস উল্লেখ করা হয়েছে। তারপর তিনি ভারতে গিয়ে সেখানকার প্রসিদ্ধ মাদরাসাগুলো থেকে দ্বীনী বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা লাভ করেন। আরেক বর্ণনা অনুসারে ১২৯৭হিজরীর শা’বান মাসে তাঁকে ‘মুমতাযুল মুহাদ্দিসীন’ হিসেবে ‘দস্তারে ফযীলত’ বা পাগড়ি ও সনদ প্রদান করা হয়েছিলো।

দাম্পত্য জীবন
শাহানশাহে সিরিকোট ১৮৮০ থেকে ১৯১১ ইংরেজির মধ্যবর্তী এক শুভ মুহূর্তে মাশওয়ানী সৈয়দ বংশে এক মহীয়সী মহিলাকে শাদী করেন।
শাহানশাহে সিরিকোটের ঔরশে দু’ মহান ওলী সন্তান জন্ম গ্রহণ করেনঃ হযরত সৈয়্যদ মুহাম্মদ সালেহ্ শাহ্ এবং হযরত সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ আলায়হির রাহ্মাহ। হযরত সৈয়্যদ মুহাম্মদ সালেহ্ শাহ্ ১৯২৫ ইংরেজিতে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ১৯২৮ ইংরেজি সালে ওফাত বরণ করেন। হযরত সৈয়্যদ মুহাম্মদ সালেহ্ শাহ্র ঔরশজাত কোন সন্তান নেই। হযরত সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ আলায়হির রাহমাহ্র ঔরসে বর্তমান হুযূর কেবলা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তাহের শাহ্ এবং হযরত সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ্ মুদ্দাযিল্লুহুল আলী জন্মগ্রহণ করেন। ইতোপূর্বে হুযূর কেবলার বংশীয় শাজরায় তাঁদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

বায়‘আত গ্রহণ ও পীরের দরবারে নজিরবিহীন খিদমত
আফ্রিকা থেকে ফিরে এসে ১৯১২ ইংরেজিতে হযরত সিরিকোটী আলায়হির রাহমাহ্ প্রখ্যাত ওলী-ই কামিল উলূম-ই ইলাহিয়্যার ধারক, মা‘আ-রিফ-ই লাদুন্নিয়ার প্রসবণ হযরত খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হির বরকতময় হাতে বায়‘আত গ্রহণের সুন্নাত পালন করেন।
বায়‘আত গ্রহণের পর থেকে তিনি আপন মুর্শিদের খিদমতে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯১২ ইংরেজি সনে তিনি হযরত চৌহরভীর মসজিদ নির্মাণের কাজে আর্থিকসহ বিভিন্ন বিষয়ে অংশ গ্রহণ করেন। তাছাড়া, উল্লেখ যে, হযরত সিরিকোটী আলায়হির রাহমাহ্ নিজের উপার্জিত অর্থে আফ্রিকার প্রথম মসজিদটা নির্মাণ করেছিলেন। তিনি নিজের অর্থে আরো বহু মসজিদ নির্মাণ করেন। তন্মধ্যে একটি হরিপুর বাজারে রয়েছে। তাছাড়া, তিনি নিজ বাড়ি সিরিকোট দরবারের জামে মসজিদটিও তাঁর অর্থে নির্মাণ করেন ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে। ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে হযরত চৌহরভী হরিপুর বাজারে ‘দারুল উলূম ইসলামিয়া রহমানিয়া’ (মাদ্রাসা) প্রতিষ্ঠা করেছেন। এ মাদরাসার যাত্রার সূচনাকাল থেকেই হযরত সিরিকোটী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি এ যুগান্তকারী মহান কাজের সাথে সম্পৃক্ত হন এবং তাঁর হাতেই এ প্রতিষ্ঠান বিশাল মারকায হিসেবে পূর্ণতা লাভ করেছে। হযরত চৌহরভীর ওফাত শরীফের পর এ মাদরাসার পরিচালনার দায়িত্ব হযরত সিরিকোটীর হাতে অর্পিত হয়েছিলো। ওই মাদরাসা প্রশংসনীয় অবস্থানে রয়েছে। এ দ্বীনী প্রতিষ্ঠান থেকে বুযুর্গ ও দক্ষ ওলামা বের হয়ে আসছেন।

শাহানশাহে সিরিকোটের অসাধারণ মুর্শিদ-ভক্তি
মুর্শিদে বরহক্ব হযরত খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী আলায়হির রাহমার বরকতম-িত দরবার শরীফের লঙ্গরখানা এবং এ রহমানিয়া মাদরাসার হোস্টেলের রান্নাবান্নার জন্য লাকড়ির স্বল্পতা ছিলো। হযরত সিরিকোটী আলায়হির রাহমাহ্ নিজ বাড়ি সিরিকোটের পাহাড় থেকে সারাদিন লাকড়ি যোগাড় করতেন এবং দিবাশেষে ১৮ মাইল দূরের চৌহর শরীফে নিয়ে যেতেন নিজের কাঁধে বহন করে। এভাবে কয়েকদিন তিনি এমন কঠোর শারীরিক পরিশ্রম করেছেন বরকতময় দরবার ও মাদরাসার সেবায়। নিজের বংশ মর্যাদা, সামাজিক প্রতিপত্তি, যশখ্যাতি ও প্রতিষ্ঠাকে তুচ্ছজ্ঞান করে এ যুগশ্রেষ্ঠ আলিম-ই দ্বীন এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী নিজ আমিত্বকে বিলীন করে দিয়েছেন।

অথচ তাঁর প্রাণাধিক প্রিয় পীর-মুর্শিদ কখনো তাঁকে এ কঠিন কাজটি করার নির্দেশ দেননি বরং আপন ফানাফিশ্ শায়খ মুরীদের এ কঠোর পরিশ্রম তথা সাধনার কথা জানতে পেরে তাঁকে স্নেহভরে মৌখিকভাবে তা করতে বারণ করে দেন। মুরীদ হযরত সিরিকোটীর যা’তে আর এ কষ্টটুকু করতে না হয়, তজ্জন্য একটি অলৌকিকভাবে ব্যবস্থাও হয়ে যায়। তা হয়েছে এভাবে যে, এর মাত্র কয়েকদিন যেতে না যেতে তাঁর কাঁধে আকষ্মিকভাবে একটি ফোঁড়া দানা বেঁধে যায়। সেটার আরোগ্য হতে লাগলো দীর্ঘ নয় মাস। ইতোমধ্যে তিনি অনিচ্ছা সত্ত্বেও এ কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। বলাবাহুল্য, এরই মাধ্যমে হযরত সিরিকোটী আলায়হির রাহমাহ যে আধ্যাত্মিকতায় আরো পূর্ণতায় পৌঁছে গেছেন, তা সহজে অনুমেয়। নিঃসন্দেহে তাঁর এ সাধনা নিষ্ঠাপূর্ণ তরীক্বতপন্থীদের জন্য অনন্য শিক্ষাও। তিনি তাঁর মুর্শিদের সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে আল্লাহ্ ও রসূলের সন্তুষ্টি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। আরো উল্লেখ্য যে, হযরত সিরিকোটীর ঘাড় শরীফ ওই ফোঁড়া আরোগ্য লাভ করলেও ওই স্থানে একটা গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়ে যায়। এ ক্ষত সম্পর্কে তিনি বলতেন, ‘‘ইয়ে মেরে বাবাজী কা মোহর হ্যায়।’’ অর্থাৎ এটা আমার মুর্শিদের প্রদত্ত মোহর।

দ্বীনি খিদমত ও আধ্যাত্মিক সাধনায় কঠিন পরিশ্রমী হযরত সিরিকোটী আলায়হির রাহমাহ্ এক সময় লোকালয় ছেড়ে বন-জঙ্গলে গিয়ে একান্তে রিয়াযত করারও ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। এ জন্য তিনি পীর-মুর্শিদের অনুমতি চেয়েছিলেন। কিন্তু মুর্শিদে বরহক খাজা চৌহরভী আলায়হির রাহমাহ্ তাঁকে সাফ জানিয়ে দিলেন, ‘‘বন-জঙ্গলের কঠিন রিয়াযত বা মুশাহাদাহ্-মুজাহাদার চেয়েও উত্তম হলো মানুষের মধ্যে থেকে দ্বীনের খিদমত করা।’’ সুতরাং সংসার ও লোকালয় বর্জনের অনুমতি না পেয়ে এবার তিনি লাহোর শাহী জামে মসজিদের ইমাম ও খতীবের দায়িত্ব নিতে চেয়েছিলেন এবং আপন মুর্শিদের অনুমতি ও দো‘আ চেয়েছেন। এ জন্যও মুর্শিদে বরহক্ব তাঁকে সম্মতি দিলেন না। কারণ, ওই মর্যাদাপূর্ণ পদে ইতিপূর্বে যিনি ছিলেন, তাঁর এক সাহেবযাদা এ পদের জন্য আবেদন করেছেন। এটা খাজা চৌহরভীর বেলায়তী দৃষ্টি থেকে গোপন ছিলো না। তিনি চাইলেন দায়িত্বটা মরহুম ইমামের সন্তানের হাতে থাকুক। বাস্তবেও তা-ই ঘটলো। তবে হযরত সিরিকোটীর এ আশা অন্যভাবে পূরণ হলো।

দ্বীন, মাযহাব ও তরীক্বতের খিদমতের
উদ্দেশ্যে বার্মাার রেঙ্গুনে গমন
বিগত ১৯২০ ইংরেজিতে হযরত সিরিকোটী আলায়হির রাহমাহ আপন পীর-মুর্শিদের নির্দেশে স্বদেশের মায়া ত্যাগ করে সুদূর রেঙ্গুনে চলে যান। তখন তাঁর বয়স অন্তত তেষট্টি বছর। সেখানে তিনি ১৯৪১ ইংরেজির ডিসেম্বর পর্যন্ত সদয় অবস্থান করেন। সেখানে তিনি সর্বমোট ২১/২২ বছর যাবৎ নিরলসভাবে দ্বীন ও মাযহাবের খিদমত আন্জাম দেন।
বিখ্যাত আ’লা হযরত গবেষক প্রফেসর ড. মাস‘ঊদ আহমদ কৃত. ইফতিতাহিয়্যায়’ বলা হয়, হযরত সিরিকোটি আলায়হির রাহ্মাহ্ আপন পীরের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন। খাজা চৌহরভী হযরত সিরিকোটী আলায়হির রাহমাহকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন ৩০ পারা দুরূদ শরীফ গ্রন্থ মাজমু‘আহ্-ই সালাওয়াত-ই রসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ছাপানোর কাজ এবং দারুল উলূম রহমানিয়ার অসম্পূর্ণ নির্মাণ কাজ সম্পাদন ও পরিচালনার কোন বিহিত ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত রেঙ্গুন (বার্মা) না ছাড়েন। সুতরাং তিনি দীর্ঘ ২১/২২ বছর পরে স্বদেশ (পাকিস্তান)-এ আসেন। আর এরই মধ্যে তিনি ১৯৩৩ইংরেজি সালে এত বড় ও বিশাল (৩০ পারা সম্বলিত) গ্রন্থের প্রথম প্রকাশের ব্যবস্থা রেঙ্গুনে থেকেই করে গিয়েছিলেন। আর রহমানিয়া মাদরাসা (হরিপুর, পাকিস্তান)-এর দ্বিতল ভবন নির্মাণেরও ব্যবস্থা করেন। এমনকি মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকদের আবাসন এবং শিক্ষকদের নিয়মিত বেতন-ভাতার ব্যবস্থাটুকুও তিনি রেঙ্গুন থেকে করেছিলেন। উল্লেখ্য, তাঁর এ বরকমন্ডিত খিদমতে ওই সময়ে বেশীর ভাগ অংশগ্রহণ করে ধন্য হয়েছিলেন রেঙ্গুন প্রবাসী চট্টগ্রামের মুসলমানগণ।

খাজা চৌহরভীর খিলাফত লাভ
১৯২৪ ইংরেজি সালে, অর্থাৎ হযরত সিরিকোটী আলায়হির রাহমাহ্ রেঙ্গুন জীবনের প্রায় শুরুতে হযরত চৌহরভী আলায়হির রাহমাহ্ তাঁকে খিলাফত প্রদান করে শরীয়ত ও তরীক্বতের বিশাল দায়িত্ব অর্পণ করেন। তিনিও আপন পীর-মুর্শিদের প্রদত্ত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন।
হযরত সিরিকোটী আলায়হির রাহমাহ্ ১৯২০ ইংরেজী থেকে ১৯৪১ ইংরেজি পর্যন্ত দীর্ঘ ২২ বছরে হাজার হাজার বার্মিজ নাগরিক এবং বিভিন্ন দেশের প্রবাসীদের মধ্যে দ্বীন-ইসলাম ও ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জমা‘আত’-এর আদর্শ প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি রেঙ্গুনে যাওয়ার পর প্রথমে ক্যাম্পবেলে এবং এরপরে মাওলানা সুলতানের মাদরাসায় শিক্ষকতা এবং এর পরবর্তীতে রেঙ্গুনের বিখ্যাত বাঙ্গালী সুন্নী জামে মসজিদের খতীব ও ইমামের দায়িত্ব পালন করেন। এ মসজিদই ছিলো সেখানে তাঁর দ্বীন ও সুন্নিয়াত প্রচারের কেন্দ্রস্থল। তাঁর এ দ্বীন-প্রচার ও দ্বীনী অসাধারণ খিদমত ১৯৪১ ইংরেজির ডিসেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত ছিলো। তাঁর আকর্ষণীয় নূরানী চেহারা এবং শরীয়ত, তরীক্বত, মা’রিফাত ও হাক্বীক্বত প্রভৃতি বিষয়ে জ্ঞান-গভীরতা লক্ষ্য করে মুসল্লী ও জন সাধারণ ক্রমশঃ তাঁর বরকতম-িত সান্নিধ্যে আসতে শুরু করলো। তিনি প্রথমে কয়েক বছর তাঁর পীর সাহেব ক্বেবলা হযরত খাজা আবদুর রহমান চৌহরভীর শান-মান ও অলৌকিক জ্ঞান ও কারামাত ইত্যাদির আলোচনা করতেন এবং দ্বীন ও মাযহাবের বিভিন্ন বিষয়ে ওয়ায-নসীহত করতেন। ফলে সংশ্লিষ্ট লোকেরা তাঁর বেলায়ত এবং মুর্শিদে কামিলসুলভ বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য অনুধাবন করতে সক্ষম হলো। সুতরাং তারা তাঁর বরকতময় হাতে বায়‘আত গ্রহণের জন্য একান্ত উদ্গ্রীব হয়ে ওঠে। তিনি আপন মুর্শিদের নিকট পত্রযোগে এর অনুমতি চাইলেন। প্রাথমিক পর্যায়ে তাঁর মুর্শিদ হযরত খাজা চৌহরভী আলায়হির রাহমাহ্ তাঁর নিকট একটা রুমাল পাঠালেন। সুতরাং তিনিও ওই রুমালের মাধ্যমে আপন মুর্শিদের পক্ষে বায়‘আত গ্রহণ করতে থাকেন। কিছুদিন পর তাঁকে খিলাফত ও ইজাযত দিয়ে বায়‘আত করার অনুমতি প্রদান করলেন। সুতরাং সেখানে দলে দলে সত্যান্বেষী মানুষ তাঁর হাতে বায়‘আত গ্রহণ করতে থাকে। এভাবে বার্মায়, অতঃপর পাকিস্তান ও বাংলাদেশের অগণিত মানুষ তাঁর হাতে বায়‘আত গ্রহণ করে তরীক্বাহ-ই ক্বাদেরিয়া সিরিকোটিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়ে ধন্য হয়।

দারুল উলূম ইসলামিয়া রাহমানিয়া (চৌহার শরীফ)-এর জন্য অনন্য অবদান
এ দারুল উলূম ১৯০২ইংরেজীতে হযরত খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী আলায়হির রাহমাহ্ প্রতিষ্ঠা করেছেন। হুযূর ক্বেবলা আল্লামা হাফেয ক্বারী সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটী আলায়হির রাহমাহ্ রেঙ্গুন ও বাংলার মুরীদদের সাহায্যে দারুল উলূমটির কাঁচা দালানকে পাকা দো-তলা বিশিষ্ট আযীমুশ্ শান ইমারতে পরিবর্তিত (পুনঃনির্মিত) করে নেন। ছাত্রদের জন্য হোস্টেল এবং শিক্ষকদের জন্য আবাস নির্মাণ করান। শিক্ষকগণ ও অন্যান্য কর্মচারীর জন্য বেতন-ভাতার টাকা প্রতি মাসে রেঙ্গুন থেকে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

মুর্শিদে বরহক্বের নির্দেশ পালনার্থে
রেঙ্গুনে দীর্ঘ ২১/২২ বছরের ঘটনাবলী
হযরত সিরিকোটী আলায়হির রাহমাহ্ একটানা প্রায় ২১/২২ বছর রেঙ্গুনে থেকে যান। এক চিঠির ভাষ্য হলো- শাহানশাহে সিরিকোটী বলেছেন, ‘‘যদি আমি (পাকিস্তান) চলে যেতাম, তাহলে মাদরাসার খিদমত দারুনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবার আশঙ্কা ছিলো।’’ তাছাড়া, মুর্শিদে বরহক্ব তাঁর জীবদ্দশায় এক চিঠির মাধ্যমে দেশে যেতে নিষেধ করে লিখেছিলেন, ‘‘কাজ ছেড়ে স্বদেশে মোটেই আসবে না।’’ সুতরাং আমি বলে দিয়েছিলাম, ‘‘যাবোনা, যদিও বাজী সাহেব (খাজা চৌহরভী)-এর ওফাতও হয়ে যায়, কিংবা আমার কোন সন্তানও মারা যায়। আমি তবুও যাবো না।’’
আল্লাহর ওলীর আশঙ্কা যেমন বাস্তবে রূপ নিয়েছিলো, তেমনি তাঁর প্রতিজ্ঞাও পূরণ হলো। তাঁর রেঙ্গুন প্রবাসের দীর্ঘ সময়ের মধ্যে উক্ত দু’টি দুঃখজনক ঘটনাও ঘটে গিয়েছিলো-
এক. ১৯২৪ ইংরেজিতে হযরত খাজা চৌহরভী আলায়হির রাহমাহ্ ওফাত পেয়ে যান। আর হযরত সিরিকোটী আলায়হির রাহমাহ্ ছিলেন রেঙ্গুনে।
দুই. ইতোমধ্যে তাঁর বড় সাহেবযাদা মৌলভী সৈয়দ মুহাম্মদ সালেহ আলায়হির রাহমাহ্ (৩রা শা’বান, বুধবার, যোহরের সময়) নিউমানিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে ওফাত বরণ করেছিলেন। কিন্তু হযরত সিরিকোটী বাহ্যিক নিয়মানুসারে রেঙ্গুন ছেড়ে পাকিস্তান যাননি। (যদিও ওই দিন আসরের পর হুজুরা শরীফে দরজা বন্ধ করে দিয়ে বেলায়তী ক্ষমতায় ওই সময় পাকিস্তানে গিয়ে আপন ওই সাহেবযাদার জানাযার নামাযে শরীক হয়েছিলেন এবং সেখানে তাঁকে দেখা গিয়েছিলো বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। সেটা ছিলো তাঁর কারামত।)
ওই দু’টি ঘটনা বেলায়তের অকাট্য প্রমাণ। তাঁর অভ্যন্তরীণ উন্নতির ‘হাল’ও এ দু’টি ঘটনা ও বিভিন্ন ঘটনা দ্বারা প্রমাণিত হয়। যে ব্যক্তি দুঃখ-কষ্ট, বিপদাপদ, ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে প্রশান্তি সহকারে অতিক্রম করে যান, তিনিই সফলকাম হন। ১৯২৫ ইংরেজি সালে সাহেবযাদা মৌলভী সৈয়্যদ মুহাম্মদ সালেহ আলায়হির রাহমাহ্র কঠিন রোগের খবর সম্বলিত তারবার্তা যখন রেঙ্গুনে পৌঁছলো, তখন হযরত সিরিকোটী ওই তার বার্তার জবাব এভাবে লিখলেন, ‘‘আমার ¯েœহের পুত্র মুহাম্মদ সালেহের কঠিন রোগের খবর সম্বলিত তারবার্তা এসেছে। আমাকে তলব করা হয়েছে। কিন্তু দুরূদ শরীফ ও মাদরাসা-ই ইসলামিয়ার খিদমতের কারণে যেতে পারছিনা। আমি আমার ব্যাপারটি আল্লাহর দরবারে সোপর্দ করলাম। নিশ্চয় আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের দেখছেন।’’
এরপর সাহেবযাদার দুঃখজনক ওফাতের খবর সম্বলিত আরেক তারবার্তা পৌছলো। মনের অবস্থা কেমন হলো তা’ তো বলার অপেক্ষা রাখেনা; কিন্তু ধৈর্য ও স্থিরতার পায়কর হুযূর ক্বেবলা এর অনেকদিন পর জবাব এভাবে লিখেছেন- ‘‘আমি ১৬ই ফেব্রুয়ারি ১৯৩৫ইংরেজি ২১ শে যিলক্বদ এখান থেকে রওনা হয়ে ২ দিন কোলকাতায় অবস্থান করবো। এরপর মাতৃভূমির দিকে রওনা হয়ে ওরস শরীফ চলাকালেই দরবারে আলিয়ায় হাযির হবো ইনশা-আল্লাহ।
সুতরাং হযরত সিরিকোটী আলায়হির রাহমাহ্ দীর্ঘ ১৬ বছর পর প্রিয় মাতৃভূমি (পাকিস্তান) আসলেন। এরপর আরো প্রায় ২৬ বছর যাবৎ আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে ফুয়ূয বিতরণ করতে থাকেন। তাঁর বরকতময় হাতে অগণিত বিধর্মী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন, আরো অগণিত মানুষ তাঁর বরকতময় হাতে বায়‘আত গ্রহণ করে সিলসিলাহ্-ই ক্বাদেরিয়া আলিয়ায় দাখিল হয়ে ধন্য হয়।

চট্টগ্রামে হুযূর ক্বেবলার তাশরীফ আনয়ন
হুযূর ক্বেবলা শাহানশাহে সিরিকোট হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি আলায়হির রাহমাহ্ ১৯২০ ইংরেজিতে আপন মুর্শিদ-ই কামিলের নির্দেশে পাকিস্তান থেকে বার্মা তাশরীফ নিয়ে যান এবং ১৯৪১ ইংরেজি সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ ২২ বছর সেখানে সদয় অবস্থান করেন। এ সময়ে রেঙ্গুনের হাজার হাজার (বার্মিজ) নাগরিক এবং বর্তমানকার বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আগত কর্মরত প্রবাসীদের মধ্যে অসংখ্য মানুষ তাঁর সান্নিধ্যে এসে অকল্পনীয়ভাবে উপকৃত হতে থাকেন। তাঁদের অনেকে ভিন্ন ধর্ম থেকে ইসলাম গ্রহণ করেন আর অনেকে অন্ধকার জীবন থেকে আলোর দিকে ফিরে এসেছিলেন। রেঙ্গুনের বিখ্যাত বাঙ্গালী মসজিদের ইমামত ও খেতাবতের পাশাপাশি রেঙ্গুন ও রেঙ্গুনের পার্শ্ববর্তী প্রত্যন্ত অঞ্চলেও দ্বীন, মাযহাব ও তরীক্বতের প্রসার ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন হযরত সিরিকোটী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি, যার প্রভাব এখনো সেখানে বিদ্যমান রয়েছে।
এ সময়সীমায় সমগ্র রেঙ্গুনে হযরত সিরিকোটী আলায়হির রাহমাহর অগণিত কারামতের কথা ছড়িয়ে পড়ে। ফলে দলে দলে লোকজন এসে তাঁর কাছ থেকে দুনিয়া ও আখিরাতের অমূল্য নি’মাতরাজি লাভ করে ধন্য হয়। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায় যে, ইমামে আহলে সুন্নাত মুজাহিদে মিল্লাত হযরতুলহাজ্ব আল্লামা গাযী সৈয়্যদ মুহাম্মদ আযীযুল হক শের-ই বাংলা আলক্বাদেরী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি তাঁর রেঙ্গুন সফরের সময় ক্বুত্ববুল আউলিয়া গাউসে যামান হযরতুল আল্লামা সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি সম্পর্কে লোকজনের কাছে জানতে পারলেন। সুতরাং তিনি ওই প্রসিদ্ধ বাঙ্গালী মসজিদে গিয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। এ মহান ওলীর সাথে আমাদের ইমামের ছিলো এটা প্রথম সাক্ষাৎ। দীর্ঘক্ষণ উভয়ের মধ্যে হৃদ্যতাপূর্ণ আলাপ-আলোচনা হলো। বলাবাহুল্য, এ সাক্ষাতে একে অপরের খোদাপ্রদত্ত অসাধারণ যোগ্যতা ও কামালাত সম্পর্কে অবগত হলেন। ওলী-রা ওলী মী-শেনা-সদ। (ওলীকে ওলীই চিনতে পারেন)।

আল্লামা গাযী শেরে বাংলাও হযরত সিরিকোটীর মধ্যে অসাধারণ বেলায়তী ক্ষমতা, তাঁর দ্বীনী ইলমের গভীরতা, ঈমান-আক্বীদার উপর অকল্পনীয় দৃঢ়তা এবং গণমানুষের মধ্যে এর প্রভাব প্রতিষ্ঠা ও প্রসারের প্রতি অস্বাভাবিক আন্তরিকতা ইত্যাদি অবলোকন করে তাঁকে চট্টগ্রামে তাশরীফ নিয়ে আসার জন্য সাদর আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেখানে আগে থেকে ছিলেন চট্টগ্রামের অনেক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি। যেমন- চট্টগ্রামের সংবাদপত্র শিল্পের পুরোধা ‘দৈনিক আজাদী’র প্রতিষ্ঠাতা জনাব আলহাজ্ব মুহাম্মদ আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ার এবং মাস্টার মুহাম্মদ আবদুল জলীলসহ চট্টগ্রামের প্রবাসী মুরীদগণ। তাঁরাও একইভাবে হুযূর ক্বেবলাকে চট্টগ্রামে তাশরীফ নিয়ে আসার জন্য অনুরোধ জানিয়ে আসছিলেন। সুতরাং তিনিও তাতে সম্মতি জানান। তিনি বিগত ১৯৩৫/৩৬ খ্রিস্টাব্দে রেঙ্গুন থেকে পাকিস্তান যাবার পথে চট্টগ্রামে কিছুদিনের জন্য যাত্রা বিরতি করেছিলেন। এ কয়েকদিনের যাত্রা বিরতির ফলে এখানকার ধর্মপ্রাণ মানুষরা এ মহান ওলীর সান্নিধ্য লাভের সুযোগ লাভ করেন। তাঁর নূরানী চেহারা, ওলী সুলভ আখলাক্ব ও বিভিন্ন কারামতের কারণে দলে দলে মানুষ তাঁর হাতে বায়‘আত গ্রহণ করে ধন্য হতে থাকে। ক্রমশঃ তাঁর মুরীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এভাবে ১৯৪১ ইংরেজি সালের শেষের দিকে তিনি রেঙ্গুন থেকে স্থায়ীভাবে এ মিশনের কেন্দ্রস্থল বাংলাদেশের চট্টগ্রামে স্থানান্তর ও স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন।

এ সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিলো। বার্মা ছিলো তখনও অক্ষত। কিন্তু আল্লাহর এ মহান ওলী হযরত সিরিকোটী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি তাঁর অলৌকিক দৃষ্টিতে দেখলেন যে, শীঘ্রই রেঙ্গুন শহর বোমা হামলায় তছনছ হয়ে যাবে এবং অসংখ্য লোকের প্রাণহানি ও সম্পদহানি ঘটবে। সুতরাং তিনি মুরীদান, ভক্তবৃন্দ ও পরিচিত সকলকে দ্রুত রেঙ্গুন ত্যাগের নির্দেশ দেন এবং নিজেও রেঙ্গুন ছেড়ে চলে আসেন। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, হুযূর ক্বেবলা হযরতুল আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ আলায়হির রাহমাহ্র খলীফা হাজী ইসমাঈল বাগিয়া সাহেব জানান, তাঁর আব্বা হাফেয দাঊদ বাগিয়া উক্ত নির্দেশ পেয়ে ৮ ডিসেম্বর ১৯৪১ ইংরেজি তারিখে তাঁর পরিবার নিয়ে রেঙ্গুন ছেড়ে ভারতের লক্ষেèৗতে নিজ এলাকায় ফিরে যান। অন্যরাও চলে যান নিজ নিজ দেশে। সুতরাং ২৩ ডিসেম্বর ১৯৪১ তারিখে রেঙ্গুন শহরে বোমা বর্ষণ শুরু হয়।
আরেক সূত্রে জানা যায় যে, হুযূর কেবলা রেঙ্গুন ত্যাগ করার সময় তাঁর এক খাদিম চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি নিবাসী ফজলুর রহমান সরকারকে রেঙ্গুনে রেখে আসেন। তাঁকে এ পরামর্শও দিয়েছেন যেন আর মাত্র তিন দিনের বেশী না থাকেন। ফজলুর রহমান সাহেব হুযূর ক্বেবলার পরামর্শ অনুসারে তিনদিন অবস্থান করে রেঙ্গুন থেকে স্বদেশে চলে আসেন। দেখা গেছে যে, মাত্র তিনদিন পর সেখানে বোমা বর্ষণ শুরু হয়।
যাঁরা হুযূর ক্বেবলার নির্দেশ মেনে এবং বিশ্বাস করে রেঙ্গুন ছেড়েছিলেন তাঁরা সকলে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। তাঁদের সম্পদও রক্ষা পেয়েছিলো। পক্ষান্তরে, যারা তা অমান্য করে রেঙ্গুনে রয়ে গিয়েছিলো, তাদের কেউ সুস্থভাবে দেশে ফিরতে পারেনি। পায়ে হেঁটে দুর্গম পথ অতিক্রম করার সময় অনেকে পথিমধ্যেই ক্ষুধার্ত ও অসহায় অবস্থায় মারা যায়। আর যারা বার্মায় রয়ে গিয়েছিলো তাদের কি অবস্থা হয়েছিলো তা তো সহজে অনুমেয়।
শাহানশাহে সিরিকোট বিগত ১৯৪১ ইংরেজিতে স্থায়ীভাবে রেঙ্গুন ছেড়ে পাকিস্তানে তাঁর নিজস্ব স্থায়ী ঠিকানায় তাশরীফ নিয়ে গেলেও নিয়মিতভাবে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ)-এ সদয় তাশরীফ আনয়ন করতে থাকেন। আর তাঁর বরকতময় জীবদ্দশার শেষ (১৯৬১ইং) পর্যন্ত এ দেশে সদয় যাতায়ত জারী রাখেন।

আনজুমান প্রতিষ্ঠা
শাহানশাহে সিরিকোট বিগত ১৯২৫ ইংরেজি সালে বার্মায় (রেঙ্গুন) আপন মুর্শিদের নামে ‘আনজুমান-এ শূরা-ই রহমানিয়া’ নামক একটি সংস্থা গঠন করেন। দ্বীন, মাযহাব ও সিলসিলার যাবতীয় কার্যাদি এ সংস্থার মাধ্যমেই তখন সম্পন্ন হতো। বিগত ১৯৩৬ ইংরেজি সালে দীর্ঘ ১৬ বছর পর তিনি স্বদেশে (পাকিস্তান) যান। ইতোমধ্যে হযরত খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী আলায়হির রাহমাহ্ ইনতিক্বাল করেন। (ইন্না- লিল্লা-হি ওয়া ইন্না– ইলায়হি রাজে‘ঊ-ন।)
স্বদেশে যাবার পথে তিনি কিছু দিনের জন্য চট্টগ্রামে অবস্থান করেন তরীক্বতের ভাইদের একান্ত অনুরোধে। এটা ছিলো তাঁর প্রথম চট্টগ্রাম সফর। এরপর থেকে তিনি প্রতি বছর চট্টগ্রাম সফরে আসতে শুরু করেন। ফলে চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের অগণিত মানুষ হুযূর ক্বেবলার পরিচয় লাভ করেন এবং তাঁর বরকতময় হাতে বায়‘আত গ্রহণ করে সিলসিলাহ-এ আলিয়া ক্বাদেরিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়ে ধন্য হতে থাকেন। সুদীর্ঘ ২১ বছর রেঙ্গুনে শরীয়ত ও তরীক্বতের খিদমত আনজাম দেওয়ার পর স্বদেশ থেকে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে প্রতি বছর তাশরীফ আনার ফলে এ দেশেও তাঁর মুরীদানের সংখ্যা কল্পনাতীতভাবে বৃদ্ধি পায়। ১৯৫৮ সালে চট্টগ্রাম সফরকালে ‘আনজুমান-এ শূরা-এ রহমানিয়া’র নাম পরিবর্তন করে ‘আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া’ রাখা হয়। এ আনজুমান গঠনকাল থেকে বড় বড় খিদমত আনজাম দিতে থাকে। বর্তমানে ওই ‘আনজুমান’-এর নাম ‘আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট’। এ ‘আনজুমান’-এর কর্ম পরিধি এখন চট্টগ্রামের গ-ি থেকে বেরিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে। বর্তমানে এ আনজুমান বিশাল মহীরূহে পরিণত হয়েছে। এশিয়াখ্যাত দ্বীনী এ প্রতিষ্ঠান, বিশাল বিশাল ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করছে, গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ পরিচালনা করছে, মাসিক ‘তরজুমান-এ আহলে সুন্নাত ওয়াল জমা‘আত’ নিয়মিতভাবে প্রকাশ করছে, ‘আনজুমান রিসার্চ সেন্টার’ নামে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান কায়েম ও পরিচালনা করে বিভিন্ন অতীব প্রয়াজনীয় গ্রন্থ-পুস্তকাদি প্রণয়ন ও প্রকাশ করছে ইত্যাদি ইত্যাদি।

শাহানশাহে সিরিকোট সত্যিকার অর্থে ওলী
হুযূর ক্বেবলা হযরত সিরিকোটী আলায়হির রাহমাহ্ একজন সত্যিকার অর্থে ওলী-ই কামিল, মুর্শিদে বরহক্ব। কামিল মুর্শিদদের যাবতীয় যোগ্যতা ও বৈশিষ্ট্য হুযূর কেবলা হযরত সিরিকোটী আলায়হির রাহমাহ্র মধ্যে ছিলো। একজন কামিল মুর্শিদের মধ্যে প্রধানতঃ চারটি বৈশিষ্ট্য থাকা অনিবার্যঃ ১. সহীহ্ আক্বীদা সম্পন্ন হওয়া, তথা আহলে সুন্নাত ওয়াল জমা‘আতের আক্বীদায় সর্বান্তকরণে বিশ্বাসী হওয়া। ২. দ্বীনী ইল্মের ধারক হওয়া, প্রয়োজনীয় দ্বীনী ইলমধারী আলিম হওয়া, ৩. মুত্তাক্বী পরহেযগার হওয়া এবং ৪. সহীহ্ সিলসিলার মুর্শিদ হওয়া, ঊর্ধ্বতন মুর্শিদের পরম্পরা এমনই স্বচ্ছ হওয়া যে, মধ্যখানে কোন বাতিল আক্বীদা ও আমল সম্পন্ন ব্যক্তি না থাকা।
[ইরশাদাত-ই আ’লা হযরত ও ‘আল-ক্বওলুল জমীল থেকে সংক্ষেপিত]
আলহামদুলিল্লাহ্, এসব ক’টি বৈশিষ্ট্য পূর্ণাঙ্গভাবে শাহানশাহে সিরিকোট আলায়হির রাহমাহর মধ্য বিরাজিত ছিলো।
শাহানশাহে সিরিকোট যেভাবে যুগশ্রেষ্ঠ আলিমে দ্বীন ছিলেন তেমনি ছিলেন এক মহান ওলী-ই কামিল। তাই তাঁর প্রতিষ্ঠিত সিলসিলায় রয়েছে শরীয়ত ও ত্বরীক্বতের অপূর্ব সমন্বয়। তিনি তাই একদিকে তরীক্বত চর্চা ও অনুশীলনের জন্য খানক্বাহ্ প্রতিষ্ঠার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন, অন্য দিকে দ্বীনের প্রকৃত খিদমত ও তরীক্বতের স্বচ্ছতা রক্ষার জন্য দ্বীনের দক্ষ ও সাচ্ছা আলিম তৈরীকে পূর্বশর্ত বলেও তিনি মনে করতেন। তিনি বলেছেন, ‘‘কাম করো, দ্বীনকো বাচাও, ইসলাম কো বাচাও, সাচ্ছা আলিম তৈয়্যার করো।’’ অর্থাৎ কাজ করো, দ্বীনকে রক্ষা করো, ইসলাম বাঁচাও, সাচ্ছা আলিম তৈয়ার করো। যেমন কথা তেমন কাজ। তিনি ‘জামেয়া’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাচ্ছা আলিম তৈরীর এবং দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার শুভ সূচনা করেন। সুতরাং তাঁরই প্রতিষ্ঠিত ‘জামেয়া’ এখন সত্যিকার অর্থে ‘জামেয়া’ বা ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ হয়েছে। এ জামেয়া প্রতিষ্ঠারও একটি ইতিবৃত্তান্ত ও পটভূমিকা রয়েছে।

ওফাত শরীফ
হযরত সাইয়্যেদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটী আলায়হির রাহমাহ্ ১১ই যিলক্বদ ১৩৮০ হিজরী, মোতাবেক ২৫ মে ১৯৬১ ইংরেজি একশ’ বছরের বেশী বয়স অতিবাহিত করে ওফাত বরণ করেছেন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন তাঁরই সুযোগ্য সাহেবযাদা হযরত সাইয়্যেদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ আলায়হির রাহমাহ্। তাঁর পরে তাঁর সাহেবযাদাগণ হযরত সৈয়্যদ মুহাম্মদ তাহের শাহ্ মুদ্দাযিল্লুহুল আলী এবং হযরত সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ্ সাহেব দামাত বরকাতুহুমুল আলিয়া হুযূর ক্বেবলা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ আলায়হির রাহমাহ্ প্রদত্ত খিলাফতের দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করছেন। হযরত সৈয়্যদ মুহাম্মদ তাহের শাহ্ সাহেব মুদ্দাযিল্লুহুল আলীও শরীয়ত এবং তরীক্বতের অতি গুরুত্বপূর্ণ যাবতীয় কাজ সমাধা করে যাচ্ছেন। সিরিকোট দরবার শরীফে ‘তৈয়্যবুল উলূম’ নামে (জামেয়া তৈয়্যবিয়া)-এর পাঁচ তলা বিশিষ্ট বিশাল দালান নির্মাণ এবং দ্বীনী তা’লিম ও তারবিয়াতের কাজ তাঁরই তত্ত্বাবধানে সুম্পন্ন হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানে দ্বীনী ও আধুনিক বিষয়াদির শিক্ষার সুব্যবস্থা রয়েছে। ১৯৯৫ ইংরেজিতে সেখানে ‘গাউসিয়া তাহেরিয়া ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। হযরত সৈয়্যদ মুহাম্মদ তাহের শাহ্ সাহেবের তিন সাহেবযাদা সৈয়্যদ মুহাম্মদ ক্বাসেম শাহ্, সৈয়্যদ মুহাম্মদ হামেদ শাহ্ এবং সৈয়্যদ মুহাম্মদ আহমদ শাহ্। হযরত মুহাম্মদ সাবির শাহ্ সাহেবের দু’ সাহেবযাদা সৈয়্যদ মাহমূদ শাহ্ ও সৈয়্যদ মুহাম্মদ আক্বিব শাহ্। হযরত সৈয়্যদ মুহাম্মদ ক্বাসেম শাহ্ সাহেবের দু’ সাহেবযাদা সৈয়্যদ মুহাম্মদ মাশহুদ শাহ্ ও সৈয়্যদ মুহাম্মদ মা’মূন শাহ্। সৈয়্যদ মুহাম্মদ হামেদ শাহ্র এক সাহেবযাদা সৈয়্যদ শহীর আহমদ শাহ্। মাওলা তা‘আলা এ খান্দানকে আবাদ রাখুন, তাঁদের ইলমী ও রূহানী ফুয়ূযকে চিরদিন জারী রাখুন। আ-মী-ন। [সূত্র. ইফত্বিতাহিয়্যাহ্: প্রসেফর ড. মাস‘ঊদ আহমদ]

লেখক: মহাপরিচালক আনজুমান রিসার্চ সেন্টার, চট্টগ্রাম।

পোষ্টটি ভালো লেগে থাকলে আপনার মূল্যবান মতামত জানান প্লিজ!

Leave a Comment