ইসলামে মাযহাবের প্রয়োজনীয়তা

পোষ্টটি অন্যকে পড়ার সুযোগ করে দিতে শেয়ার করুন প্লিজ।

________পর্ব–(০১)_________

১)মাজহাব কি ও কেন ? মাজহাব মানার কি কোন দলীল নেই ? তাহলে আসুন জেনে নেই ইসলামে মাজহাবের গুরুত্ব কতটুকু ?
২)আমাদের অনেক ভাই বলেন, সাহাবায়ে কেরাম রাদ্বিয়াল্লাহু তা’লা আনহুম গনের যুগে তাকলিদ ছিলনা। তাই আমরা ও কারো তাকলিদ করবোনা মাজহাব মানবনা। এটা কি ঠিক?
৩) “চার ইমামের চার মাযহাবের কারণে বিভক্তি ছড়িয়ে পড়েছে, এজন্য চার ইমামকেই ছেড়ে দিতে হবে একতা রক্ষার জন্য। আহলে হাদীস দাবিদারদের উক্ত দাবির বিষয়ে আপনাদের ব্যাখ্যা কাম্য।
৪) ইমামগনের মাজহাব কি ছিলো ?
৫) সাহাবীদের যামানায় মাযহাব ছিল
৬) কথিত আহলে হাদীস নিজেদের বিভিন্ন দল/মাযহাব
৭)ইমাম আবু হানিফা রাহ: যেসব সাহাবাদের সাক্ষাত লাভে ধন্য হয়েছেন, কিংবা যাদের থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন
৮) আহলে হাদিস মাযহাবীদের প্রতি ৩৮ টি প্রশ্ন
>>>>>>>
মাজহাব শব্দের অর্থ – চলার পথ
ইসলামি পরিভাষায় কোরআন – সুন্নাহর প্রদর্শিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সিদ্দিকীন (রাঃ), শোহাদায়ে কেরাম (রহঃ) ও সতকর্মশীল ব্যক্তিবর্গের মনোনীত পথের নামই হল মাজহাব। ভিন্য অর্থে এটাই সিরাতে মুস্তাকিম ও সরল পথ ।

সুতরাং মাজহাব কোন নতুন ধর্ম, মতবাদ বা কোরআন সুন্নাহ বহির্ভূত ব্যক্তি বিশেষের নিজস্ব মতের নাম নয়, বরং মাজহাব হল কোরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কেয়াসের ভিত্তিতে বিভিন্ন ধর্মীয় সমস্যার প্রদত্ত সমাধান যা এবিষয়ে বিজ্ঞ ব্যক্তিগণ প্রদান করেছেন। মাজহাব হল, কোরআন-সুন্নাহর তে অস্পষ্ট আয়াতও হাদীস গুলুর ব্যাখ্যা মাত্র।

সুতরাং কোন ইমাম ই রাসুলের কথার বাহিরে এক কদম ও দেননি । সুতরাং যেহেতু বর্তমানের চার মাজহাবই ইসলামের মুল ৪ টি ভিত্তি তথা কোরআন, সুন্নাহ, ইজমা, ও কিয়াসের আলোকে প্রণীত । আর এই ৪ টি মাযহাবের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উনার ও সমর্থন ছিল। যা আমরা মুয়াজ (রা:) এর হাদিসের মাধ্যমে জানতে পারি। তাহলে মাজহাব মানার মানেই হল রাসুলের কথা মানা । এখানে একটা প্রশ্ন? হাদিস শরীফে মূলত পাওয়া যায়, কুরআন – সুন্নাহ মানার কথা তাহলে মাযহাব মানার দরকার কি?
হাদিসের কথা অবশ্যই ঠিক । কিন্তু কুরআন–সুন্নাহ শরিফের প্রত্যক্ষ –পরোক্ষ , সুস্পষ্ট –অস্পষ্ট ও পরস্পর বিরোধপূর্ণ জটিল বিষয়ের যথাযথ সমাধান বের করে তা অনুসরণ করে মূল লক্ষে যাওয়া সকলের পক্ষে মোটে ও সম্ভবপর নয়। বরং এ সকল বিষয়ে পূর্ণ পারদর্শী ব্যক্তি বর্গের দেওয়া সমাধান মেনে চলেই মূল লক্ষে যাওয়া সম্ভব।

এখানে অনেকে প্রশ্ন করেন, এক সময় বাংলায় কোরআন হাদিস ছিলনা তাই আমরা মৌলবীদের কথা মেনেছি। এখন আর দরকার নাই। কেননা বাংলায় কোরআন ও হাদিসের অনেক বই পাওয়া জায়। তাই আমরা এগুলু দেখে দেখে আমল করব???????

এদের উত্তরে আমি প্রথমে – বলবো ভাই দেখুন, আপনি হয়ত বাংলা পড়তে পারেন। কিন্তু আমাদের দেশে লাখো মানুষ আছে যারা বাংলা পড়া থাক দূরের কথা তারা তো ক, খ ই চিনেনা এদের কি হবে? এমন আবস্হা পূবেও ছিল, আছে এবং থাকবে ৷ তাছাডা আরবী কোরআন হাদীসতো বাদই দিলাম বিশ্বে এখনও লাখো-কুটি মুসলিম এমনও রয়েছেন যারা আরবী কোরআন হাদীস পড়তে পারেনা, ব্যখা জানাতো দূরের কথা ৷ মাজহাব কি মাজহাব মানার কি প্রয়োজন আচে? বিস্তারিত।

দ্বিতীয়ত – শুধু বই পড়েই সব জিনিসের সমাধান দেয়া যায়না । বিশেষ করে ঐ সকল জিনিস যে গুলুর জন্য রয়েছে কিছু নীতি মালা ও কোর্স, প্রশিক্ষণ । যেমন, ডাক্তারি বিসয়গুলু। বাংলায় এবিষয়ে বইয়ের কোন অভাব নেই। বরং ফুটপাথেও পাওয়া যায়।

অনুরূপ উকিলি, সংবিধান থেকে নিয়ে সকল আইনের বই কিন্তু কিনতে পাওয়া যায়। এখন বলুন তো কেউ একজন যদি এ বই গুলু কিনে এনে আগা –গোঁড়া মুখস্ত করে ফেলে এবং অনায়েসে বলতে পারে সরকার কি তাকে ডাক্তার/উকিল হিসেবে সার্টিফিকেট দিবে? আর আপনিও সমস্যা নিয়ে তার কাছে যাবেন ? অথবা আপনি নিজে বাংলা পরে নিজের চিকিৎসা ও আইনি বিষয় সমাধান করেন? সেক্ষেত্রে তো ঠিকই বলবেন যে এ গুলু আমার কাজ না। এ প্রশ্নের যে জবাব যারা মাজহাব মানবেনা বলে তাদের ও একি জবাব? তাছাড়া আমরা সকলের জন্য সমহারে মাজাহাব মানা ওয়াজিব এ কথা ও তো বলিনা ।

বরং আমরা বলি মাজহাবের রয়েছে বিভিন্ন স্তর । যাদের এজতেহাদ করার ক্ষমতা আছে তাদের জন্য অন্য কারো মাযহাব মানার প্রয়োজন নেই ৷ আর যাদের কাছে এজতেহাদ করার ক্ষমতাতো দূরে থাক কোন কিছু পড়তে ও জানেনা তাদের জন্যই মাযহাব বা তাকলীদ৷

**** আমাদের অনেক ভাই বলেন, মাযহাব মানার কোন দলীল নাই। বরং এটা ভিত্তিহীন, বানানো, বিদাআত। আসলে কি তাই?
উত্তরঃ
না ভাই, কথাটি সঠিক নয়। মাযহাব মানার অবশ্যই দলীল প্রমান আছে। আমাদের কে প্রথমে একটা বিষয় পরিষ্কার করতে হবে। তা হল, মাজহাব মানার অর্থ কি ? এর একটা অর্থ হতে পারে কোরআন –সুন্নাহ বাদ দিয়ে কোন ব্যক্তির কথা মানা । আরেকটা অর্থ হল, ধর্মীয় বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য কোন বিজ্ঞ ব্যক্তির ফায়সালা মেনে নেওয়া। যা তিনি কোরআন –সুন্নাহ কে সামনে রেখে প্রদান করেছেন। তার থেকে বর্ণিত প্রতিটি মাসালায় তিনি কোরআন – হাদিসকে ই প্রাধান্য দিয়েছেন।

সুতরাং এদের কথা মানার অর্থই হল, কোরআন হাদিস মানা । মূলত এদেরকে মানা উদ্দেশ্য নয়, এবং মানাও হয়না । বরং তাদের দেখান মূলনীতি অনুযায়ী কোরআন- সুন্নার উপর আমল করা ই উদ্দেশ্য, এবং তাই করা হয়। এমন নয় যে, তারা একেকটা নতুন নিয়ম- কানুন দাড় করিয়েছেন। আর আমরা এ গুলোর অনসরন করছি। সারকথা, দ্বীন মানার জন্য তাদের মাতামত গুলু কে সহায়ক হিসেবে নেয়া হয় মাত্র।
কুরআনের আলোকে মাযহাবঃ কুরআনের মোট ৩ টি আয়াত এবিষয়ে দলীল হিসেবে তুলে ধরছি ।
> ১ ম আয়াতঃ
ﻓﺎ ﺳﺌﻠﻮﺍ ﺍﻫﻞ ﺍﻟﺬﻛﺮ
ﺍﻥ ﻛﻨﺘﻢ ﻻﺗﻌﻠﻤﻮﻥ
তোমাদের কোন বিষয়ে জানা না থাকলে আহলে ইলমদের নিকট জিজ্ঞাসা কর ।
সুরা,

আলআম্বিয়াঃ আয়াত শরিফ ৭,ও

সুরা আন নাহালঃ আয়াত শরিফ ৪৩,

টীকাঃ এ আয়াত যদিও বিশেষ ঘটনার সাথে যুক্ত । কিন্তু কুরআনের একটি মূলনীতি হল, যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে তা নাযিল হয়েছে তা এতে সীমাবদ্ধ থাকেনা। বরং শব্দের ব্যাপক অর্থ ব্যাবহার হবে।
বিশ্লেষণঃ দেখুন, আয়াতটির হুকুম রহিত হয়নি। আয়াতে বলা হচ্ছে, অজানা বিষয়ে বিজ্ঞ লোকদের অনুসরণ করার জন্য। এখন আমরা যদি বলি, না তাদের অনুসরণ কারা যাবেনা। তাহলে এটা কি কোরআনের বিরোধিতা হবেনা। আর অজানা বিষয়ে বিজ্ঞদের অনুসরণ করার নাম ই হল, তাকলিদ। সুতরাং তাকলিদ কোরআন দ্বারা প্রমাণিত।
আল্লামা খতীবে বাগদাদি (রাহ) বলেন,
কোরআন-সুন্নাহ শরীফের যে সকল বিষয়ে সাধারণ লোক সরাসরি শরীয়তের বিধান আহরণে অক্ষম, তাদের জন্য কোন বিজ্ঞ আলেমের তাকলিদ করা আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক জায়েজ।
সুত্রঃ

আল ফাকিহ ওয়ালমুতাফাককিহ ৩০৬।

আল্লামা ফাখ্রুদ্দিন ও আল্লামা আলুসি উক্ত আয়াতের তাফসীরে লিখেন,
উপরুল্লিখিত আয়াতের ভিত্তিতে অনেকে ই মুজতাহিদ ইমামগনের তাকলিদ বৈধ ও অনভিজ্ঞ সবাইকে বিজ্ঞ মুজতাহিদের শরণাপন্ন হওয়া ওয়াজিব বলেন।
সুত্রঃ

তাফসিরে কাবির১৯/১৯,

রুহুল মায়ানি-১৪/১৪৮,

মাঝহারি- ৫-৩৪২,

লুবাব-১২/৬১,

কুরতুবি ১০/৭২

> ২য় আয়াতঃ

ﺍﻃﻴﻊ ﺍﻟﻠﻪ ﻭﺍﻃﻴﻊ ﺍﻟﺮّﺳﻮﻝ ﻭﺃﻭﻟﻰ ﺃﻻﻣﺮ ﻣﻦ ﻛﻢ ﺍﻟﺦ
হে ইমানদারগণ ! আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য কর। আর আনুগত্য করতোমাদের মধ্যে যারা “ উলিল আমর” তাদের।

সুরা আন নিসাঃ আয়াত শরিফ ৫৯।

বিশ্লেষণঃ
দেখুন, আয়াতে আল্লাহ ও তার রাসুলের পাশাপাশি উলিল আমরের আনুগত্যকরতে বলা হয়েছে। আসুন, দেখি এ ব্যাপারে মুফাসসির গণ কি বলেন। তাফসিরগ্রন্থাবলিতে উলিল
আমরের ২ টি তাফসীর পাওয়া যায়।
** ১মঃ কুরআন– সুন্নার ইলমের অধিকারী ফাকিহ ও মুজতাহিদগণ।
** ২য়ঃ মুসলিম শাসক বর্গ ।

>> ১ম তাফসীর টি অধিক গ্রহণযোগ্য ।
কেননা, এর পক্ষে মতামত দিয়েছেন, হযরত জাবের, এবনে আব্বাস, মুজাহিদ, আতা বিন আবি রাবাহ, আতা বিন সাইব, হাসান বাসরি ও আলিয়াহ (রাহ) এর মত সেরা মুফাসসিরগন । মাত্র দু একজন ২য় মত টি ব্যক্ত করেছেন।

আল্লামা রাযি (রাহ) প্রথম তাফসীরের সমর্থনে সারগর্ভ যুক্তি প্রমান অবতারনা করে বলেছেন, বস্তুত আয়াতে উলিল আমর ও উলামা শব্দ দুটি সমার্থক। ইমাম আবু বাকার (রাহ) বলেন, এখানে মূলত কোন বিরোধ নেই। মূলত উলিল আমর শব্দ টি ব্যপক।
সুতরাং ধর্মীয় বিষয়ে ১ম তাফসীর গৃহীত হবে। আর আহকাম ও মাসআলার ক্ষেত্রে ২য় তাফসীর গ্রহন হবে। আয়াতের অর্থ হবে, তোমরা রাজনীতি প্রশাসনিক ক্ষেত্রে শাসকবর্গের কথা আর আহকাম ও মাসআলার ক্ষেত্রে আলিমগণের ইতায়াত কর ।
সুত্রঃ

আহকামুল কুরআন–২/২৫৬,

তাফসিরে কাবির–৩/ ৩৩৪ ।

মোট কথাঃ আলোচ্য আয়াতের আলোকে আল্লাহ ও রাসুলের ইতায়াত যেমন ফরয তেমনি কুরআন ও সুন্নার ব্যাখ্যা দাতা হিসেবে আলিম ও মুঝতাহিদ্গনের ইতায়াত ও ফারয। আয়াতের শেষাংশের ব্যাখ্যা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন, যেখানে বলা হয়েছে মতবিরোধ পূর্ণ ব্যাপারে আল্লাহ ও তার রাসুলের দিকে ফিরার জন্য । এ ব্যাপারে আমরা বলবো, মূলত এ দ্বিতীয়াংশের মাধ্যমে ফকিহ ও মুজতাহিদদেরকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। সাধারন মানুষের জন্য নয়। যা আহলে হাদিসদের ইমাম জনাব নবাব সিদ্দিক হাসান খান তার লিখিত কিতাব “ফাতহুল বায়ান “ নামক গ্রন্থে ও স্বীকার করেছেন,
তার ভাষায়ঃ
ﻭﺍﻟﻈﺎﻫﺮﺃﻥ ﻩّ ﺧﻄﺎﺏ ﻣﺴﺘﻘﻞّ ﻣﺴﺘﺄﻧﻒ ﻣﻮﺟّﻪ ﻟﻠﻤﺠﺘﻬﺪﻳﻦ
স্পষ্টতই এখানে মুজতাহিদ গণকে সতন্ত্রভাবে সম্ভোধন করা হয়েছে। এ দুটি আয়াতের আলোচনা বিস্তারিতভাবে করলাম। আশা করি আমার লা মাজহাবী ভাইগণ একটু হলেও চিন্তা-করবেন।

    পোষ্টটি ভালো লেগে থাকলে আপনার মূল্যবান মতামত জানান প্লিজ!

    Leave a Comment