পবিত্র ক্বোরআনের আলোকে দা’ওয়াত-ই খায়র

পোষ্টটি অন্যকে পড়ার সুযোগ করে দিতে শেয়ার করুন প্লিজ।

সূচীপত্র
০১. সম্পাদকীয় ০৪
০২. পবিত্র ক্বোরআনের আলোকে দা’ওয়াত-ই খায়র
মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান
০৩. হাদীস শরীফ: চারটি হাদীস সম্পর্কে বিভ্রান্তির নিরসন
মাওলানা কাজী মুহাম্মদ মঈন উদ্দীন আশরাফী
০৪. প্রবন্ধ: ক্বোরআন-হাদীসের আলোকে
নামায-রোযার গুরুত্ব ও তাৎপর্য
মাওলানা মুফীত সৈয়্যদ মুহাম্মদ অছিয়র রহমান আলক্বাদেরী
০৫. প্রবন্ধ: ক্বোরআনুল করীম ও হাদীস শরীফের
আলোকে রিসালত ও দ্বীন প্রচার
ড. মাওলানা মুহাম্মদ লিয়াকত আলী
০৬. প্রবন্ধ: ইসলামী অনুষ্ঠানাদি
আলহাজ্ব মাওলানা মুফতী কাজী মুহাম্মদ আবদুল ওয়াজেদ
০৭. প্রবন্ধ: আক্বীদার বিশুদ্ধতার সাথে আমল ও সচ্চরিত্রের গুরুত্ব
হাফেজ মাওলানা মুহাম্মদ আনিসুজ্জামান
০৮. প্রবন্ধ: দ্বীন প্রচার (দা’ওয়াত)-এর গুরুত্ব ও পদ্ধতি
মাওলানা সৈয়্যদ মুহাম্মদ জালাল উদ্দীন আলআযহারী
০৯. প্রবন্ধ: ইমাম-ই আ’যম আলায়হির রাহ্মাহ্
ও হানাফী মাযহাবের শ্রেষ্ঠত্ব
মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান
১০. প্রবন্ধ: তাসাওফ ও তরীক্বতের গুরুত্ব
অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভী
১১. প্রবন্ধ: উপমহাদেশে শাহানশাহে সিরিকোটের অবদান
মাওলানা ড. মুহাম্মদ সাইফুল আলম
১২. প্রবন্ধ: ইসলামী সংস্কৃতির প্রকৃতি, তাৎপর্য ও এর পরিধি
অ্যাডভোকেট মোছাহেব উদ্দিন বখতিয়ার

সম্পাদকীয়
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمنِ الرَّحِىْمِ
নাহমাদুহূ ওয়ানুসাল্লী ওয়া নুসাল্লিমু ‘আলা হাবীবিহিল করীম
ওয়া ‘আলা- আ-লিহী ওয়া সাহ্বিহী আজমা‘ঈন

‘দা’ওয়াতে খায়র’ অর্থাৎ কল্যাণের প্রতি আহ্বান, অন্য ভাষায় সৎকাজের প্রতি আহ্বান ও মন্দ কাজে বাধা প্রদান এ অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। পবিত্র ক্বোরআন ও হাদীসে এর প্রতি অত্যন্ত তাকীদ ও গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। পক্ষান্তরে, এ গুরুত্বপূর্ণ কাজের প্রতি উদাসীনতা প্রদর্শন কিংবা একেবারে বর্জনের বিরুদ্ধেও পবিত্র ক্বোরআন-হাদীসে শাস্তির হুমকি এসেছে। তাই, আমাদের পূর্ববর্তী বুযুর্গ ওলামা-মাশাইখ এ কাজকে নিজেদের উপর অর্পিত দায়িত্ব হিসেবে নির্ভয়ে ও হিকমত বা কৌশল অবলম্বন করে অতি যতœসহকারে পালন করে এসেছেন।
বর্তমান যুগে সঙ্গতকারণে ‘দা’ওয়াতে খায়র’-এর কাজ আরো বহুগুণ বেশী গুরুত্বের সাথে পালন করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। তাই আমাদের প্রাণপ্রিয় মুর্শিদ হযরতুল আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তাহের শাহ্ সাহেব মুদ্দাযিল্লুহুল আলী ও পীরে বাঙ্গাল হযরতুল আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ্ সাহেব হুযূর ক্বেবলা ‘দা’ওয়াতে খায়র’-এর উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।
বলাবাহুল্য, এ পবিত্র ও বরকতমন্ডিত দায়িত্ব পারন করার জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুবাল্লিগ (প্রচারক)-এর বিকল্প নেই। তাই, আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট’র ব্যবস্থাপনায় এবং ‘গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ’-এর কেন্দ্রীয় কমিটির তত্বাবধানে, আলমগীর খানক্বাহ্ শরীফে ‘আনজুমান রিসার্চ সেন্টার’ অডিটোরিয়াম-এ বিগত ১৪ মার্চ থেকে ১১ জুলাই ২০১৫ইং পর্যন্ত সময়ে সর্বমোট ৫ (পাঁচ) ব্যাচে ইলমে ক্বিরআতসহ বিভিন্ন বিষয়ের উপর সর্বমোট ৩১৮ জন (মুবাল্লিগ ও মুবাল্লিগাহ্)কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তাঁদের অনেকে আপন আপন এলাকায় ‘দা’ওয়াতে খায়র’-এর কাজ করে যাচ্ছেন। ভবিষ্যতে এভাবে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে দা’ওয়াতের কাজ আরো ব্যাপক ও বেগবান হবে।
উল্লেখ্য, উপরিউক্ত প্রশিক্ষণের জন্য যে সব দক্ষ প্রশিক্ষক নিয়োজিত ছিলেন, তাঁদেরকে অনুরোধ করা হয়েছিলো যেন নিজ নিজ নির্দ্ধারিত বিষয় কিংবা যুগের চাহিদানুসারে প্রবন্ধ প্রদান করেন, যাতে একটি ম্যাগাজিন আকারে ওই প্রবন্ধগুলো প্রকাশ করা যায়। অতি আনন্দের বিষয় যে, বেশ কয়েকজন সম্মানিত প্রশিক্ষক তাঁদের গবেষণালবদ্ধ প্রবন্ধ সরবরাহ্ করেছেন। সুতরাং আমরা ওইসব প্রবন্ধ এবং আরো কিছু জরুরী বিষয়ে প্রবন্ধ প্রণয়ন করে এ ম্যাগাজিন প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করি। ম্যাগাজিনটার নামকরণ করা হয়- ‘দা’ওয়াত’। আশাকরি, সেটা লিখিত আকারে পাঠক সমাজে দা’ওয়াত বা সত্যের পথে আহ্বান ও অসত্যের পথরোধকল্পে জোরদার ভূমিকা পালন করে।
ম্যাগাজিনটার প্রকাশনার দায়িত্ব নিলেন আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট, চট্টগ্রাম। এটা পাঠক সমাজের উপকারে আসলে আমাদের এ উদ্যোগ সফল ও ফলপ্রসূ হবে।

ইতি-

(মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান)
মহাপরিচালক, আনজুমান রিসার্চ সেন্টার

তাফসীরুল ক্বোরআন

পবিত্র ক্বোরআনের আলোকে
দা’ওয়াত-ই খায়র

মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান

আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ ফরমান-
وَلْتَكُن مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ ۚ وَأُولَـٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ Ο
তরজমা: এবং তোমাদের মধ্যে একটা দল এমন হওয়া উচিৎ, যারা কল্যাণের প্রতি আহ্বান জানাবে, ভাল কাজের নির্দেশ দেবে এবং মন্দ থেকে নিষেধ করবে। আর এরাই লক্ষ্যস্থলে পৌঁছেছে। [সূরা আল-ই ইমরান: আয়াত-১০৪, কান্যুল ঈমান]

পূর্ববর্তী আয়াতের সাথে এ আয়াতের সম্পর্ক
এ আয়াতের সাথে পূর্ববর্তী আয়াতগুলোর সাথে কয়েক প্রকারের সম্পর্ক বিদ্যমান- প্রথমত, পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে মুসলমানদেরকে সাফল্যের দু’টি উসূল (মূলনীতি) বাত্লে দেওয়া হয়েছে- ১. তাক্বওয়া (খোদাভীরুতা) ও ‘তাহারাত’ বা পবিত্রতা অবলম্বন করা এবং ২. আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরা। এ আয়াতে সাফল্যের তৃতীয় উসূল বা মূলনীতি বলে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ ইসলাম প্রচারে অংশগ্রহণ করা। দ্বিতীয়ত, পূর্ববর্তী আয়াতে আল্লাহ্ তা‘আলা মুসলমানদেরকে এক বিশেষ নি’মাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন- তাদের মধ্যেকার শত্রুতা খতম হয়ে যাওয়া এবং পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যাওয়া। এখন সেটার শোক্রিয়া বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। আর ওই নি’মাতের শোক্রিয়া হচ্ছে তোমরা অন্যান্য লোককেও ইসলামের দাওয়াত দিয়ে তাদেরকেও ভাই ভাই করে দাও। শুধু তোমরা ‘ইসলাম’ দ্বারা উপকৃত হয়ে ক্ষান্ত হয়ো না, অন্য লোকদেরকেও তা পৌঁছিয়ে দাও। তৃতীয়ত, পূর্ববর্তী আয়াতে এরশাদ করা হয়েছিলো যে, তোমরা দোযখের একেবারে কিনারায় পৌঁছে গিয়েছিলে। আমি আমার মাহবূবের মাধ্যমে তোমাদেরকে তা থেকে রক্ষা করেছি। এখন (এ আয়াতে) বলা হচ্ছে- তোমাদের মতো আরো অনেকে রয়েছে, যারা দোযখের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। তোমরা দৌঁড়ে যাও, তাদেরকে রক্ষা করো, আল্লাহর সুন্নাত ও রসূলে করীমের সুন্নাত অনুসারে কাজ করো। অর্থাৎ পতন্মুখদেরকে রক্ষা করে নাও। চতুর্থত, পূর্ববর্তী আয়াতে এরশাদ হয়েছিলো- ‘তোমরা হিদায়ত পেয়ে যাবে।’ এখন হিদায়ত পাওয়ার তাফসীল (বিস্তারিত পদ্ধতি) বর্ণনা করা হচ্ছে। তা হচ্ছে- তোমরা দ্বীনের প্রচার করো, ‘দাওয়াত-ই খায়র’ (ভাল কাজের দিকে আহ্বান) করো, তোমরা হিদায়ত তথা সঠিক পথের দিশা পেয়ে যাবে। পঞ্চমত, পূর্ববর্তী আয়াতে আল্লাহ্ তা‘আলা আয়াতগুলো নাযিল করার একটা উদ্দেশ্য বলেছিলেন। তা হচ্ছে তোমাদের হিদায়ত (সঠিক পথের দিশা) পেয়ে যাওয়া। এখন ওই আয়াতগুলো নাযিল করার দ্বিতীয় উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হচ্ছে। আর তা হচ্ছে- সেগুলো অন্য লোকদেরকে নিকট পৌঁছানো। ষষ্ঠত, পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে কিতাবী সম্প্রদায়ের দু’টি দোষ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছেঃ ১. তাদের নিজেদের পথভ্রষ্ট হওয়া এবং ২. অন্য লোকদেরকে পথভ্রষ্ট করা। এখন মুসলমানদের উদ্দেশ্যে এরশাদ হচ্ছে- তোমরা তাদের বিরোধী হয়ে যাও! অর্থাৎ তোমরা নিজেরাও হিদায়তের উপর থাকো, অন্য লোকদেরকেও হিদায়ত করো। [আশরাফুত্ তাফাসীর: ৪র্থ খন্ড]

তাফসীর
এ আয়াত শরীফে আল্লাহ্ তা‘আলা তিনটি কাজের নির্দেশ দিয়েছেন- সৎকর্মের দাওয়াত দেওয়া, ভাল কাজের নির্দেশ দেওয়া এবং মন্দ কাজে সাধ্যানুসারে বাধা দেওয়া। আল্লাহ্ তা‘আলা এ তিনটি কাজের বিনিময়ে উভয় জাহানের সাফল্যের ওয়াদা করেছেন।
এ আয়াত শরীফের দু’টি তাফসীর বা ব্যাখ্যা সবিশেষ উল্লেখযোগ্যঃ
এক. হে মুসলমানগণ, তোমরা এমন দল হয়ে থাকো, অথবা বনে যাও, অথবা এমন দল হিসেবে সুদৃঢ় হয়ে থাকো, যারা সমস্ত বক্র প্রকৃতির লোকদেরকে ভাল কাজের দিকে দাওয়াত দেবে অর্থাৎ কাফিরদেরকে ঈমানের দিকে, ফাসিক্বদের (পাপাচারীগণ) তাক্বওয়া-পরহেযগারীর দিকে, অলস বা উদাসীনদেরকে জাগ্রত হবার দিকে, মূর্খদেরকে ইল্ম ও মা’রিফাত অর্জনের দিকে, শুষ্ক মেজাজের লোকদেরকে ইশক্বের তৃপ্তি লাভের দিকে, শয়নকারীদেরকে ঘুম থেকে জাগার দিকে আহ্বান করবে।
আর ভাল কথা, ভাল আক্বীদা ও উত্তম আমলের মৌখিকভাবে, কলম দিয়ে, উত্তম আমল দেখিয়ে, শক্তি প্রয়োগ করে, ন¤্রতা অবলম্বন করে এবং কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়ে লোকজনকে সৎপথে আনার চেষ্টা করবে।
পক্ষান্তরে, মন্দ কথা, মন্দ আক্বীদা, মন্দ কাজ ও মন্দ খেয়াল থেকে লোকজনকে মৌখিকভাবে, মন জয় করে, উত্তম কাজের উপমা দেখিয়ে, কলম দ্বারা লিখে এবং প্রয়োজনে ক্ষমতা প্রয়োগ করে রুখবে।
বস্তুত: যে দলের মধ্যে এ তিনটি বৈশিষ্ট্য বা গুণ রয়েছে, তারাই পূর্ণাঙ্গভাবে সফলকাম। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকেই এ পন্থাগুলো অবলম্বন করলে অবশ্যই সফলকাম হবে।
এ আয়াতের তাফসীর বা ব্যাখ্যা করছে এ আয়াত শরীফও-
ক্বোরআনে করীমের অন্যত্র একই বিষয়ে এরশাদ হয়েছে-
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ
وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللّهِ
তরজমা: তোমরা হলে ওইসব উম্মতের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম, যাদের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে মানবজাতির জন্য; (যেহেতু) প্রকৃত সৎ কাজের নির্দেশ তোমরাই দিচ্ছো আর মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখছো এবং আল্লাহর উপর (যথার্থ) ঈমান রাখছো।’ [সূরা আল-ই ইমরান, আয়াত ১১০, কান্যুল ঈমান] দুই. আয়াতের দ্বিতীয় তাফসীর হচ্ছে- হে মুসলমানগণ, তোমাদের সবাই না দুনিয়ার কাজে মশগূল হয়ে যাবে, দ্বীনের প্রচার কাজ ছেড়ে দেবে, না তোমাদের সবাই দুনিয়া ছেড়ে দিয়ে দ্বীনের প্রচারকারী হয়ে যাবে; বরং তোমাদের মধ্যে একটা দল এমন হওয়া জরুরী, যারা জীবনভর ‘দাওয়াত-ই খায়র’ তথা দ্বীনের প্রচার-কাজ চালিয়ে যাবে, পূর্ণাঙ্গ আলিম হবে, নিজের জীবনের মাক্বসাদ বা লক্ষ্য এটাই স্থির করবে যে, লোকজনকে ভাল কাজের নির্দেশ দিতে থাকবে ও মন্দ কাজ থেকে বারণ করতে থাকবে। বস্তুত: সমস্ত মুসলমানের মধ্যে এ মুবাল্লিগ আলিমদের জমা‘আত বা দলই অত্যন্ত কামিয়াব বা সফলকাম। ফলে, তাদের দুনিয়ায়ও সম্মান হবে, আখিরাতেও তাঁরা মহত্ব ও উচ্চ মর্যাদা পাবেন। এ মর্মার্থের পক্ষে তাফসীর হচ্ছে এ আয়াত শরীফ-
وَمَا كَانَ الْمُؤْمِنُونَ لِيَنْفِرُوا كَافَّةً ۚ فَلَوْلَا نَفَرَ مِن كُلِّ فِرْقَةٍ مِّنْهُمْ طَائِفَةٌ لِّيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ وَلِيُنذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوا إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ Ο
তরজমা: এবং মুসলমানদের থেকে এটাতো হতে পারে না যে, সবাই একসাথে বের হবে; সুতরাং কেন এমন হলো না যে, তাদের প্রত্যেক দল থেকে একটা দল বের হতো, যারা ধর্মের জ্ঞান অর্জন করতো এবং ফিরে এসে নিজ সম্প্রদায়কে সতর্ক করতো, এ আশায় যে, তারা সতর্ক হবে? [সূরা তাওবা: আয়াত-১২২] এ থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, প্রত্যেক মুসলমানের উপর পূর্ণাঙ্গ আলিম হওয়া ফরয নয়; বরং তাদের মধ্য থেকে একটা জমা‘আত বা দল আলিম হওয়াও জরুরী। যখন প্রত্যেক শহরে ডাক্তার, হাকিম, মিস্ত্রী, দোকানদার (ব্যবসায়ী) ইত্যাদি থাকা জরুরী, তখন প্রত্যেক শহরে ও এলাকায় আলিমও অবশ্যই থাকা চাই। ফলে, প্রথমোক্তদের মাধ্যমে পার্থিব চাহিদাদি পূরণ হবে, এ শেষোক্তদের দ্বারা দ্বীনী প্রয়োজনাদি পূরণ হবে। [আশ্রাফুত্ তাফাসীর: ৪র্থ খন্ড]

এ আয়াত শরীফ থেকে আরো যা প্রতীয়মান হয়-
এক. ইসলামে দ্বীনী বিষয়াদির প্রচার অতি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কারণ, অন্য সব ইবাদতের উপকারিতা নিজের জন্য হয়; কিন্তু ‘দ্বীন প্রচারের’ উপকারিতা অন্যরাও ভোগ করতে পারে। নিজের উপকারের চেয়ে পরোপকারিতা শ্রেয়তর। হযরত র্দুরাহ্ বিনতে আবূ লাহাব থেকে বর্ণিত, কেউ হুযূর-ই আন্ওয়ার সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র দরবারে আরয করলেন, ‘‘সর্বাধিক উত্তম বান্দা কে?’’ হুযূর-ই আক্রাম এরশাদ করলেন, ‘‘ভাল কাজের নির্দেশদাতা, মন্দ কার্যাদিতে বাধাদাতা, আল্লাহ্ তা‘আলাকে যে ভয় করে এবং যে আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখে।’’ হযরত হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, ‘‘যে ব্যক্তি সৎকাজের নির্দেশ দেয়, মন্দ কাজে বাধা দেয়, সে আল্লাহ্ তা‘আলারও খলীফা, তাঁর রসূলেরও খলীফা, তাঁর কিতাবেরও। যদি সব মুসলমান দ্বীনের প্রচার (দাওয়াত-ই খায়র) ছেড়ে দেয়, তবে তাদের উপর যালিম বাদশাহ্ (শাসক) চেপে বসবে, তাদের দো‘আ কবূল হবে না।’’
[সূত্র. তাফসীর-ই রূহুল মা‘আনী] হযরত আবূ বকর সিদ্দীক্ব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, ‘‘হে লোকেরা, সৎ কাজের নির্দেশ দাও, মন্দ কাজে বাধা দাও? তাহলে তোমাদের জীবন উত্তমরূপে অতিবাহিত হবে।’’ হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, ‘‘দ্বীনের প্রচার সর্বোত্তম জিহাদ।’’ [সূত্র. তাফসীর-ই কবীর] দুই. দ্বীনের প্রচার যেমন সর্বোত্তম ইবাদত, দ্বীনের প্রচারকার্য ছেড়ে দেওয়াও নিকৃষ্টতম অপরাধ (গুনাহ্), এ বর্জনকারী লাঞ্ছিত-অপমানিত হবে। একথা আল্লাহ্ তা‘আলার বাণী শরীফ (আয়াতাংশ) هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ (তারাই সফলকাম) থেকে বুঝা যায়। কারণ, তাতে এ বিশেষ কৃতকার্যতাকে উক্ত কাজগুলো করেন এমন সব লোকের জন্য সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। হযরত আলী মুরতাদ্বা বলেছেন, ‘‘যে ব্যক্তি ভাল কাজের নির্দেশ দেয় না, মন্দ কাজ করতে নিষেধ করে না, তাকে মাথা নিচের দিকে করে লটকানো হবে।’’ নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, ‘‘মুসলমানদের উদাহরণ একটি জাহাজের আরোহীদের মতো। যদি একজন আরোহী জাহাজের তলদেশের তক্তা উপড়ে ফেলে কিংবা ভেঙ্গে ফেলে, আর তখন অন্য আরোহীরা তার হাত ধরে না নেয়, তবে তো সবাই ডুবে মরবে।’’ হযরত সুফিয়ান সওরী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি বলেন, ‘‘যে ব্যক্তি আপনার সবার এবং সমস্ত প্রতিবেশী ও বন্ধুবান্ধবের নিকট প্রিয় হয়, সে দ্বীনের ব্যাপারে তেল মালিশকারী (শিথিলতা অবলম্বনকারী)ই। দ্বীনদারের পরিচয় হচ্ছে- তার প্রতি পরহেযগার-খোদাভীরুরা সন্তুষ্ট থাকেন। আর ফাসিক্ব, পাপাচারী এবং কাফির ও বে-দ্বীনরা তার প্রতি অসন্তুষ্ট থাকে। [সূত্র. তাফসীর-ই কবীর] সাহাবা-ই কেরামের আজ পর্যন্ত বে-দ্বীনরাই সমালোচনা করে। কেন? এ জন্য যে, তাঁরা ছিলেন اَشِدَّآءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَآءُ بَيْنَهُمْ (কাফিরদের উপর কঠোর, তাঁদের তথা মুসলমানদের প্রতি দয়াপরবশ। ৪৮: ২৯)
তিন. এটাই সমীচিন হবে যে, দ্বীনের প্রচারণা প্রথমে ন¤্রতার সাথে করবে, তারপর কঠোরতার সাথে করবে। যেমন আয়াতের يَدْعُوْنَ (আহ্বান করে)-এর ব্যাপক অর্থ থেকে প্রতীয়মান হয়। মহান রব পরস্পর বিবাদে রত মুসলমানদের সম্পর্কে এরশাদ করেছন-
…فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا ۖ فَإِن بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَىٰ فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي …الاية
তরজমা: …এবং যদি মুসলমানদের দু’টি দল পরস্পর যুদ্ধ করে, তবে তাদের মধ্যে সন্ধি করাও। অতঃপর যদি একে অপরের উপর সীমালংঘন করে, তবে ওই সীমালংঘনকারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। [সূরা হুজুরাত: আয়াত-৯, কান্যুল ঈমান] অর্থাৎ প্রথমে উভয়ের মধ্যে সন্ধি করাতে চেষ্টা করো, যদি তাতে কাজ না হয়, তবে সীমালংঘনকারীর বিরুদ্ধে লড়াই করো।
অবাধ্য স্ত্রীদের সম্পর্কে এরশাদ হয়েছে-…وَاهْجُرُوْهُنَّ فِى الْمَضَاجِعِ وَاضْرِبُوْهُنَّ ج ; তরজমা: যে সমস্ত স্ত্রীর অবাধ্যতা সম্পর্কে আশংকা হয়, তবে তাদেরকে বুঝাও, তাদের থেকে পৃথক হয়ে শয়ন করো এবং তাদেরকে প্রহার করো। [সূরা নিসা: আয়াত-২৪, কান্যুল ঈমান] বুঝা গেলো যে, এমন স্ত্রীদের সংশোধন প্রথমে বয়কট করে করা হবে, যদি তাতে কাজ না হয়, তবে মৃদু শাস্তি দেওয়া হবে।
চার. দ্বীনের প্রচার সাধারণত প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্বে বর্তায়। যে মাসআলা কারো জানা থাকে, সে অন্য কাউকে, যার তা জানা নেই, বলে দেবে। যেমন مِنْكُمْ (তোমাদের থেকে) -এর প্রথম তাফসীর থেকে প্রতীয়মান হয়।
পাঁচ. পূর্ণাঙ্গ মুবাল্লিগ (প্রচারক) হওয়া এবং নিজেকে এ কাজের জন্য ওয়াক্বফ (উৎসর্গ) করে দেওয়া ‘ফরযে কেফায়া’; কেউ তা করলে সবাই দায়মুক্ত হতে পারবে। যেমন مِنْكُمْ (তোমাদের মধ্য থেকে) -এর দ্বিতীয় তাফসীর থেকে বুঝা গেলো।
ছয়. দ্বীনের প্রচার কাজ নিজের সাধ্যানুসারে অপরিহার্য। এ কথা আতাংশ يَدْعُوْنَ (তারা আহ্বান করে)-এর ব্যাপকতা থেকে প্রতীয়মান হয়। সুতরাং শক্তি প্রয়োগ করে দ্বীনের প্রচার করা, বাদশাহ্, শাসকবর্গ ও সমাজের নেতৃবর্গের দায়িত্বে বর্তায়; মৌখিকভাবে দ্বীনের প্রচারকার্য সম্পাদন করা আলিমদের দায়িত্বে বর্তায়; যখন তাঁরা এ সামর্থ্য রাখেন। আর যদি কোন বাধ্যবাধতা থাকে, তাহলে মনে মন্দ কাজগুলোর প্রতি ঘৃণাবোধ থাকা অপহিহার্য। এ ধরনের ঘৃণাবোধকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ‘দুর্বলতম ঈমান’ বলেছেন।
সাত. কিছু সংখ্যক আলিম يَدْعُوْنَ (আহ্বান করবে)-এর ব্যাপক অর্থ দেখে বলেছেন, ‘পাপাচারী, ফাসিক্বও দ্বীন-প্রসারের কাজ করবে, বা অংশ নেবে। কারণ, তারাও তো রসূলে করীমের উম্মত।’ প্রত্যেকের উপর নিজের আমল যেমন বর্তায়, তেমনি অন্যকে দ্বীনের বিষয়াদি পৌঁছানোর কর্তব্যও তার উপর বর্তায়। এ দু’টি পৃথক পৃথক বিধান। একটা পালন করলে অন্যটা মাফ হয় না, বে-নামাযীর উপরও রোযা এবং হজ্ব ফরয। [তাফসীর-ই কবীর] অবশ্য কেউ কেউ এর বিপরীত মতও অবলম্বন করে থাকেন। কারণ, ক্বোরআন-ই করীমে নিজে আমল না করে অপরকে নেক আমল করার জন্য নির্দেশ দেয়ার বিপক্ষে ধমকও দেওয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ ফরমায়েছেন-
كَبُرَ مَقْتًا عِنْدَ اللهِ اَنْ تَقُوْلُوْا مَالاَ تَفْعَلُوْنَ
তরজমা: আল্লাহর নিকট কেমন জঘন্য অপছন্দনীয় এ কথা যে, তা বলবে যা করবে না! [সূরা সফ্ফ, আয়াত-৩: কান্যুল ঈমান]

অন্য আয়াতে এরশাদ হয়েছে-
أَتَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَتَنسَوْنَ أَنفُسَكُمْ وَأَنتُمْ تَتْلُونَ الْكِتَابَ ۚ أَفَلَا تَعْقِلُونَ Ο
তরজমা: তোমরা কি মানুষকে সৎকর্মের নির্দেশ দিচ্ছো এবং নিজেদের আত্মাগুলোকে ভুলে বসেছো? অথচ তোমরা কিতাব পড়ছো। তবুও কি তোমাদের বিবেক নেই? [সূরা বাক্বারা: আয়াত-৪৪, কান্যুল ঈমান] এ শেষোক্ত অভিমত থেকে মুবাল্লিগগণও প্রথমে আত্মশুদ্ধির ব্যাপারে উৎসাহ্ পাবেন।
আট. মন্দ কাজে বাধা দেওয়া নিঃশর্তভাবে ওয়াজিব। তবে ভাল ও পুণ্যময় কাজের নির্দেশ দেওয়া কখনো ওয়াজিব, কখনো সুন্নাত, কখনো মুস্তাহাব। যে পর্যায়ের নেক কাজ, নির্দেশ দেওয়ার বিধানও ওই পর্যায়ের। ফরয কাজগুলোর জন্য নির্দেশ দেওয়া ফরয, ওয়াজিবগুলোর নির্দেশ দেওয়া ওয়াজিব, মুস্তাহাব কাজগুলোর জন্য নির্দেশ বা উপদেশ দেওয়া মুস্তাহাব।
নয়. না-বালেগ ছোট শিশুদেরকেও ভাল কাজগুলোর হুকুম দেওয়া যাবে, মন্দ কাজগুলো থেকে বারণ করা যাবে, যাতে তারা বয়োপ্রাপ্ত হবার আগে নেক্কার হয়ে যায়। শিশুরা হচ্ছে গাছের তাজা ডালের ন্যায়; যেদিকে চাইবেন মোচড়াতে পারবেন। তারা বয়োপ্রাপ্ত হলে শুষ্ক বাঁশের মতো হয়ে যাবে। তখন সোজা করতে চাইলে ভেঙ্গে যাবে। এটাও يَدْعُوْنَ (তারা আহ্বান করবে)-এর ব্যাপক অর্থ থেকে প্রতীয়মান হয়।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমায়েছেন, যখন তোমাদের সন্তানরা সাত বছরের হয়, তখন তাদেরকে নামাযের নির্দেশ দাও, আর যখন দশ বছরের হবে, তখন তাদেরকে নামায না পড়লে শাস্তি দাও। [আশরাফুত্ তাফাসীর (তাফসীর-ই নঈমী), খাযাইনুল ইরফান ইত্যাদি]

সৎ কাজের নির্দেশ ও অসৎকাজে বাধা প্রদান বর্জন করলে দো‘আ কবুল হয় না, আল্লাহর দান ও সাহায্য পাওয়া যায় না
হাদীস শরীফে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন-
مُرُوْا بِالْمَعْرُوْفِ وَانْهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ قَبْلَ اَنْ تَدْعُوْا فَلاَ يُسْتَجَابُ
لَكُمْ وَتَسْأَلُوْا اللهَ فَلاَ يُعْطِيْكُمْ وَتَسْتَنْصِرُوْهُ فَلاَ يُنْصُرُكُمْ
অর্থাৎ : তোমরা সৎকর্মের নির্দেশ দাও এবং অসৎ কাজে বাধা দাও এর পূর্বে যে, তোমরা দো‘আ করবে, অতঃপর তা কবুল করা হবে না, তোমরা আল্লাহর কাছে চাইবে, অতঃপর তিনি তোমাদেরকে দেবেন না, আর তোমরা তাঁর দরবারে সাহায্য চাইবে, অতঃপর তিনি তোমাদের সাহায্য করবেন না।
হযরত বেলাল ইবনে সা‘ঈদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেছেন-
اِنَّ الْمَعْصِيَةَ اِذَا اُخْفِيَتْ لَمْ تَضُرَّ اِلاَّ صَاحِبَهَا وَاِذَا اُعْلِنَتْ ضَرَّتِ الْعَامَّةَ
অর্থাৎ: পাপকাজ যখন গোপনে করা হয় (গোপন থাকে) তখন তা শুধু পাপী লোকটাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে আর যখন প্রকাশ্যে করা হয়, (আর তাতে বাধা দেওয়া না হয়; বরং নিরবে সমর্থন করা হয়) তখন তা সাধারণভাবে (ব্যাপকহারে) ক্ষতিগ্রস্ত করে।

আমাদের পূর্ববর্তী বুযুর্গরা দ্বীন প্রচারের ক্ষেত্রে কারো তোয়াক্কা করতেন না, নির্ভিক ছিলেন
বর্ণিত আছে যে, হযরত আবূ গিয়াস যাহিদ এক প্রসিদ্ধ বুযুর্গ ব্যক্তি বোখারার কবরস্থানে বসবাস করতেন। একদিন তিনি তাঁর এক ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য শহরে প্রবেশ করলেন। তদানীন্তনকালে সেখানকার শাসক (আমীর) ছিলেন নযর ইবনে আহমদ। ঘটনাচক্রে ওইদিন আমীরের দরবারে এক আতিথ্যের অনুষ্ঠান ছিলো। হযরত আবূ গিয়াস দেখতে পেলেন- আমীরের দরবার থেকে গায়ক ও শিল্পীরা বাদ্যযন্ত্রসহকারে বের হচ্ছে। হযরত আবূ গিয়াস তখন নিজেকে সম্বোধন করে বললেন, ‘‘ওহে, এখন তো তোমার সামনে এক চরম পরীক্ষা এসে পড়েছে। এখন তুমি যদি চুপ থাকো, তাহলে তুমিও তাদের এ অপকর্মে শরীক বলে বিবেচিত হবে।’’ তখন তিনি আসমানের দিকে মাথা উঠালেন আর আল্লাহ্ তা‘আলার দরবারে সাহায্য চাইলেন। তারপর হাতে লাঠি নিলেন। আর তাদের সবার উপর চড়াও হয়ে তাদের তাড়া করতে লাগলেন। তারা সবাই ভীত-সন্ত্রস্থ হয়ে শাসক (আমীর)-এর দরবারের দিকে পালিয়ে গেলো। আর আমীরকে ঘটনা বর্ণনা করলো।
আমীর হযরত আবূ গিয়াসকে দরবারে ডেকে পাঠালো। তিনি হাযির হলেন। অতঃপর তাঁর উদ্দেশে আমীর বললো, ‘‘আপনি কি জানেন না যে, কেউ আমীরের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে তাকে জেল খানায় ভোর করতে হয়?’’ তদুত্তরে হযরত আবূ গিয়াস বললেন, ‘‘তুমি কি জানো না- যে ব্যক্তি ‘রাহমান’ পরম করুণাময়ের বিরোধিতায় বের হয়, তাকে ‘নীরান’ অর্থাৎ দোযখের আগুনে সন্ধ্যা করতে হয়?’’ তখন আমীর বললো, ‘‘আপনাকে মানুষের কাজের হিসাব নিতে কে নিয়োগ করেছেন?’’ তিনি বললেন, ‘‘যিনি তোমাকে ‘আমীর’ হিসেবে নিয়োগ করেছেন, তিনিই আমাকে এ খিদমতে নিয়োজিত করেছেন।’’ তারপর আমীর বললো, ‘‘আমাকে তো খোদ্ খলীফা আমীর নিয়োগ করেছেন।’’ তদুত্তরে হযরত আবূ গিয়াস বললেন, ‘‘আমাকে খলীফার মহান রবই নিয়োগ করেছেন।’’ তখন আমীর বললো, ‘‘ঠিক আছে, আমি আপনাকে সমরকন্দের শাসক পদে নিয়োগ করলাম।’’ তখন হযরত আবূ গিয়াস বললেন, ‘‘আমি নিজেকে ওই পদ থেকে অপসারিত করলাম।” তখন আমীর বললো, ‘‘আপনার ব্যাপারটাই আজব ধরনের। আপনাকে যখন দায়িত্ব রাজ্যের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি, তখন আপনি প্রজাদের শাসন করছেন, আর যখন সরকারীভাবে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে তখন আপনি তা গ্রহণ করছেন না। এর কারণ কি?’’ তখন আবূ গিয়াস বললেন, ‘‘আমি তোমার নিয়োগকে প্রত্যাখ্যান করছি। কারণ, তোমার ইচ্ছা হলে তুমি আবার তোমার এ নিয়োগ প্রত্যাহার করে নেবে। কিন্তু যখন আমার রব আমাকে এ কাজে নিয়োগ করেন, তখন আমাকে অন্য কেউ এ দায়িত্ব থেকে অপসারণ করতে পারবে না।’’
তখন আমীর বললো, ‘‘তাহলে আপনি আমার নিকট আপনার যা দরকার চাইতে পারেন।’’ তদুত্তরে হযরত আবূ গিয়াস বললেন, ‘‘আমার যৌবনটা আমাকে ফিরিয়ে দাও!’’ আমীর বললো, ‘‘তাতো আমার ক্ষমতায় নেই। অন্য কিছু চান?’’ তখন তিনি বললেন, ‘‘তুমি দোযখের দারোগার নিকট একটি চিঠি লিখে দাও যেন তিনি আমাকে শাস্তি না দেন।’’ আমীর বললো, ‘‘তাও তো আমার ক্ষমতার আওতায় নেই। অন্য কিছু চান।’’ তিনি বললেন, ‘‘তাহলে বেহেশতের দারোগাকে একটা চিঠি লিখে দাও যেন তিনি আমাকে বেহেশতে প্রবেশাধিকার দেন।’’ আমীর বললো, ‘‘এটাও তো আমার ক্ষমতায় নেই। কারণ এসব ক’টি তো ওই মহান রবের ক্বুদরতের হাতে, যিনি সব কিছুর মালিক। তিনি নিজে এবং তিনি যাঁকে এর ক্ষমতা প্রদান করেন তিনি তা সম্পন্ন করতে পারেন।’’ তখন হযরত আবূ গিয়াস বললেন, ‘‘আমি তোমার নিকট যা-ই চেয়েছি, তার কোনটাই তুমি দিতে পারলে না, অথচ আমি আল্লাহ্ তা‘আলার নিকট যা-ই চেয়েছি, তিনি তার প্রত্যেকটি আমাকে দিয়েছেন এবং দিয়ে থাকেন।’’ তখন আমীর তাঁকে সসম্মানে বিদায় দিলেন।
সুতরাং বুঝা গেলো যে, সৎকাজের নির্দেশ ও অসৎকাজে বাধা দান যত কঠিন কাজই হোক না কেন, তা নিষ্ঠার সাথে করতে গেলে, আল্লাহ্ তা‘আলার সাহায্য ও এর উত্তম প্রতিদান পাওয়া নিশ্চিত। আর তা থেকে বিরত থাকলে সেটার পরিণামও ভয়াবহ। তাই, আমাদের বর্তমান হুযূর ক্বেবলা রাহনুমা-ই শরীয়ত ও ত্বরীক্বত, আলমবর্দারে আহলে সুন্নাতের সদয় উপস্থিতিতে ও অনুমোদনক্রমে পীরে বাঙ্গাল, রওনক্বে আহলে সুন্নাত হযরতুল আল্লামা হুযূর-ই ক্বেবলা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ্ সাহেব মুদ্দাযিল্লুহুল আলী ‘গাউসিয়া কমিটি’ ও সমস্ত পীর ভাই-বোনকে ‘দা’ওয়াতে খায়র’-এর নির্দেশ দিয়েছেন এবং ক্বোরআন-সুন্নাহ্ সম্মত এ মহান কাজের প্রতি জোর তাকিদ দিয়েছেন। আল্লাহ্ তা‘আলা তা পালন করার আমাদেরকে তাওফীক্ব দিন। আ-মী-ন। —০—

পোষ্টটি ভালো লেগে থাকলে আপনার মূল্যবান মতামত জানান প্লিজ!

Leave a Comment