ইসলাম কি ছোঁয়াচে রোগের অস্তিত্ব অস্বীকার করে?-৪র্থ পর্ব

পোষ্টটি অন্যকে পড়ার সুযোগ করে দিতে শেয়ার করুন প্লিজ।

ইসলাম কি ছোঁয়াচে রোগের অস্তিত্ব অস্বীকার করে?-৪র্থ পর্ব

❏ ৮. সহীহ বুখারী,হাদিস নম্বর ৫৭০৭ এর

ব্যাখ্যা করে “আস-সুনানুল কাবীর” কিতাবে ইমামুল হাদীস আল্লামা আবু বকর বাইহাকী (রহ.) উক্ত হাদীসের অধ্যায়ের শিরোনাম দিয়ে বলেন–

باب‏:‏ لاَ عَدْوَى عَلَى الْوَجْهِ الَّذِى كَانُوا فِى الْجَاهِلِيَّةِ يَعْتَقِدُونَهُ مِنْ إِضَافَةِ الْفِعْلِ إِلَى غَيْرِ اللَّهِ تَعَالَى

“এ বিষয়ের অধ্যায় যে,কোন রোগের সংক্রমণ বলতে কিছু নেই-এ নাকচকরণ সেই সূরতের ভিত্তিতে যা জাহিলী যুগে মানুষ বিশ্বাস করতো তথা রোগ হওয়ার সম্বন্ধকে গাইরুল্লাহর দিকে করা।এ ভিত্তিতেই রোগের কোনরূপ সংক্রমণের ক্ষমতাকে নাকচ করা হয়েছে।”

[আস-সুনানুল কাবীর: ১৫৮ পৃষ্ঠা]

❏ অপরদিকে মহান আল্লাহর হুকুম হলে কোন রোগীর সংস্পর্শের দ্বারা অন্যের মধ্যে সেই রোগ পয়দা হতে পারে বিধায় এরূপ রোগী থেকে অন্যদের দূরে থাকতে বলা হয়েছে।যেমন,সেরকম একটি রোগ হলো কুষ্ঠরোগ।তাই উক্ত হাদীসের শেষাংশে সিংহকে ভয় করে তাত্থেকে দূরে থাকার ন্যায় কুষ্ঠরোগীদের থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অধিকন্তু এক্ষেত্রে ঈমানের এ সুরক্ষা উদ্দেশ্য, যাতে কুষ্ঠরোগীর সংস্পর্শে গিয়ে কারো কুষ্ঠরোগ হলে সে সেই রোগকে স্বয়ংক্রিয় সংক্রামক বলে বিশ্বাস করে তার ঈমানকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে।

⏬কোন রোগের নিজস্ব বা স্বয়ংক্রিয় কোন ক্ষমতা নেই অন্য কারো মধ্যে সংক্রমণের।বরং সব রোগই মহান আল্লাহই দিয়ে থাকেন বা তাঁর হুকুমে কারো মধ্যে সেই রোগ পয়দা হয়ে থাকে। সেই হিসেবে কোন রোগীর সংস্পর্শের কারণে আল্লাহর হুকুম হলে,সেই রোগ অন্যের মধ্যে পয়দা হতে পারে।তেমনি মহান আল্লাহ কর্তৃক রোগ দেয়ার ফয়সালা না হলে,কোন ব্যক্তি কোন কুষ্ঠরোগীর সংস্পর্শে থাকার পরও সেই রোগ কোনক্রমেই তার মধ্যে পয়দা হবে না।

❏ ৯. ইমাম বায়হাক্বী (রহ:) বলেনঃ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, (لَا عَدْوٰى) এটি ছিল মূলত জাহিলী যুগে তাদের বিশ্বাসের দৃষ্টিকোণ থেকে।তারা কাজটাকে গায়রুল্লার দিকে সম্পৃক্ত করত।অথচ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে অসুস্থ ব্যক্তির সাথে মিলিত হওয়ার কারণে আক্রান্ত করেন। এ কারণেই হাদীসে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ

فر من المجذوم فرارك من الأسد لا يورد ممرض على مصح ।

প্লেগ (মহামারির) ক্ষেত্রে এসেছে, من سمع به بأرض فلا يقدم عليه যে ব্যক্তি কোন স্থানে ঐ রোগের খবর পাবে যে,তারা তাতে আক্রান্ত সেভাবে গমন করবে না।আর এসবই আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীর অনুযায়ী।দুই হাদীসের মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য ইবনুস্ সলাহ-ও এই মতের অনুসরণ করেছেন।আর তার পরবর্তীগণ ও তার পূর্বের এক দলও।

[ফাতহুল বারী: ১০ম খন্ড,হাঃ ৫৭০৭]

🌸

وَلَا هَامَةَ

এটি এক প্রকার পাখি যাকে মানুষ অশুভ মনে করে।এটি একটি বড় পাখি।দিনের বেলায় তার চোখ দুর্বল থাকে।এ পাখি রাতের বেলায় উড়ে বেড়ায় এবং ভালো দেখে। ধ্বংস স্তুপে এ পাখি থাকে। তাকে পেঁচা বা পেচকও বলা হয়।

❏ জাহিলী যুগে ‘আরবদের এ বিশ্বাস ছিল যে,মৃতের হাড্ডি পঁচে গলে তা থেকে هَامَةَ বা প্যাঁচার জন্ম হত।আর সে তখন কবর থেকে বেরিয়ে পড়ত এবং ঘোরাঘুরি করত।আর পরিবারের খবর নেয়ার জন্য আসত।এও বলা হয়,জাহিলী যুগে এটিও বিশ্বাস ছিল যে,নিহত ব্যক্তির আত্মা থেকে هَامَةَ বা একটি পাখি জন্ম নেয়,যে বলতে থাকে,আমাকে পানি পান করাও,আমাকে পানি পান করাও।আর যখন তার হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করা হয়,তখন সে উড়ে যায়।ফলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ বিশ্বাসকে বাতিল ঘোষণা করেছেন।

🌻ইমাম আবূ দাঊদ (রহ:) তাঁর সুনানে বর্ণিত, বাকিয়্যাহ্ বলেনঃ আমি মুহাম্মাদ ইবনু রশীদ-কে জিজ্ঞেস করলাম,আল্লাহর রসূলের কথা لَا هَامَةَ সম্পর্কে।অতঃপর তিনি বলেন,জাহিলী যুগে তাঁরা বলত,কোন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করার পর তাকে দাফন করা হলে তার কবর থেকে একটি هَامَةَ বা প্যাঁচা বের হয়।

❏ ‘আরবরা এটাকে অশুভ বলেনঃ জাহিলী যুগে এটি কারো আঙ্গিনায় পতিত হলে সে ব্যক্তি তার নিজের অথবা পরিবারের কারো মৃত্যু সংবাদ মনে করত। এটি হলো মালিক ইবনু আনাস (রা:)-এর তাফসীর।আর তাদের দ্বিতীয় কথা হলো ‘আরবরা এটাকে মৃত্যুর হাড় মনে করত। বলা হতো যে, তার আত্মা বের হলে প্যাঁচা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।আর এটিই হলো অধিকাংশ ‘উলামার মত এবং এটিই প্রসিদ্ধ মত।

[মিরক্বাতুল মাফাতীহ]

🌺

وَلَا صَفَرَ

ব্যাখ্যাকার বলেনঃ জাহিলী যুগে ‘আরবদের ‘আক্বীদাহ্ ছিল এই যে,এটি হলো পেটের একটি সাপ অথবা কীট যা ক্ষুধার সময় মানুষকে দংশন করতে থাকে।

❏ ইমাম আবূ দাঊদ (রহ:) তাঁর সুনান গ্রন্থে বলেন,বাক্বিয়্যাহ্ বলেনঃ আমি মুহাম্মাদ ইবনু রশীদকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন,সফর মাস আগমনকে তারা (জাহিলী যুগের ‘আরবরা) কুলক্ষণ মনে করত।তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, لَا صَفَرَ। তিনি বলেন,আমি কাউকে বলতে শুনেছি যে,এটি হলো পেটের ব্যথা, যেটাকে তারা অন্যের শরীরে অনুপ্রবেশ করে বলে বিশ্বাস করত।

♦ইমাম আবূ দাঊদ এবং ইমাম মালিক (রহ:) বলেনঃ জাহিলী যুগে তারা যুদ্ধ-বিগ্রহের জন্য সফর মাসকে হালাল করত আবার হারামও করত। সেজন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, لَا صَفَرَ।

❏ ইমাম নাবাবী (রহ:) বলেনঃ বলা হয়ে থাকে যে,‘আরবদের বিশ্বাস ছিল পেটের ভিতর এক ধরনের প্রাণী হত, ফলে ক্ষুধার সময় দারুণ যন্ত্রণা করত, এমনকি ঐ ব্যক্তিকে মেরে ফেলত। আর তাদের বিশ্বাস ছিল এই যে, পাঁচড়া থেকে সংক্রামক ছড়িয়ে পড়ে। এ তাফসীরটি সহীহ।

❏ ইমাম কাযী ‘ইয়ায (রহ:) বলেনঃ لَا صَفَرَ বলতে তাদের ভুল ধারণাসমূহ যেমন এ মাসে বেশি বেশি বিপর্যয় ও বিপদ হয়, সম্ভবত তা খন্ডন করা হয়েছে।

[মিরক্বাতুল মাফাতীহ]

❏ ১০. মনে প্রশ্ন আসতে পারে,অনেক সময় দেখা যায় যে,কোন সুস্থ ব্যক্তি খুঁজলি- পাঁচড়ায় আক্রান্ত কারো সাথে থাকলে,তারও সেরূপ খুঁজলি-পাঁচড়া হয়।তা কীরূপে হয়? এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে রয়েছে–

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ حِينَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا عَدْوَى وَلَا صَفَرَ وَلَا هَامَةَ فَقَالَ أَعْرَابِيٌّ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَمَا بَالُ الْإِبِلِ تَكُونُ فِي الرَّمْلِ كَأَنَّهَا الظِّبَاءُ فَيَجِيءُ الْبَعِيرُ الْأَجْرَبُ فَيَدْخُلُ فِيهَا فَيُجْرِبُهَا كُلَّهَا قَالَ فَمَنْ أَعْدَى الْأَوَّلَ

হযরত আবূ হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন– “রোগের সংক্রমণ বলতে কিছু নেই,সফর মাসের কোন অশুভতা নেই এবং পেঁচার ডাকে কোন অমঙ্গল নেই”।তখন জনৈক গ্রাম্য ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন,“ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাতে সেই উটপালের অবস্থা কী–যে কোনও বালুকাময় প্রান্তরে অবস্থান করে এ অবস্থায় যে,যেন তা সুস্থ-সবল হরিণ, অতঃপর খুঁজলি-পাঁচড়ায় আক্রান্ত উটকে আনা হয় এবং সেটা সেখানে প্রবেশ করে, তারপর সেটা সব উটকে খুঁজলি-পাঁচড়ায় আক্রান্ত করে?” তার উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন “তাহলে প্রথমটাকে কে সংক্রমণ করলো?”

[সহীহু মুসলিম: হাদীস নং ২২২০]

অর্থাৎ সেই অবস্থায় প্রথম উটটিকে যেমন আল্লাহ তা‘আলা কোনকিছুর সংক্রমণ ব্যতিরেকে নতুনভাবে রোগাক্রান্ত করেছেন,ঠিক তেমনি পরেরগুলোও আল্লাহ তা‘আলারই হুকুমে রোগাক্রান্ত হয়েছে। তা কারো সংক্রমণের কারণে হয়নি।

❏ সুতরাং বুঝা গেলো–কোন রোগের স্বয়ংক্রিয় সংক্রমণ দ্বারা কারো সেই রোগ হতে পারে না।যদি সে রকম কিছু দেখা যায়,তা আসলে মহান আল্লাহর হুকুমে সেই রোগ তার মধ্যে নতুনভাবে তৈরি হয়েছে– যেমনভাবে মহান আল্লাহর হুকুমে সেই রোগ নতুনভাবে প্রথমজনের মধ্যে তৈরি হয়েছে।এ বিষয়টিকে প্রত্যেক মুমিনের এরূপেই বিশ্বাস করতে হবে।

🔼কিন্তু সেই প্রকৃত বাস্তবতাকে সম্যকরূপে উপলব্ধি না করে শুধু বাহ্যিক অবস্থা দেখে কেউ হয়তো মনে করতে পারে যে,সেই রোগীর সংস্পর্শের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার মধ্যে সেই রোগ সংক্রামিত হয়েছে এবং এভাবে সে তার ঈমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলতে পারে। এ জন্য এ ধরনের পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়া থেকে নিজেকে দূরে রাখার জন্য হাদীস শরীফে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে রয়েছে–

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ رضي الله عنه أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ‏:‏ لاَ يُورِدُ مُمْرِضٌ عَلَى مُصِحٍّ‏.‏

হযরত আবূ হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন– “রোগগ্রস্ত উট যেন সুস্থ উটের উপরে উপনীত না হয়।”

[সহীহু মুসলিম: হাদীস নং ৫৯০৫]

🌹এ হাদীসে ঈমানের সুরক্ষার জন্য সেরূপ পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে নিষেধ করা হয়েছে যে,কেউ তার সুস্থ জন্তুকে কোন রোগাক্রান্ত জন্তুর সাথে রাখবে। কেননা,এতে সেই সুস্থ জন্তু রোগাক্রান্ত হলে হয়তো তার মনে কোনভাবে এ ধারণার উদ্রেক হতে পারে যে,তার সুস্থ জন্তুকে সেই রোগাক্রান্ত জন্তুর সাথে রাখার কারণেই সেই রোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার মধ্যে সংক্রামিত হয়েছে।অথচ এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল ও ঈমানের পরিপন্থী। বরং আল্লাহ তা‘আলার হুকুমেই সেই রোগ সুস্থ জন্তুর মধ্যে পয়দা হয়েছে,তা সেই রোগের নিজস্ব সংক্রমণের দ্বারা হয়নি।

❏ ঈমানের সুরক্ষার জন্য এ ব্যবস্থা অবলম্বন করা বিধেয় যে,তাই সুস্থ ব্যক্তি একান্ত প্রয়োজন না হলে দুরারোগ্যে রোগাক্রান্ত ব্যক্তির নিকটে যাবে না।যাতে তার নিকট যাওয়ার দ্বারা সেই রোগ মহান আল্লাহর হুকুমে তার মধ্যে পয়দা হলে তাতে যেন সে বিভ্রান্তিতে পড়ে সেই রোগকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংক্রামক মনে করে ঈমানকে নষ্ট করার প্রয়াস না পায়।

❏ ১১. এ কারনে হাদীসে সেরূপ রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে মানুষের জমায়েত (গন জমায়েত/কোলাহলপূর্ন জায়গায়) থেকে ফিরে তার আবাসে চলে যাওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।হাদিস শরীফে ইরশাদ হয়েছে

عَنْ عَمْرِو بْنِ الشَّرِيدِ عَنْ أَبِيهِ قَالَ كَانَ فِي وَفْدِ ثَقِيفٍ رَجُلٌ مَجْذُومٌ فَأَرْسَلَ إِلَيْهِ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّا قَدْ بَايَعْنَاكَ فَارْجِعْ

হযরত আমর ইবনে শারীদ স্বীয় পিতা শারীদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন, বনী সাক্বীফের প্রতিনিধি দলে একজন ব্যক্তি কুষ্ঠরোগী ছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার নিকট সংবাদ পাঠিয়ে বললেন–“নিশ্চয়ই আমরা তোমাকে বাই‘আত করে নিয়েছি।সুতরাং তুমি ফিরে যাও।”

[সহীহু মুসলিম: হাদীস নং ২২৩১]

❏ কিন্তু প্রয়োজন হলে কোন সুস্থ ব্যক্তির সেরূপ রোগীর নিকট যেতে কোন অসুবিধা নেই।কেননা,আল্লাহর হুকুম ছাড়া কোন রোগই কারো মধ্যে সংক্রমণ করতে পারে না–এ বিশ্বাস রাখা প্রত্যেক মুমিনের জন্য জরুরী।অধিকন্তু সেই রোগীর শুশ্রূষার জন্য অন্য কেউ না থাকলে তার জন্য তার নিকট যাওয়া এবং তার শুশ্রূষা করা আবশ্যক।তবে সেক্ষেত্রে ঈমানের সুরক্ষার জন্য তখন সে ইচ্ছা করলে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে,যেমন: মুখে মাস্ক লাগিয়ে এবং শরীরে জীবানুরোধক পোশাক পরে তার কাছে যেতে পারে।এতে আল্লাহর ‍হুকুমে সে সেই রোগে আক্রান্ত হলে,তখন সেই রোগীর সংস্পর্শের কারণে সেই রোগের সংক্রমণের শিকার হয়েছে বলে কুফরী ভাবনার পরীক্ষার মধ্যে সে পড়বে না।

⏩আবার কেউ যদি প্রবল ঈমানের অধিকারী হয় এবং রোগীর সংস্পর্শে গিয়ে সেই রোগে আক্রান্ত হলেও ছোঁয়াচের বা সংক্রমণের কুফরী বিশ্বাসে তার আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা না থাকে, তখন কোনরূপ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ না করেও সেরূপ রোগীর সংস্পর্শে যেতে পারে।যেমন: হাদীস শরীফে রয়েছে–

عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَخَذَ بِيَدِ مَجْذُومٍ فَأَدْخَلَهُ مَعَهُ فِي الْقَصْعَةِ ثُمَّ قَالَ كُلْ بِسْمِ اللَّهِ ثِقَةً بِاللَّهِ وَتَوَكُّلًا عَلَيْهِ

হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে যে,রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একজন কুষ্ঠরোগীর হাত ধরলেন, অতঃপর তার হাতকে তার সাথে (খাবার খাওয়ানোর জন্য) স্বীয় বরতনে প্রবিষ্ট করলেন। তারপর বললেন–“আল্লাহর নামে খাও। আল্লাহর উপরে অবিচল নির্ভরতা এবং তাঁর উপরে অনড় ভরসা।”

[জামি‘উত তিরমিযী, হাদীস নং ১৮১৭/ সুনানে আবূ দাউদ, হাদীস নং ৩৯২৫]

🔷তেমনিভাবে অপর হাদীসে এ ধরনের কুষ্ঠরোগীর নির্দ্বিধায় সুস্থ মানুষের সাথে ঘরে খাওয়া-থাকার বর্ণনা রয়েছে।সেই হাদীসটি হলো–

عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ كَانَ لَنَا مَوْلَى مَجْذُومٌ فَكَانَ يَأْكُلُ فِي صِحَافِي وَيَشْرَبُ فِي أَقْدَاحِي وَيَنَامُ عَلَى فِرَاشِي

হযরত আয়িশা (রা.) হতে বর্ণিত,তিনি বলেন– “আমাদের একজন আযাদকৃত গোলাম ছিলো যে কুষ্ঠরোগী ছিলো।সে আঁমার বরতনে খাবার খেতো, আঁমার গ্লাসে পানি পান করতো এবং আঁমার বিছানায় ঘুমাতো।”

[তুহফাতুল আহওয়াযী শারহু জামি‘ তিরমিযী,৫ম খণ্ড,৪৩৮ পৃষ্ঠা]

❏ অধিকন্তু মজবুত ঈমানের অধিকারী মুসলিমদের এভাবে সে ধরনের রোগীর সংস্পর্শে গিয়ে মহান আল্লাহর প্রতি বিনয়াবনত হওয়ার জন্য বলা হয়েছে।এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে রয়েছে–

عَنْ أَبِي ذَرٍّ قَالَ كُلْ مَعَ صَاحِبِ الْبَلَاءِ تَوَاضُعًا لِرَبِّك وَإِيمَانًا

হযরত আবু যর (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন– রোগ-বালাইগ্রস্ত ব্যক্তির সাথে খাও তোমার প্রতিপালকের প্রতি বিনয়াবনত হয়ে এবং তাঁর প্রতি অকুণ্ঠ ঈমান রূপে।”

[আল-জামি‘উস সগীর: হাদীস নং ৬৩৮৯]

⏩বস্তুত এ নির্দেশনা তাদের জন্য যারা মজবুত ঈমানের অধিকারী–যাদের ঈমান ও ইয়াকীনে কোন অবস্থাতেই চিড় ধরতে পারে না এবং সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহর হুকুমের প্রতি অবিচল আস্থা রাখতে পারে।এ মর্মে উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় ফাইজুল কাদীর কিতাবে বলা হয়েছে–

فَإِنَّهُ لَا يُصِيبُكَ مِنْهُ شَيْءٌ إِلَّا بِتَقْدِيرِ اللَّهِ تَعَالَى، وَهَذَا خِطَابٌ لِمَنْ قَوِيَ يَقِينُهُ، أَمَّا مَنْ لَمْ يَصِلْ إِلَى هَذِهِ الدَّرَجَةِ فَمَأْمُورٌ بِعَدَمِ أَكْلِهِ مَعَهُ كَمَا يُفِيدُهُ خَبَرُ: (فِرِّ مِنَ الْمَجْذُومِ)

“উক্ত হাদীসে তোমাকে কুষ্ঠরোগী বা সে ধরনের রোগ-বালাইয়ে আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে মহান আল্লাহর প্রতি অকুণ্ঠ বিনয় ও ঈমান পোষণ করে খাবার খাওয়ার জন্য বলা হয়েছে এ কারণে যে,সেই রোগীর থেকে কোনকিছু তোমার নিকট মহান আল্লাহর ফয়সালা ব্যতিরেকে পৌঁছবে না। আর এ সম্বোধন ঐ ব্যক্তির জন্য যার ঈমান ও ইয়াকীন মজবুত।কিন্তু যে ব্যক্তি সেই পর্যায়ে পৌঁছতে পারে নি,তার জন্য হুকুম হলো–সে সেরূপ রোগীর সাথে খাবে না। যেমন সে ব্যাপারে অপর হাদীসে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে যে,তুমি কুষ্ঠরোগী থেকে পলায়ন করো।”

[ফাইজুল ক্বাদীর শরহু জামিউস সগীর, ৫ম খণ্ড, ৪৩ পৃষ্ঠা]

🌸অধিকন্তু,আল্লাহ তা‘আলা অনেক সময় বান্দাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য কোন রোগীর নিকটে যাওয়াকে তাদের মধ্যে সেই রোগ পয়দা হওয়ার ইল্লত বা কারণ বানাতে পারেন।যেমন,পানির সংস্পর্শে যাওয়াকে তাদের ঠাণ্ডা লাগার কারণ বানাতে পারেন।বিষয়টিকে এভাবে ব্যাখ্যা করে উপরিউক্ত হাদীসের বর্ণনায় “আস-সুনানুল কাবীর” কিতাবে আল্লামা আবু বকর বাইহাকী (রহ.) সেই হাদীসের অধ্যায়ের শিরোনামে বলেন–

باب‏:‏ لاَ يُورِدُ مُمْرِضٌ عَلَى مُصِحٍّ فَقَدْ يَجْعَلُ اللَّهُ تَعَالَى بِمَشِيئَتِهِ مُخَالَطَتَهُ إِيَّاهُ سَبَبًا لِمَرَضِهِ

“এ সম্পর্কিত অধ্যায় যে,রোগাক্রান্ত উট সুস্থ উটের উপর উপনীত হবে না; যেহেতু কখনো আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় ইচ্ছায় অসুস্থের সাথে সুস্থের মেলামেশাকে তার সেই রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণ বানিয়ে থাকেন।”

[আস-সুনানুল কাবীর: ১৬৩ পৃষ্ঠা]

🌺কিন্তু সেই অবস্থায় সেই ব্যক্তির সেই রোগে আক্রান্ত হওয়া এ কারণে নয় যে, সেই রোগটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংক্রামক বা ছোঁয়াচে।বরং সেই রোগে তার আক্রান্ত হওয়ার কারণ হলো–আল্লাহ তা‘আলা তাকে পরীক্ষা করার জন্য এ ফায়সালা করেছেন যে,উক্ত রোগীর সংস্পর্শে এসে সেও সেই রোগে আক্রান্ত হবে।

❏ এমতাবস্থায় পরীক্ষার বিষয় হলো এটা যে,সেই বান্দা কি সেই রোগে আক্রান্ত হয়ে সেই রোগকে স্বয়ংক্রিয় সংক্রামক মনে করে তার ঈমানকে নষ্ট করে,নাকি সেই রোগীর সংস্পর্শে সেই রোগ হলেও তা মহান আল্লাহর হুকুমেই হয়েছে এবং আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে ফয়সালা হিসেবে হয়েছে বলে বিশ্বাস করে সে স্বীয় ঈমানকে হিফাজত করে।বলা বাহুল্য, এরূপ ক্ষেত্রে বান্দার এটাই কর্তব্য যে, সেই রোগীর সংস্পর্শে এসে তার রোগ হওয়ার কারণে সে সেই রোগকে স্বয়ংক্রিয় সংক্রামক বলে বিশ্বাস করবে না।বরং সেই অবস্থায়ও তা মহান আল্লাহর হুকুমেই হয়েছে বলে বিশ্বাস করবে এবং নিজের ঈমানকে অটল রাখবে।

পোষ্টটি ভালো লেগে থাকলে আপনার মূল্যবান মতামত জানান প্লিজ!

Leave a Comment