ইমামগণের মতে মিলাদুন্নবী (ﷺ) উপলক্ষে যেসব আমল উত্তম :

পোষ্টটি অন্যকে পড়ার সুযোগ করে দিতে শেয়ার করুন প্লিজ।

ইমামুল আল্লামাহ নাসিরুদ্দীন মোবারক ইবনে বাতাহ (রহ) : 

৪র্থ যুগের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইমামুল আল্লামাহ নাসিরুদ্দীন মোবারক ইবনে বাতাহ (রহঃ) পবিত্র মিলাদ সম্পর্কে নিজ ফতোয়ায় লিখেন,

মহানবী (ﷺ) ওনার মিলাদুন্নবীর রাতে কোন ব্যক্তি কিছু অর্থকরি ব্যয় করলে এবং জনগনকে সমবেত করে তাদেরকে পানাহার করালে বা রাসূল (ﷺ) ওনার জন্ম সম্পর্কে বর্ণিত হাদীস সমূহ এবং অলোকিক ঘটনা শুনালে তা যদি সব রাসূল (ﷺ) ওনার জন্মের প্রতি আনন্দ ও খুশি প্রকাশ করার জন্য হয়ে থাকে তাহলে শরীয়ত মতে তা জায়েজ আর এসব কাজের জন্য সংশ্লীষ্ঠ কর্তাকে ছওয়াব প্রদান করা হয়,যদি তার উদ্দেশ্য ভাল হয়।

[আদ-দুররুল মুনাজ্জম ফী আমলে ওয়া হুকমে মাওলিদুন নাবীয়্যিল আযম-পৃষ্ঠা-নং-১৯৭-১৯৮]

👉 ইমাম জামাল উদ্দিন আব্দুর রহমান (রহঃ)

ইমাম জামাল উদ্দিন আব্দুর রহমান ইবনে আব্দুল মালিক আল কাতানী (রহঃ) পবিত্র মিলাদ সম্পর্কে লিখেন,

রাসূল (ﷺ) এর জন্ম দিনে বা অন্য কোন সময়ে ওনার জন্ম কাহিনী ও ঘটনাবলী আলোচনা করা সম্মান, বুযুর্গী ও মাহাত্ব্য লাভের জন্য নাযাত লাভের কারণ এবং তার জন্ম দিনে যারা আনন্দ ও খুশী প্রকাশ করে তাদের পরকালে শাস্তি হালকা ও কম হওয়ার কারণে পরিণত হয়।

[সুবুলুল হুদা ওয়ার রাসাদ ফী সীরাতি খাইরিল ইবাদ-১ম খন্ড-পৃস্ঠা নং-৩৬৪]

👉 ইমামুল আল্লামা জহীর উদ্দিন ইবনে জাফর (রহঃ) 

ইমামুল আল্লামা জহীর উদ্দিন ইবনে জাফর (রহঃ) পবিত্র মিলাদ শরীফ সম্পর্কে লিখেন,

শরীয়াতে মিলাদুন্নবী অনুষ্ঠান করা হচ্ছে বিদাতে হাসানা। অনুষ্ঠানকারী লোকদের সমবেত করে অনুষ্টান করতে চাইলে সকলে হুযুর পাক (ﷺ) ওনার প্রতি দুরুদ পাঠ করতে এবং গরীব মিছকিনদের পানাহার করাতে ইচ্ছা করলে, এ নিয়মে ও এ শর্তে মিলদুন্নবী অনুষ্টান করলে এজন্য তখন তাকে (আল্লাহ) ছ্ওয়াবও প্রদান করেন।

[সুবুলুল হুদা ওয়ার রাসাদ ফী সীরাতি খাইরিল ইবাদ-১ম খন্ড-পৃস্ঠা নং-৩৬৪.]

👉 সালাফীদের ইমাম ইবনে কাইয়্যুম (মৃ:-৭৫১ হি:)

ইবনে কাইয়্যুম তার কিতাবে বলেন যে,

নবী করীম (ﷺ) ওনার মিলাদ মাহফিলে সুললিত কন্ঠস্বর শ্রবণ করা কিংবা ধর্মীয় বিষয় শ্রবণ করার মাধ্যমে অন্তরে প্রশান্তি লাভ হয়। কারণ নবী করীম (ﷺ) থেকে শ্রোতাকে নূর দেওয়া হয়ে থাকে।

[মাদারেকুছ ছালিকিন-৪৯৮ পৃ:]

  • বুখারী শারীফের আরেক অন্যতম নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘ফাতহুল বারী’ এর লেখক ইমাম ইবন হাজর আসকলানী (রঃ) বলেন-

মহান

বী (দ:)-এর মীলাদ দিবস উদযাপন সম্পর্কে হযরত ইমামকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি লিখিতভাবে যে উত্তর দেন তা নিম্নরূপ

: মীলাদুন্নবী (দ:) উদযাপনের উৎস বলতে এটি এমন এক বেদআত (উদ্ভাবন) যা প্রথম তিন শতকের সালাফ আস্ সালেহীন (পুণ্যাত্মাবৃন্দ) কর্তৃক আমাদেরকে জ্ঞাত করানো হয় নি, যদিও এতে প্রশংসনীয় ও প্রশংসনীয় নয় উভয় দিকই বিদ্যমান। কেউ প্রশংসনীয় দিকগুলো গ্রহণ করে প্রশংসনীয় নয় এমন দিকগুলো বর্জন করায় যত্নবান হলে তা বেদআতে হাসানা তথা কল্যাণময় নতুন প্রথা হবে। আর তা না হলে এর উল্টো হবে। এ বিষয়ের বৈধতা প্রতীয়মানকারী একটি নির্ভরযোগ্য শরীয়তের দলিল আমার সামনে এসেছে, আর তা হলো বুখারী ও মুসলিম শরীফে উদ্ধৃত সহীহ হাদীস যা’তে বর্ণিত হয়েছে যে মহানবী (দ:) মদীনা মোনাওয়ারায় হিজরত করে দেখতে পান সেখানকার ইহুদীরা ১০ই মহররম (আশুরা) তারিখে রোযা রাখেন।

— হুসনুল মাকসাদ ফী আমলিল মওলিদ, ৬৩ পৃষ্ঠা

👉 শায়খুল ইসলাম ও ৩ লক্ষ হাদিসের হাফেজ ইমাম ইবনে হাজর আসকালানী (রহঃ) বলেন-

এমতাবস্থায় তিনি তাদেরকে [এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা উত্তর দেন, ‘এই দিনে আল্লাহতা’লা ফেরাউনকে পানিতে ডুবিয়ে মূসা (আ)-কে রক্ষা করেন। তাই আমরা মহান প্রভুর দরবারে এর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে রোযা রেখে থাকি।’ এই ঘটনা পরিস্ফুট করে যে আল্লাহতা’লার রহমত অবতরণের কিংবা বালা-মসীবত দূর হওয়ার কোনো বিশেষ দিনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, সেই উদ্দেশ্যে বার্ষিকী হিসেবে তা উদযাপনের সময় :

– নামায, 

– রোযা, 

– দান-সদকাহ বা 

– কুরআন তেলাওয়াতের মতো বিভিন্ন এবাদত-বন্দেগী পালন করা শরীয়তে জায়েয। আর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর মীলাদের (ধরণীতে শুভাগমন দিবসের) চেয়ে আল্লাহর বড় রহমত কী-ই বা হতে পারে? এরই আলোকে প্রত্যেকের উচিত হযরত মূসা (আ) ও ১০ই মহররমের ঘটনার (দালিলিক ভিত্তির) সাথে সঙ্গতি রেখে মীলাদুন্নবী (ﷺ) দিবস উদযাপন করা; তবে যাঁরা এটি বিবেচনায় নেন না, তাঁরা (রবিউল আউয়াল) মাসের যে কোনো দিন তা উদযাপনে আপত্তি করেন না; অপর দিকে কেউ কেউ বছরের যে কোনো সময় নির্দিষ্ট ক করা ব্যতীত সারা বছর উদযাপনকে কোনো প্রকার ব্যতিক্রম ছাড়াই বৈধ জেনেছেন।

[হুসনুল মাকসাদ ফী আমলিল মওলিদ’, ৬৪ পৃষ্ঠা]।

👉 তিনি আরো বলেন :

”আমি মওলিদের বৈধতার দলিল সুন্নাহ’র আরেকটি উৎস থেকে পেয়েছি (আশুরার হাদীস থেকে বের করা সিদ্ধান্তের বাইরে)। এই হাদীস ইমাম বায়হাকী (রহ) হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন: ‘হুযূর পাক (ﷺ) নবুয়্যত প্রাপ্তির পর নিজের নামে আকিকাহ করেন; অথচ তাঁর দাদা আবদুল মোত্তালিব তাঁরই বেলাদতের সপ্তম দিবসে তাঁর নামে আকিকাহ করেছিলেন, আর আকিকাহ দু’বার করা যায় না। অতএব, রাসূলে খোদা (ﷺ) বিশ্বজগতে আল্লাহর রহমত হিসেবে প্রেরিত হওয়ায় মহান প্রভুর দরবারে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্যে এটি করেছিলেন, তাঁর উম্মতকে সম্মানিত করার জন্যেও, যেমনিভাবে তিনি নিজের ওসীলা দিয়ে দোয়া করতেন। তাই আমাদের জন্যেও এটি করা উত্তম হবে যে আমরা মীলাদুন্নবী (ﷺ) দিবসে কৃতজ্ঞতাসূচক খুশি প্রকাশার্থে 

– আমাদের দ্বীনী ভাইদের সাথে সমবেত হই, 

– মানুষদেরকে খাবার পরিবেশন করি এবং 

– অন্যান্য সওয়াবদায়ক আমল পালন করি।’ এই হাদীস পূর্বোক্ত মহানবী (ﷺ) -এর দ্বারা মীলাদ ও নবুয়্যত-প্রাপ্তির দিবস পালনার্থে সোমবার রোযা রাখার হাদীসকে সমর্থন দেয়।” 

[হুসনুল মাকসাদ ফী আমলিল মওলিদ, ৬৪-৬৫ পৃষ্ঠা]

👉 ইমাম ইবনে হাজর আসকালানী (রহঃ) বলেন, 

ঈদে মীলাদুন্নবী (ﷺ) উদযাপনে যে সব নেক বা পুণ্যময় কাজ করা যায় তাতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে :

– মহানবী (ﷺ)-এর আগমনের প্রতি (শোকরিয়াসূচক) খুশি উদযাপন ও আনুগত্য প্রদর্শন;

– পুণ্যবান ও গরিব মানুষকে সমবেত করে তাঁদেরকে খাওয়ানো; 

– নেক আমল পালন ও মন্দ আমল বর্জনে উদ্বুদ্ধ করে এমন ইসলামী নাশিদ/না’ত/সেমা/কাওয়ালী/পদ্য আবৃত্তি বা পরিবেশন; 

– রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রশংসাসূচক (এ ধরনের) শে’র-পদ্য-সেমা আবৃত্তিকে সে সকল শ্রেষ্ঠ মাধ্যমের অন্তর্গত বলে বিবেচনা করা হয় যা দ্বারা কারো অন্তর তাঁর প্রতি মহব্বতের দিকে আকৃষ্ট হয়।

[হুসনুল মাকসাদ ফী আমলিল মওলিদ, ৬৪-৬৫ পৃষ্ঠা]

👉 হাফেয ইমাম সাখাভী (ওফাত: ৯০২ হিজরী) বলেন,

তাঁর ’ফাতাওয়া’ গ্রন্থে বলেন, মওলিদুন্নবী (ﷺ) উদযাপন হিজরী ৩য় শতকের পরে আরম্ভ হয়।

– অতঃপর মুসলিম উম্মাহ সকল শহর ও নগরে দান-সদকা, 

– মহানবী (ﷺ) এর মীলাদ বর্ণনার মতো নানা সওয়াবপূর্ণ বরকতময় আমল পালন করে এর উদযাপন করে আসছেন।

👉 হাফিজুল হাদিস ইমাম জালালউদ্দীন সৈয়ুতী (রহঃ) (বিসাল: ৯১১ হিজরী) বলেন,

– মীলাদুন্নবী (ﷺ) উদযাপনের উদ্দেশ্যে মানুষজনকে সমবেত করা, 

– কুরআন মজীদের আয়াতে করীমা তিলাওয়াত করা, 

– মহানবী (ﷺ)-এর জন্মবৃত্তান্ত আলোচনা, 

– তাঁর বেলাদতের (ধরণীতে শুভাগমনের) সাথে সম্পর্কিত বিস্ময়কর অলৌকিক ঘটনাবলীর উল্লেখ করা, এবং 

– এই উপলক্ষে মানুষকে খাবার পরিবেশন করা সেই সকল বিদআতে হাসানা (নতুন প্রবর্তিত কল্যাণকর ও সওয়াবের আমল) এর শ্রেণীভুক্ত যা মহানবী (ﷺ)-এর প্রতি আনুগত্য ও যথাযথ সম্মান প্রতিফলন করে।

[ইমাম জালালউদ্দীন সৈয়ুতী : তাঁর লিখিত ‘হুসনুল মাকসিদ ফী ‘আমালিল মাওলিদ কিতাবে]

  • ৯ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতি (রঃ) বলেন

ইমাম সৈয়ুতী কৃত ‘আল-হাওয়ী লিল্ ফাতাওয়ী’ কিতাবের প্রচ্ছদ

আল-হাওয়ী লিল্ ফাতাওয়ী কিতাবে মিলাদুন্নবী (সঃ) এর স্বপক্ষে ইমাম জালালুদ্দিন আস সৈয়ুতী (রহঃ) এর বক্তব্য

أن أصل عمل المولد الذي هو اجتماع الناس وقراءة ما تيسر من القرآن ورواية الأخبار الواردة في مبدأ أمر النبي صلى الله عليه وسلم وما وقع في مولده من الآيات ثم يمد لهم سماط يأكلونه وينصرفون من غير زيادة على ذلك هو من البدع الحسنة التي يثاب عليها صاحبها لما فيه من تعظيم قدر النبي صلى الله عليه وسلم وإظهار الفرح والاستبشار بمولده الشريف

মীলাদুন্নবী (ﷺ)উদযাপন যা মূলতঃ মানুষদের সমবেত করা, কুরআনের অংশ-বিশেষ তেলাওয়াত, মহানবী (ﷺ)-এর ধরাধামে শুভাগমন (বেলাদত) সংক্রান্ত ঘটনা ও লক্ষ্মণগুলোর বর্ণনা পেশ, অতঃপর তবাররুক (খাবার) বিতরণ এবং সবশেষে সমাবেশ ত্যাগ, তা উত্তম বেদআত (উদ্ভাবন); আর যে ব্যক্তি এর অনুশীলন করেন তিনি সওয়াব অর্জন করেন, কেননা এতে জড়িত রয়েছে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মহান মর্যাদার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং তাঁর সম্মানিত বেলাদতের প্রতি খুশি প্রকাশ।

— ইমাম সৈয়ুতী কৃত ‘আল-হাওয়ী লিল্ ফাতাওয়ী’, ১ম খণ্ড, ২৯২ পৃষ্ঠা, মাকতাবা আল-আসরিয়া, বৈরুত, লেবানন হতে প্রকাশিত

তিনি তার স্ব-রচিত “আল উয়াছায়েল ফী শরহিশ শামাইল” গ্রন্থে উল্লেখ আরও করেন,

যে গৃহে বা মসজিদে কিংবা মহল্লায় মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষ্যে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মীলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। তখন অবশ্যই সে গৃহ বা মসজিদ বা মহল্লা অসংখ্য ফেরেশতা দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে এবং উক্ত স্থান সমূহে যারা অবস্থান করে তাদের জন্য তারা সালাত পাঠ করে। (অর্থাৎ তাদের গুণাহর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে) এবং আল্লাহ তায়ালা তাদের সবাইকে সাধারণভাবে রহমত ও সন্তুষ্টি দ্বারা ভূষিত করেন। অতঃপর নূরের মালা পরিহিত ফেরেশতাকুল বিশেষতঃ হযরত জিব্রাঈল, মীকাঈল, ঈস্রাফীল ও আজরাঈল আলাইহিস সালাম মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপলক্ষ্যে মাহফিল আয়োজনকারীর গুণাহ মাফের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে থাকেন।

তিনি আরো বলেন,

যে মুসলমানের গৃহে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মীলাদ পাঠ করা হয়, সে গৃহ ও গৃহে বসবাসকারী ব্যক্তি দুর্ভিক্ষ, মহামারী, অগ্নি, পানি, পরনিন্দা, কুদৃষ্টি ও চুরি ইত্যাদির আক্রমণ থেকে মুক্ত থাকবে। সে ঘরে যার মৃত্যু হবে সে মৃত ব্যক্তি কবরে মুনকার নকীরের প্রশ্নের উত্তর অতি সহজে দিতে পারবে। যে ব্যক্তি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মীলাদ কে সম্মান করতে চায়, তার জন্য ইহাই যথেষ্ট। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তির নিকট নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মীলাদের কোন মর্যাদা নেই, তার অন্তর এত নিকৃষ্ট হয়ে পড়বে যে, তার সামনে হুযুরপুর নূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিশ্বজোড়া প্রশংসাগীতি উচ্চারিত হলেও তার অন্তরে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্য বিন্দুমাত্র মুহাব্বতের উদ্রেক হবে না।

— আন নেয়মাতুল কুবরা আলাল আলাম, পৃষ্ঠা নং- ১৩ ও ১৪

  • আল্লামা কুস্তোলানী রহমাতুল্লাহে আলাইহি স্বীয় মাওয়াহিব গ্রন্থে আরো বলেন-

প্রতিটি যুগে মুসলমানগণ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বেলাদত শরীফের মাসে মাহফিলের আয়োজন করে আসছেন। উন্নত মানের খাবারের আয়োজন করেন, এর রাতগুলোতে বিভিন্ন ধরণের সাদক্বাহ- খায়রাত করেন, আনন্দ প্রকাশ করতে থাকেন, পুন্যময় কাজ বেশি পরিমাণে করেন এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বেলাদত শরীফের আলোচনার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে আসেন। ফলে আল্লাহর অসংখ্য বরকত ও ব্যাপক অনুগ্রহ প্রকাশ পায়। এর বিশেষত্বের এটাও পরীক্ষিত যে, নিঃসন্দেহে গোটা বছরই তারা নিরাপদে থাকে এবং তাদের উদ্দেশ্য দ্রুত সফল হয়ে থাকে।

(ইমাম কুস্তোলানী রহমাতুল্লাহে আলাইহি দো’আ করে বলেন) অতএব, ঐ ব্যক্তিকে আল্লাহ দয়া করুন, যে মীলাদুন্নবী মোবারক মাসের রাতগুলোকে ঈদ হিসেবে উদযাপন করে- এ লক্ষ্যে যেন মুনাফিকদের অন্তরে অসহনীয় জ্বালা সৃষ্টি হয়।

— শরহে জুলকানী, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা নং- ২৬১-২৬৩

👉 ৯ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ আলফে সানী (রহ) মিলাদুন্নবী (ﷺ) উদযাপন করেছেন :

তিনি মির্জা হুসামুদ্দিন আহমেদ এর মিলাদ বিষয়ক এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,

نفس قرآں خواندن بصوتِ حسن و در قصائد نعت و منقبت خواندن چہ مضائقہ است؟ ممنوع تحریف و تغییر حروفِ قرآن است، والتزام رعایۃ مقامات نغمہ و تردید صوت بآں، بہ طریق الحان با تصفیق مناسب آن کہ در شعر نیز غیر مباح است. اگر بہ نہجے خوانند کہ تحریفِ کلمات قرآنی نشود. . . چہ مانع است؟-

অর্থঃ 

– সুন্দর কন্ঠে কুর’আন তিলাওয়াত,

– নাত শারীফ পাঠে এবং 

– মানকাবাত (ওলী-আল্লাহ এর প্রশংসামূলক কবিতা) পাঠে ভুল কি? 

– নিষেথাজ্ঞা কেবল তখন প্রযোজ্য হবে যদি কুর’আন শারীফের শব্দ পরিবর্তন করা হবে, কুর’আন শারীফ এমনভাবে পাঠ করা যেন মনে হচ্ছে কেউ গান শুনে তালি দিয়া হচ্ছে যার অনুমতি নেই। 

– যদি মিলাদ এভাবে পাঠ করা হয় যেন কুর’আন শারীফ সঠিকভাবে পাঠ করা হয়, কাসিদা গুরুত্বের সহিত সঠিকভাবে পাঠ করা হয় তাহলে এখানে ক্ষতি কি?

[সূত্রঃ মাকতুবাত শারীফ (উর্দু) ভলি ০৩, চিঠি নং ৭২, পারসিয়ান দাফতার সোম, হিসসা হাশতাম]

👉 ইমাম হাফেয আবদুর রহমান ইবনে ইসমাইল (রহঃ) (ওফাত: ৯৬৫ হিজরী)

[যিনি আবু শামাহ নামে সমধিক প্রসিদ্ধ] তিনি বলেন, 

বিদআতে হাসানা বা নব প্রবর্তিত উত্তম ও কল্যাণকর প্রথাগুলোর অন্যতম হলো মীলাদুন্নবী (ﷺ) এর দিন উদযাপনের জন্যে যা যা করা হয়। যেমন :

– দান-সদকাহ করা, 

– অন্যান্য সওয়াবদায়ক আমল পালন এবং খুশি প্রকাশ করা।

– গরিবদের প্রতি দয়াশীল হওয়ার পাশাপাশি 

– এমন একটি আমল যা মহানবী (ﷺ) এর প্রতি কারো মহব্বত, প্রশংসা ও গভীর শ্রদ্ধার ইঙ্গিত বহন করে এবং 

– তাঁকে নেয়ামতস্বরূপ (আমাদের মাঝে) প্রেরণের জন্যে তা আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে থাকে।

[ইমাম হাফেয আবদুর রহমান ইবনে ইসমাইল : আল-বা’য়েস আ’লা ইনকার আল-বেদআ’ ওয়াল হাওয়াদিস’]

👉 ইমাম ইবনে আবেদীন শামী (রহ) 

[1198–1252 AH / 1783–1836 AD]

আল্লামা ইমাম ইবনে আবেদীন শামী (রহ) মাওলিদ উন নবী উদযাপনকে তিনি আল্লাহর নৈকট্য লাভের মহান কর্ম বলে অভিহিত করে আল্লামা ইবনে হাজর আসকালানী (রহঃ) এর মাওলিদ গ্রন্থের ব্যখ্যায় বলেন,

জেনে রেখো, রাসূল (ﷺ) যে মাসে শুভ আগমণ করেছেন, সে মাসে মীলাদুন্নবী (ﷺ) উপলক্ষে অনুষ্টান করা একটি উত্তম বিদাত (বিদআতে হাসানা)। তিনি আরো বলেন- রাসূল (ﷺ) ওনার জন্ম কাহিনী ও জীবনী শোনার এবং দুরুদ- সালামের মাহফিল অনুষ্ঠান করা আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম, এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

[আল কাওলুল মুতামাদ ফিল মাযহাবিল হানাফী, আল আদিল্লাতু ফি জাওয়াজিল ইহিফায়ি ওয়াল ইহতেফালু বি মাওলিদি সাইয্যিদাল বাসির (ﷺ).]

👉 ইমাম আব্দুল হক্ব মুহাদ্দিছ দেহলভী (রহ) তিনি বলেন-

مَنْ عَظَّمَ لَيْلَةَ مَوْلِدِهٖ بِمَاۤ اَمْكَنَهٗ مِنَ التَّعْظِيْمِ وَالاِكْرَامِ كَانَ مِنَ الْفَائزِيْنَ بِدَارِ السَّلامِ.

অর্থ: “যে ব্যক্তি তার সাধ্য ও সামর্থ্য অনুযায়ী পবিত্র ঈদে মীলাদুন্নবী (ﷺ) উদযাপন করবে, সে জান্নাতে বিরাট সফলতা লাভ করবে।” সুবহানাল্লাহ্!

[মাছাবাতা বিস সুন্নাহ ১ম খন্ড]

👉 ইমাম শাহ আবদুল আযীয মুহাদ্দীসে দেহেলভী (রহ) বলেন:

রবিউল আউয়াল মাসের বরকত (আশীর্বাদ) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর বেলাদত তথা ধরণীতে শুভাগমনের কারণেই হয়েছে। এই মাসে উম্মতে মোহাম্মদী যতো বেশি দরুদ-সালাম প্রেরণ করবেন এবং গরিবদের দান-সদকাহ করবেন, ততোই তাঁরা মঙ্গল লাভ করবেন। [ফতোয়ায়ে আযীযিয়্যা, ১:১২৩]

  • বিরোধীবাদীরা বলে থাকে এটি মহানবী (ﷺ) এর ওফাত দিবস। তাই এটি পালন করা উচিত নয়। এর জবাবও ৯ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ দিয়ে গেছেন খুব সুন্দরভাবে।

أن ولادته صلى الله عليه وسلم أعظم النعم علينا ووفاته أعظم المصائب لنا والشريعة حثت على إظهار شكر النعم والصبر والسلوان والكتم عند المصائب وقد أمر الشرع بالعقيقة عند الولادة وهي إظهار شكر وفرح بالمولود و لم يأمر عند الموت بذبح ولا غيره بل نهى عن النياحة وإظهار الجزع فدلت قواعد الشريعة على أنه يحسن في هذا الشهر إظهار الفرح بولادته صلى الله عليه وسلم دون إظهار الحزن فيه بوفاته

বিশ্বনবী (ﷺ)-এর বেলাদত হলো (আল্লাহর) সর্ববৃহৎ নেয়ামত (আশীর্বাদ); আর তাঁর বেসাল মহা দুর্যোগ। ধর্মীয় বিধান আমাদের প্রতি তাকিদ দেয় যেন আমরা আল্লাহর নেয়ামতের শোকরগুজারি (কৃতজ্ঞতা প্রকাশ) করি এবং দুর্যোগের মুহূর্তে ধৈর্য ধরি ও শান্ত থাকি। শরীয়তের আইনে আমাদের আদেশ দেয়া হয়েছে কোনো শিশুর জন্মে পশু কোরবানি দিতে (এবং ওর গোস্ত গরিবদের মাঝে বিতরণ করতে)। এটা ওই শিশুর জন্মোপলক্ষে কৃতজ্ঞতা ও খুশি প্রকাশের নিদর্শন। পক্ষান্তরে, মৃত্যুর সময় পশু কোরবানি দিতে শরীয়ত আমাদের আদেশ দেয় নি। উপরন্তু, শোক প্রকাশ বা মাতম করতে শরীয়তে মানা করা হয়েছে। অতএব, মীলাদুন্নবী (ﷺ)-এর ‍পুরো মাসব্যাপী খুশি প্রকাশ করার পক্ষে ইসলামী বিধানের রায় পরিদৃষ্ট হয়; আর তাঁর বেসাল উপলক্ষে শোক প্রকাশ না করার পক্ষে মত দেয়া হয়।

— হুসনুল মাকসাদ ফী আমলিল মওলিদ, ৫৪-৫৫ পৃষ্ঠা; ইমাম সৈয়ুতী প্রণীত ’আল-হাওয়ী লিল্ ফাতাওয়ী’, ১ম খণ্ড, ২৯৮ পৃষ্ঠা, মাকতাবা আল-আসরিয়া, বৈরুত, লেবানন হতে প্রকাশিত

  • হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ মোহাদ্দিসে দেহলভী রহমাতুল্লাহে আলাইহি তার রচিত “আদ দুররুস সামীন ফী মুবাশশারাতিন নবীয়্যিল আমীন” কিতাবের ৯ম পৃষ্ঠায় লিখেছেনঃ

আমার শ্রদ্ধেয় আব্বাজান আমাকে অবহিত করে বলেন, আমি প্রতি বছরই নবীকুল সর্দার (ﷺ) এর মীলাদ উপলক্ষ্যে বিরাট খাবার আয়োজন করে আসছিলাম। অতঃপর এক বছর খাবারের আয়োজন করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। সুতরাং অল্প ভাজ্যকৃত চনা ব্যতীত আর কিছুই আমি জোগাড় করতে পারিনি। কাজেই সেগুলো উপস্থিত লোকদের মাঝে বন্টন করে দিলাম। অতঃপর আমি স্বপ্নে হুযুর ﷺ এর সাক্ষাত লাভ করে ধন্য হলাম। দেখলাম, হুযুর (ﷺ) এর সামনে ঐ চনাগুলো মওজুদ আছে। তখন হুযুর (ﷺ) ছিলেন অত্যন্ত আনন্দিত ও হাস্যোজ্জল।

— তথ্যসূত্রঃ ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে ঈদে মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপন, পৃষ্ঠা নং-৮১, ফতুয়ায়ে রশীদিয়া, পৃষ্ঠা নং- ১৩৭, হাকিকতে মীলাদ, পৃষ্ঠা নং-২৮

পোষ্টটি ভালো লেগে থাকলে আপনার মূল্যবান মতামত জানান প্লিজ!

Leave a Comment