সূরা আরাফের ৩ নং আয়াতের সঠিক ব্যাখ্যা
কিছু লোক সূরা আরাফের ৩নং আয়াতে কারীমার ভুল অর্থ করে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।
তারা এর অর্থ করছে, “তোমাদের পালনকর্তার তরফ থেকে তোমাদের কাছে যা নাযিল হয়েছে –তার অনুসরণ করো এবং তাঁকে ছাড়া কোন ওলি বা পীরের অনুসরণ কর না।”
আসলে এই আয়াতে কারীমার প্রকৃত তরজমা হবে,
اتَّبِعُواْ مَا أُنزِلَ إِلَيْكُم مِّن رَّبِّكُمْ وَلاَ تَتَّبِعُواْ مِن دُونِهِ أَوْلِيَاء قَلِيلاً مَّا تَذَكَّرُونَ
“তোমাদের পালনকর্তার তরফ থেকে তোমাদের কাছে যা নাযিল হয়েছে – তার অনুসরণ করো এবং তাঁকে ছাড়া ওলীদের (আওলিয়ার) অনুসরণ করো না। তোমরা কমই খেয়াল করে থাক।”
[সূরা আরাফ, আয়াত ৩]।
ব্যাখ্যাঃ
১. এই আয়াতের তাফসীর হচ্ছে এই আয়াত-
وَالَّذِينَ كَفَرُواْ أَوْلِيَآؤُهُمُ الطَّاغُوتُ –
অর্থাৎ- “এবং কাফিরদের জন্য সাহায্যকারী হচ্ছে শয়তান”
[সূরা বাক্বারা, আয়াত ২৫৭]।
অর্থাৎ শয়তান হচ্ছে আল্লাহ ব্যতীত অন্য বন্ধু। তাকে বন্ধু বানানো কুফর।
২. পক্ষান্তরে, আল্লাহ্’র ওলীগণকে বন্ধুরুপে গ্রহণ না করা বে-দ্বীনী বা ধর্মহীনতা।
হাদিসে কুদসীতে আছে- “অর্থাৎ যে আমার বন্ধুর প্রতি শত্রুতা পোষণ করে, তার বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধ ঘেষণা করলাম”
[তথ্যসূত্রঃ মিশকাত শরীফ, ১৯৭ পৃ.]।
৩. অন্যত্র মহান রব এরশাদ ফরমান-
إِنَّا جَعَلْنَا الشَّيَاطِينَ أَوْلِيَاء لِلَّذِينَ لاَ يُؤْمِنُونَ
“অর্থাৎ আমি শয়তানদেরকে তাদেরই বন্ধু করেছি, যারা ঈমানদার নয়।”
[সূরা আরাফ, আয়াত ২৭]।
মোটকথা, শয়তান কাফিরদেরই ওলী মিন দুনিল্লাহ। (আল্লাহ ব্যতীত অন্য বন্ধু)। অধিকাংশ স্থানে ‘মিন-দুনিল্লাহ’ মানে এটাই।
৪. তৃতীয়তঃ এরশাদ হচ্ছে-
إِنَّهُمُ اتَّخَذُوا الشَّيَاطِينَ أَوْلِيَاء مِن دُونِ اللّهِ وَيَحْسَبُونَ أَنَّهُم مُّهْتَدُونَ
“নিশ্চয় তারা শয়তানদেরকে আউলিয়া মিন্ দুনিল্লাহ (আল্লাহর মোকাবেলায় বন্ধু) হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে।”
[সূরা আরাফ, আয়াত ৩০]।
প্রথমত, তাফসীরে ইবনে আব্বাসে এ আয়াতে কারীমার তাফসীরে হুবহু যা লেখা আছে – তার বাংলা হচ্ছে,
১.“তোমাদের পালনকর্তার তরফ থেকে তোমাদের কাছে যা নাযিল হয়েছে – তার অনুসরণ কর”, এর মানে হচ্ছে, কুরআনে নিদের্শিত হালালকে হালাল এবং হারামকে হারাম জানো।
২. আর “তাঁকে ছাড়া ওলীদের (আওলিয়ার) অনুসরণ করো না”, এর মানে হল, আল্লাহ্ তা’লা ছাড়া মূর্তিদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করে তাদের ইবাদত করবে না।
৩. আর “তোমরা কমই খেয়াল করে থাক”, এর মানে হচ্ছে, তোমরা অল্প বা বেশি কোন উপদেশই গ্রহণ কর না।”
৫. দ্বিতীয়ত,
ওলী বা আওলিয়া শব্দকে কোন আয়াতে আল্লাহ তা’আলা টার্গেট করলে–কেউ ভীত হবেন না।
জেনে রাখুন, ওলী (বহুবচনে আওলিয়া) শব্দটিকে আল্লাহ তা’আলা আল- কুরআনে তাঁর নিজের এবং শয়তান – উভয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন।
যেমন-
ٱللَّهُ وَلِىُّ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ يُخْرِجُهُم مِّنَ ٱلظُّلُمَٰتِ إِلَى ٱلنُّورِ ۖ وَٱلَّذِينَ كَفَرُوٓا۟ أَوْلِيَآؤُهُمُ ٱلطَّٰغُوتُ يُخْرِجُونَهُم مِّنَ ٱلنُّورِ إِلَى ٱلظُّلُمَٰتِ ۗ أُو۟لَٰٓئِكَ أَصْحَٰبُ ٱلنَّارِ ۖ هُمْ فِيهَا خَٰلِدُونَ (٢٥٧)
যারা ঈমান এনেছে – তাদের ওলী হচ্ছেন, আল্লাহ; তিনি তাদের আঁধার রাশি থেকে নূরের দিকে বের করে আনেন; আর যারা কুফরি করেছে – তাদের আওলিয়া হচ্ছে, তাগুতরা (শয়তানরা); তারা তাদের নূর থেকে আঁধার রাশির দিকে নিয়ে যায়। তারাই দোযখবাসী (আসহাবুন নার) – সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।
[সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত ২৫৭]।
কাজেই, “ওলী” শব্দটি আল-কুরআনে ভালো-মন্দ সবার ক্ষেত্রে কম-বেশি ব্যবহৃত হয়েছে।
আর উল্লিখিত আয়াতে কারীমায় (সূরা আরাফ, আয়াত ৩) মন্দের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে।
৬. আবার ওলীআল্লাহদের ক্ষেত্রেও বলা হয়েছে,
أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ
আল্লাহর ওলীদের (আওলিয়াউল্লাহু) কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।
[সূরা ইউনুস, আয়াত ৬২]।
সুতরাং ওলী শব্দ নিয়ে বিভ্রান্তির কোনোই অবকাশ নেই।
তৃতীয়ত; আল্লাহু তা’লা পরিষ্কার করেই বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآَخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا
“যারা ঈমান এনেছ–তাদেরকে বলছি! তোমরা আল্লাহ্’র তাবেদারী করবে এবং রাসূল ও তোমাদের মধ্যে হুকুমদাতাদের তাবেদারী করবে। তবে কোন ব্যাপারে তোমাদের মাঝে মতবিরোধ হলে–তোমরা যদি আল্লাহ্ ও আখেরাতে বিশ্বাসী হও–তাহলে তা (মতবিরোধের বিষয়টি) আল্লাহ ও রাসূলের সমীপে পেশ করবে। উহাই কল্যাণকর এবং এর ফলাফল খুবই ফলপ্রসূ।
[সূরাহ্ আন নিসা, আয়াত ৫৯]।
এ আয়াতে কারীমায় ৩টি আনুগত্য বা তাবেদারীর কথা পরিষ্কার করেই বলা আছে।
যথা-
১. আল্লাহ্ তা’আলা;
২. রসূলুল্লাহ্ সল্লাল্লহু আ’লাইহি ওয়া আলিহি ওয়সাল্লাম;
৩. হুকুমদাতা-বিচারক তথা আল্লাহ্ পাকের প্রিয়ভাজন।
কাজেই, ক্বুরআ’নুল কারিমে ওলী শব্দের নেতিবাচক প্রয়োগের উদাহরণ টেনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির কোনোই সুযোগ নেই।
আশা করছি বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে।
মহান আল্লাহ্ পাক সকলকে অজ্ঞতা-মনগড়া ব্যাখ্যা-বিশ্লেষন ব্যাতিরেকে সকলকে সিরত্বল মুস্তাকিম তথা সালাফে সালিহীনদের পথে পরিচালিত করুন; আমীন!



Users Today : 351
Users Yesterday : 357
This Month : 32388
This Year : 171865
Total Users : 287728
Views Today : 28600
Total views : 3402853