আহলে আল বাইত আতহার আলাইহিমুস সালামগণ এবং সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম এর মধ্যে পারস্পরিকশ্রদ্ধা, অকৃত্রিম ভালোবাসা ও প্রশংসা (4)

পোষ্টটি অন্যকে পড়ার সুযোগ করে দিতে শেয়ার করুন প্লিজ।

লেখক: মাবারাত আল-আল ওয়া আল-আসহাব

অনুবাদক: নাঈম আল-জা’ফরী

সম্পাদক: মওলানা মুহাম্মদ রুবাইয়াত বিন মূসা

মূল: মাহাজ্জাহ-ডট-কম

আহলে বাইতের প্রতি সম্মান ও ভালবাসা ঈমানের অপরিহার্য দাবি আর সাহাবীয়ে রাসূল (সাঃ) এর প্রতি ঘৃণা বা সমালোচনা হারাম।

আহলে বাইত সম্পর্কে মুমিন মুসলমানদের বিশ্বাস

নিঃসন্দেহে হাশিমিয়া পরিবার নামক গাছটি সবচেয়ে উঁচু বংশ এবং নবী (সাঃ) এর বংশধরকে ধারণ করেছে। বানু আল-হাশিমের প্রতি মুমিন মুসলমানদের ভালোবাসা, আল্লাহর রাসুল (সাঃ) এর প্রতি তাদের ভালবাসার উপর ভিত্তি করে তৈরি। এটিই হলো বিশ্বাসের একটি প্রয়োজনীয় উপাদান, যার ভিত্তিতে কোন ঈমানদ্বার ব্যক্তিকে পুরস্কৃত করা হবে। এটি হয়েছে আল্লাহতায়ালার একত্ববাদে উপর তাদের সর্বাগ্রে বিশ্বাস রাখা, তাদের ইসলাম গ্রহণ, এবং আল্লাহর রাসূল সাঃ এর সাথে তাদের ঘনিষ্ঠতার কারণে। এ জন্যই তাঁদের সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর সতর্ক করেন এবং তা গুরুত্বের কারণেও বটে।

কেউ কেউ আছেন যারা আহলে বাইত সম্পর্কে তাদের বিশ্বাসের সীমা অতিক্রম করেছেন এবং কেউ কেউ এগুলি পুরোপুরি ত্যাগ করেছেন। সঠিক অভিমত হল, আল্লাহর রাসুল (সাঃ) এর প্রতি আমাদের ভালবাসার ভিত্তিতে, তাঁদের ভালবাসা আবশ্যক, সীমা অতিক্রম করা বা তাদের পরিত্যাগ করা থেকে দূরে থাকা। উভয় প্রকার চরমপন্থাই সমানভাবে দায়ী। আর আহলে বাইতের মধ্যে রয়েছে আল্লাহর রাসূলের (সাঃ) এর স্ত্রী গণ। যদিও তাঁহারা সবাই উন্নত চরিত্র এবং গুণের অধিকারী। যেহেতু আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর পরে মাসুম হিসেবে আর কেউ নেই, তবে কিছু কিছু ব্যক্তি থাকতে পারে যারা অন্যদের চেয়ে কিছু দিক থেকে অগ্রাধিকার প্রাপ্ত হবেন।

তাঁদের (আহলে বাইত) প্রতি ভালোবাসার কিছু পূর্বশর্ত রয়েছে:

১. ইসলামের উপর তাদের অবিচল থাকতে হবে। তারা যদি মুসলিম না হয়, তবে তাদের সাথে প্রেম বা বন্ধুত্ব করা যাবে না। যদি শুধুমাত্র পারিবারিক সম্পর্কই ভালোবাসার ভিত্তি হতো, তাহলে আবু লাহাবের জন্য সেটাই যথেষ্ট হতে পাড়তো।

২. তাদের উচিত আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর শিক্ষা অনুসরণ করা, যেমন মুসলিম শরীফে, আহমদ ইবনু হাম্বল (রহঃ) … আমর ইব্‌ন আস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তাঁর সহীহ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে চুপে চুপে নয়, স্পষ্ট বলতে শুনেছি যে​​:

أَلَا إِنَّ آلَ أَبِي، يَعْنِي فُلَانًا، لَيْسُوا لِي بِأَوْلِيَاءَ، إِنَّمَا وَلِيِّيَ اللهُ وَصَالِحُ الْمُؤْمِنِينَ

নিশ্চয় আমার বাবার পরিবার অর্থাৎ অমুক (আত্নীয়তার কারণে) আমার প্রিয়জন নয়। বরং আমার নিকটতম ও প্রিয়জন হলেন আল্লাহ ও ঈমানদার মুসলমানগণ।

[(ক) মুসলিম : আস সহীহ, ১/১৯৭, হাদীস নং ২১৫।

(খ) আহমদ : আল মুসনাদ, ২৯/৩৪০, হাদীস নং ১৭৮০৪।

(গ) হাকিম : আল মুস্তাদরাক, ৩/৬৩, হাদীস নং ৪৪৩৩।]

নিম্নে উলামায়ে আক্বীদা (বিশ্বাস) এর কিতাবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে এগুলোতে ভালোবাসা জরুরি। তাদের মধ্যে থেকে:

১. আত-তাহাবী (মৃত্যু ৩২১) আকিদা সম্পর্কে তাঁর বিখ্যাত রচনা

২. আল বারবাহারি (মৃত্যু ৩২৯)

৩. আল-আজুররী (মৃত্যু ৩৬৯) তাঁর আশ-শরিয়া গ্রন্থে

৪. আল-ইসফারাইনী (মৃত্যু ৪৭১)

৫. আল-কাহতানি (মৃত্যু ৩৮৭) তাঁর আল-নুনিয়াহ গ্রন্থে

৬. আল-মুওয়াফাক ইবনে আল-কুদামাহ আল-মাকদিসি (মৃত্যু ৬২০) তাঁর লুম’আতুল ই’তিকাদ গ্রন্থে

৭. ইবনে তাইমিয়া (মৃত্যু ৭২৮) তাঁর আল-ওয়াসিতিয়াত

৮. ইবনে কাছির আল-দিমিশকী (মৃত্যু: ৭৭৪) তাঁর তাফসীরে

৯. মুহাম্মদ ইবনে আল-উয়াজির আল-ইয়ামানী (মৃত্যু ৮৪০) তাঁর ইছার আল-হক আলা আল-খালাক

১০. সিদ্দিক হাসান খান (মৃত্যু: ১৩০৭) তাঁর আদ-দীন আল-খালিস

১১. আবদুর রহমান ইবনে নাসির আস-সাদী (মৃত্যু ১৩৭৬) তাঁর আল-তানবিহাত আল-লতিফায় এবং আরও অন্যান্য বই. ইস্তিজলাবু ইরতিফা আল-গুরাফ (কিছু পরিবর্তন সহ) পৃষ্ঠাসমূহ ১৬১-১৭৮

এবার আমরা জানার চেষ্টা করবো কুরআন এবং হাদীসের আলোকে কারা হলেন সাহাবা?

ইবনে আল হাজার বলেছেন,

والأصح ما قيل في تعريف الصّحابيّ أنه «من لقي النبيّ صلّى اللَّه عليه وسلم في حياته مسلما ومات على إسلامه.

সাহাবার সংজ্ঞায় অত্যাধিক বিশুদ্ধ মতামত হলো, সাহাবা হলেন, যিনি জীবদ্দশায় ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে রাসূল (সাঃ) এর সান্নিধ্য পেয়েছেন এবং ঈমানদার মুসলিম হিসাবে ইন্তেকাল করেন। [ আসকালানী : আল ইসাবাহ, ১/৮]

সুতরাং পূর্বোক্ত বর্ণনার উপর ভিত্তি করে, আহলে বাইত যারা আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর সময় ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তারাও সাহাবা হিসাবে গণ্য হবে। এ কারণেই অনেক বইতে আহলে বাইতকে এগুলো থেকে আলাদা না করে সাহাবাহ গন হিসেবে কথা উল্লেখ করেছেন।

সাহাবীদের ফজিলতের/গুনাবলীর প্রমাণ অনেক গুলো:

১.

كُنْتُم خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ

তোমরা হলে শ্রেষ্ঠতম ওই সব উম্মতের মধ্যে, যাদের আত্যপ্রকাশ ঘটেছে মানব জাতির কল্যাণে। [ আল কুরআন : আলে ইমরান, ৩/১১০]

সাহাবিগণ যদি প্রথম আয়াতটিতে অন্তর্ভুক্ত না হয়ে থাকে, তবে আর কাকে তাতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে?

২.

وَكَذٰلِكَ جَعَلْنٰكُمْ أُمَّةً وَسَطًا

আর অনুরূপ আমি তোমাদেরকে সব উম্মতের মধ্যে শ্রেষ্ট করেছি। [ আল কুরআন : আল বাকারা, ২/১৪৩]

এখানে ওয়াসটা বলতে সর্বোত্তম লোকদের বোঝানো হয়েছে। সাহাবাহ (যাদের মধ্যে আহলে বাইত অন্তর্ভুক্ত) তারাই প্রথম ব্যক্তি যারা এই দল থেকে হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন।

৩.

لَقَدْ رَضِىَ اللّٰهُ عَنِ الْمُؤْمِنِيْنَ إِذْ يُبَايِعُوْنَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِيْ قُلُوْبِهِمْ فَأَنْزَلَ السَّكِيْنَةَ عَلَيْهِمْ وَأَثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيْبًا

নিশ্চয় আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়েছেন ঈমানদাদের প্রতি যখন তারা ওই বৃক্ষের নীচে আপনার নিকট বা’আত গ্রহণ করছিলো। সুতরাং আল্লাহ জানেন যা তাদের অন্তরগুলোতে রয়েছে। অতঃপর তাদের উপর প্রশান্তি অবতীর্ণ করেছেন এবং তাদেরকে শীঘ্রই আগমনকারী বিজয়ের পুরস্কার দিয়েছেন। [ আল কুরআন : আল ফাতহ, ৪৮/১৮]

আল্লাহর সন্তুষ্টি চিরন্তন। যখন আল্লাহ কোন নির্দিষ্ট দলের জন্য তার সন্তুষ্টি ঘোষণা করেন তখন এটা বোঝায় যে আল্লাহ চিরকাল তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা কখনই তাঁর ক্রোধের সম্মুখীন হবেন না।

৪.

وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُم بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ۚ ذَٰلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ.

আর সবার মধ্যে অগ্রগামী প্রথম মুহাজির ও আনসার আর যারা সংকর্মের সাথে তাদের অনুসারী হয়েছে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট, আর তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন বাগানসমূহ (জান্নাতসমূহ), যে গুলোর নিম্নদেশে নহররাজি প্রবাহমান। তারা সদা-সর্বদা সেগুলোর মধ্যে অবস্থান করবে। এটাই হচ্ছে মহা সাফল্য। [ আল কুরআন : আত তাওবা, ৯/১০০]

৫.

يٰاَيُّهَا النَّبِيُّ حَسْبُكَ اللّٰهُ وَمَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ

হে অদৃশ্যের সংবাদদাতা (নবী)! আল্লাহ আপনার জন্য যথেষ্ট এবং এ যতো সংখ্যক মু’মীনবৃন্দ আপনার অনুসারী হয়েছে। [ আল কুরআন : আনফাল , ৮/৬৪]

৬.

لِلْفُقَرَآءِ ٱلْمُهَٰجِرِينَ ٱلَّذِينَ أُخْرِجُواْ مِن دِيَٰرِهِمْ وَأَمْوَٰلِهِمْ يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِّنَ ٱللَّهِ وَرِضْوَٰنًا وَيَنصُرُونَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥٓ ۚ أُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلصَّٰدِقُونَ

ওই দরিদ্র হিজরতকারীদের জন্য (এ সম্পদ), যাদেরকে আপন ঘরবাড়ি ও সম্পদ থেকে উৎখাত করা হয়েছে। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর সন্তুষ্টি চায় এবং আল্লাহ ও রাসুলের সাহায্য করে। তারাই সত্যবাদী। [ আল কুরআন : হাশর, ৫৯/৮]

আল্লাহ এই আয়াতে বলেছেন যে তারা “সাদিকুন”। সত্যবাদিতা, এবং অন্যান্য গুণাবলী যখন আল্লাহ কর্তৃক প্রত্যায়ণ হয়, তখন তাদের মধ্যে মুনাফিক লক্ষণ হওযা অসম্ভব।

এমনকি যদি তা শুধুমাত্র তাদের হিজরত, তাদের জিহাদ, তাদের জান ও মাল কোরবানি করা, তাদের পিতা-মাতা ও সন্তানদের হত্যা করা, দ্বীনে প্রতি তাদের ভালবাসা এবং দৃঢ় ঈমান ও দৃঢ় বিশ্বাস কে গণ্যই করা হতো, তাহলেও এগুলো পুণ্যের জন্য যথেষ্ট ছিল।

চলবে

পোষ্টটি ভালো লেগে থাকলে আপনার মূল্যবান মতামত জানান প্লিজ!

Leave a Comment