শবে বরাতের দিনে হালুয়া রুটি তৈরি কতোটুকু যৌক্তিক?

পোষ্টটি অন্যকে পড়ার সুযোগ করে দিতে শেয়ার করুন প্লিজ।

প্রশ্নঃ শাবে বারাতের দিনে আমাদের অধিকাংশ বাসায় মা বোনেরা হালুয়া রুটি তৈরি করে থাকেন। ইসলামে তা কতোটুকু যৌক্তিক? 

জবাবঃ 🖋ড. সৈয়দ মুহাম্মদ এরশাদ বুখারী

শাবে বরাতে হালুয়া রুটি রান্না করাকে কেউ যদি ফরজ বা ওয়াজিব বা সুন্নাত মনে করে তবে অবশ্যই তা নাজায়েজ হবে। কিন্তু কেউ মুস্তাহাব (করলে সাওয়াব না করলে গুনাহ নেই মনে করে) তথা ভালো কাজ মনে করে করলে তা নাজায়েজ হওয়ার কোনো কারন নেই। কেননা এই হালুয়া রুটি সাধারণত মানুষ গরিব মিসকিন ফকিরদের কেই দিয়ে থাকে। তাই গরিব মিসকিন ফকির দের খাওয়ানোর কাজ কখনওই ইসলাম বিরোধী হতে পারে না। গরিব মিসকিন ফকির দের খাওয়ানোর যে কতো ফযিলত এটা সকলেরই জানা, আলহামদুলিল্লাহ।  

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন – “হে মানুষেরা! তোমরা সালামের বিস্তার ঘটাও, মানুষকে খাবার খাওয়াও এবং যখন অন্য মানুষ ঘুমিয়ে থাকে তখন নামায পড়, তাহলে তোমরা শান্তিতে ও নির্বিঘ্নে জান্নাতে যেতে পারবে।” – (জামে তিরমিযী, হাদীস ২৪৮৫)

.

আজকাল কিছু ব্যক্তিদের কথা হলো শাবে বরাতে হালুয়া রুটি রান্না করা হারাম বা বিদাত। এ অজ্ঞতার শেষ কোথায়!!

শরিয়তে যেকোনো জিনিস হারাম হওয়ার জন্য স্পষ্ট দলিল প্রয়োজন। যেমন সারাবছর আপনি রোযা রাখতে পারবেন কিন্তু মোট পাচ দিন রোযা রাখা হারাম। এই পাচ দিনের কথা হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। 

এখন এই তাদের প্রশ্ন করুন যে কুরয়ান এর কত নং আয়াত বা কোন হাদিসে আল্লাহ বা তার রাসুল স্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে মানা করেছেন যে “হে ইমানদারেরা তোমাদের জন্য বছরের ৩৬৪ দিন হালুয়া রুটি জায়েজ শুধুমাত্র শাবে বরাত বা শাবান মাসের ১৫ তারিখে হালুয়া রুটি হারাম?” পারবে দেখাতে শাবে বারাতে হালুয়া রুটি হারাম করার জন্য কোনো আয়াত নাযিল হয়েছে? কেননা যেকোনো জিনিস হারাম হওয়ার জন্য স্পস্ট দলিল যেমন কুরয়ানের আয়াত বা সহিহ হাদিস প্রয়োজন।

যে খাবার যেমন হালুয়া রুটি হালাল এটা ৩৬৫ দিনই হালাল এবং যে খাবার হারাম যেমন মদ সেটা ৩৬৫ দিনই হারাম। এই একদিনের জন্য একটি হালাল খাবারকে হারাম বানিয়ে দেয়া বড়ই মুর্খতার পরিচায়ক। 

.

হাদীসে এসেছে আয়েশা সিদ্দীক্বা রা: হতে বর্ণিত আছে তিনি বলেন যে, নাবী কারীম স্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হালুয়া এবং মধু (খেতে) ভালবাসতেন। (বুখারী শরীফ ২য় খন্ড ৮৪৮ পৃষ্টা, আবু দাউদ শরীফ ৫২২ পৃষ্টা শামাইলে তিরমিযী বঙ্গানুবাদ ১১১ পৃষ্ঠা, হাদীস নং-১৫৫)। তাই মুসলমানেরা এ সুন্নতি খাবার রান্না করে গরিবদের দিতেই পারেন। আমি এটাও বলছিনা যে শুধু হালুয়া রুটিই খাওয়াতে হবে। আপনার ইচ্ছা আপনি হালুয়া খাওয়ান, বা মিস্টি খাওয়ান বা ঝাল খাওয়ান। আপনার সামর্থ্য থাকলে শুধু শাবে বারাতে কেন বছরের ৩৬৫ দিনই খাওয়ান। সামর্থ্য না থাকলে সপ্তাহে একদিন, তাও না থাকলে বছরে একদিন সেটা শনিবার হোক, রবি বা সোম হোক কিংবা শাবে বারাত বা মেরাজ বা রমজান বা কদর হোক না কেনো। কিন্তু খাওয়ান। কিন্তু মনে রাখবেন এইভাবে যেটা ৩৬৫ দিন জায়েজ এবং উত্তম কাজ তাকে একদিনের জন্য হারাম বলার অধিকার ইসলাম আপনাকে দেয়নি।

.

এখন কিছু মানুষ বলবেন যে “নির্দিষ্ট করে কোনো দিন হালুয়া রুটি রান্না করা যাবেনা যেমন শাবে বারাতে। এর উত্তর হলো আপনি নির্দিষ্ট করে রমজানে বুট-মুড়ি রান্না করবেন, আপনি নির্দিষ্ট করে ঈদুল ফিতর এ সেমাই রান্না করবেন তখন এটা কিভাবে জায়েজ হয়? রমজানে, ঈদে কি হুযুরে পাক স্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুট-মুড়ি, সেমাই রান্না করেছেন, সাহাবিরা করেছেন এমন প্রমান আছে ক্বুরয়ান হাদিসে? তাহলে এটা কিভাবে জায়েজ হলো???

এছাড়াও নির্দিষ্ট করে নির্দিষ্ট দিনে নফল ইবাদত করা আমার রাসুলেরই স্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুন্নাহ। কেননা হযরত আবু কাতাদা (রা) হতে বর্ণিত, একজন সাহাবী রাসুলুল্লাহ স্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে আরজ করলেন “ইয়া রাসুলাল্লাহ আমার মাতা পিতা আপনার কদমে কুরবান হোক। আপনি প্রতি সোমবার রোজা পালন করেন কেনো? জবাবে রাসুলুল্লাহ স্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এই দিনে আমি জন্মগ্রহন করেছি এবং এই দিনেই আমার উপর ওহী নাজিল হয়েছে। (সহীহ মুসলিম শরীফ ২য় খন্ড, ৮১৯ পৃষ্ঠা, সুনানে কুবরা, ৪র্থ খন্ড ২৮৬ পৃ: মুসনাদে আহমদ ইবনে হাম্বল ৫ম খন্ড ২৯৭ পৃ: মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক ৪র্থ খন্ড ২৯৬ পৃঃ)। দেখুন রাসুলে আরাবী নিজেই নিজের জন্মদিন পালনার্থে নির্দিষ্ট দিন সোমবারে নির্দিষ্ট করে নফল রোযা রেখেছেন। আলহামদুলিল্লাহ 

.

আবার কেউ কেউ বলেন এটা বিদআত। আমরাও তাই বলি এটা বিদআত, অর্থাৎ নতুন সৃষ্ট যা রাসুলুল্লাহ স্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যামানায় ছিলোনা। কিন্তু এটা হলো বিদয়াতে হাসানা,ভালো বিদয়াত।  বিদআতে হাসানা ভালো ও সাওয়াবের কাজ।

মুসলিম শরীফের (৬৪৬৬নং) এবং তিরমিযী শরীফের ১১তম অধ্যায় (২৬৭৫নং) হাদীস জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত- নবী করীম (স্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেনঃ অর্থ- “যে ব্যক্তি ইসলামের মধ্যে ভালো রীতি প্রচলন করে সে এর জন্য সাওয়াব পাবে, যারা এই উপর আমল করবে এর জন্যও সে সাওয়াব পাবে তবে আমলকারীদের সাওয়াবের কোন ঘাটতি হবে না এবং যে ব্যক্তি ইসলামে মন্দ রীতি প্রচলন করে এর জন্য তার পাপ হবে এবং যারা এর উপর আমল করবে তার জন্যও সে পাপের ভাগী হবে, তবে আমলকারীদের পাপের কোন ঘাটতি হবে না”। সুতরাং বোঝা গেল যে, ইসলামে কোন ভাল কাজের প্রচলন করাটা হচ্ছে সাওয়াবের কাজ আর মন্দ কাজের সূচনা করাটা হচ্ছে পাপের ভাগী হওয়া। 

বিদয়াতের দু প্রকার এটি স্বয়ং উমার রাঃ বলেছেন। বুখারী শরীফ (কিতাবুত তারাবীহ অধ্যায়)-এ বর্ণিত আছে যে, “হযরত উমর (রাঃ) আদেশ দিলেন তারাবীহ নামাজ জামায়াত সহকারে আদায় করতে। জামায়াতে তারাবীহ নামাজ আদায় করার পর উমর (রাঃ) বললেন, আমি কতইনা উত্তম বিদয়াত আবিস্কার করলাম।” উক্ত আমলটিকে উমর (রাঃ) নিজেই উত্তম বিদয়াত বলে ঘোষণা করেছেন। কেউ যদি প্রশ্ন করে থাকে উত্তম বিদয়াত আবার কি জিনিস! উত্তরে বলবো, যাকে তাঁর জীবদ্দশায় জান্নাতি হবার ঘোষণা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (স্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দিয়েছেন এবং আরোও বলেছেন- আল্লাহ উমরের (রাঃ) জিহ্বায় হক্বকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং আমার পরে যদি কেউ নবী হতো তবে সে উমর (রাঃ) হতো। এখন প্রশ্ন হলো উমর (রাঃ) বিদ্য়া’ত সম্পর্কে বেশী জানতেন নাকি প্রশ্নকারী বেশী জানে? হযরত উমর (রা) এর উক্তি মতে আমরা প্রমাণ করতে পারি যে, নব্য সৃষ্টি যা ক্বুরআন, সুন্নাহ্ বিরোধী নয়, তাকে বিদয়াতে হাসানা বলে এবং বিদয়াতে হাসানা উমর (রাঃ) এর সুন্নত।

যেমন রমজানের বুট-মুড়ি বিদয়াতে হাসানা, তেমনি ঈদের সেমাই বিদয়াতে হাসানা তথা ভালো কাজ। আলহামদুলিল্লাহ।

.

ভাই এটা বুঝার জন্য আপনাকে ক্বুরয়ান, হাদিস বিশেষজ্ঞ হতে হবেনা। এটাতো সামান্য বিবেকের ব্যাপার। আপনি নিজের বিবেককেই প্রশ্ন করুন সেই বলবে যে গরিবদের হালাল রুটি হালুয়া বিতরণ করা কি ইসলাম বিরোধী হতে পারে? রাসুলুল্লাহ স্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে গরিবদের হক দেয়ার জন্য আজীবন যুদ্ধ করলেন, যিনি নিজেই ৩ দিন নাখেয়ে থাকার পরেও সামান্য খাবার পেয়ে আগত গরিবকে দিয়ে দিলেন, যিনি ধনীদের মালের উপর গরিবদের একটি অংশ দেয়া ফরজ করে দিলেন, সেই গরিব-প্রেমিক রাসুলের স্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামে কোনো নির্দিষ্ট দিনে গরিবদের খাওয়ানোর কাজ কি খারাপ হতে পারে? না, কখনওই না।

.

এই কেমন অজ্ঞ ব্যক্তিদের আগমন হলো যারা গরিব মানুষের হক মেরে খেতে চায়? যারা মুসলমানদের সাওয়াবের কাজ হতে দুরে রাখতে চায়? এ কারা যারা ইবলিস শয়তান এর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়? আল্লাহ এই নব্য ফিতনা থেকে ইসলাম ও মুসলমানদের হিফাযত করুন।

এই পোস্ট অনেক গুরুত্বপূর্ণ। নিজে পড়ুন, সেভ করে রাখুন, কপি অথবা শেয়ার (ওয়াটসএপ, ইমো) যা ইচ্ছা করুন। আমাকে ক্রেডিট দেয়া বা মেনশন করারও প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র বেশি বেশি প্রচার করে, বাতিলদের ভন্ডামি ধরিয়ে দিন। যারা শিরক বিদয়াতের ফ্যাক্টরি খুলে আপামর জনতাকে সহীহ হাদিসের নামে গোমরাহ করে তাদের মুখোশ উন্মোচন করুন।

পোষ্টটি ভালো লেগে থাকলে আপনার মূল্যবান মতামত জানান প্লিজ!

Leave a Comment