১২তম অধ্যায়ঃ কবরের আযাব স্থায়ী- নাকি অস্থায়ী?

পোষ্টটি অন্যকে পড়ার সুযোগ করে দিতে শেয়ার করুন প্লিজ।

প্রশ্নঃ কবরের আযাব কি কিয়ামত পর্য্যন্ত স্থায়ী হবে- নাকি সাময়িক হবে?

জওয়াবঃ কাফিরের আযাব স্থায়ী এবং গুনাহ্গার  মোমেনদের আযাব গুনাহের পরিমাণে দীর্ঘস্থায়ী অথবা ক্ষনস্থায়ী হবে।

কাফিরের স্থায়ী আযাবঃ
======
(ক) কাফিরগণ যখন শেষ সিঙ্গার ফুঁৎকারে পুনরুত্থিত হবে- তখন তাঁরা বলবে-
وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَإِذَا هُم مِّنَ الْأَجْدَاثِ إِلَى رَبِّهِمْ يَنسِلُونَ – قَالُوا يَا وَيْلَنَا مَن بَعَثَنَا مِن مَّرْقَدِنَا هَذَا مَا وَعَدَ الرَّحْمَنُ وَصَدَقَ الْمُرْسَلُونَ – ۔
অর্থঃ “যখন সিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে- তখনই তারা কবর থেকে উঠে তাদের পালনকর্তার দিকে ছুটে চলবে। তারা  বলবে- হায়! আমাদের দূর্ভাগ্য, আমাদেরকে আমাদের নিদ্রাস্থল থেকে উত্থিত করলো কে? জওয়াবে বলা হবে- এরই ওয়াদা দিয়েছিলেন রহমান আল্লাহ্ এবং  রাসুলগণও সত্য বলেছিলেন”। (ছুরা ইয়াছিন ৫১-৫২ আয়াত)। বুঝা গেল- কাফিরগণের কবরের আযাব দায়েমী ও স্থায়ী হবে।

(খ) কাফেরদের দায়েমী কবর আযাব সম্পর্কে আল্লাহ্ তায়ালা আরও এরশাদ করেন-
النَّارُ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا غُدُوًّا وَعَشِيًّا وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ أَدْخِلُوا آلَ فِرْعَوْنَ أَشَدَّ الْعَذَابِ ۔
অর্থাৎ   : “সকালে ও সন্ধ্যায় তাঁদেরকে কবরের আগুনের সামনে উপস্থিত করা  হবে এবং যেদিন কিয়ামত হবে, সেদিন আদেশ করা হবে- ফেরাউনের অনুসারীদেরকে কঠিনতর আযাবে  দাখিল করো”। (সূরা মোমেন ৪৬ আয়াত)। বুঝা গেল- কাফিরদের কবরের আযাব দায়েমী  এবং পরকালের আযাব চিরস্থায়ী হবে।

(গ) হযরত ছামুরা (রাঃ) থেকে ইতিপূর্বে বুখারীর যে দীর্ঘ  হাদীস বর্ণনা করা হয়েছে (১১অধ্যায়) উক্ত হাদীসে যেসব আযাবের  ঘটনা  নবী  করিম (ﷺ) স্বপ্নযোগে  দেখেছিলেন- তা প্রমাণ করে যে, এই আযাব কাফেরদের জন্য এবং তা কিয়ামত পর্য্যন্ত চলতে থাকবে।

(২) গুনাহ্গারদের কবর আযাব লাঘব করা হবে

(ক) বুখারী শরীফে দু’টি কবরের আযাবের যে ঘটনা ইতিপূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে- তা ছিল মুসলমানদের ক্ষেত্রে- তাদের অপরাধ ছিল চোগলখুরী করা ও প্রস্রাব হতে পূর্ণ পবিত্র না হওয়া। নবীজীর সুপারিশে ও তাজা খেজুর ডালের যিকিরের বরকতে তাঁদের কবর আযাব হাল্কা হয়ে যায়।

বুঝা গেল- কেউ যদি কবরের পার্শ্বে বসে তিলাওয়াত করে -যিকির করে, দোয়া করে, সদ্কা করে, বদলী হজ্ব করে, আত্মীয়-স্বজনরা যদি দোয়া খতম পড়ায়, মিলাদ পড়ায়- তাহলে কবরবাসীর আযাব মাফ হবে অথবা হাল্কা হবে- ইত্যাদি। দুনিয়ায় কোন অপরাধীর জন্য অন্য কেউ সুপারিশ করলে যেভাবে ক্ষমা পায়, তদ্রূপ  কবরে এবং পরকালেও গুনাহ্গারেরা ক্ষমা পাবে।

(খ) সুপারিশকারীর সুপারিশে কবরে ও হাশরে আযাব লাঘব হবে -এর প্রমাণ  কোরআন মজিদে রয়েছে। যেমন-
مَن ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلاَّ بِإِذْنِهِ۔
অর্থাৎঃ “কে আছে আল্লাহর কাছে সুপারিশকারী- তাঁর অনুমতি ছাড়া”? কাফেররা মনে  করতো- তাঁদের দেবতারা আল্লাহর কাছে  সুপারিশ করে তাঁদেরকে উদ্ধার করে নেবে। আল্লাহ্পাক তাঁদের সেই  ধারণা খন্ডন  করে এই আয়াতে পরিষ্কার বলে দিয়েছেন- সুপারিশ করতে হলে আল্লাহর অনুমতিপ্রাপ্ত লোক হতে হবে। দেবতারা অনুমতিপ্রাপ্ত নয়। কেননা-  তাঁদের ঈমানই নেই। সেজন্য আল্লাহ্পাক অন্য আয়াতে বলে দিয়েছেন-
فما تنفعھم شفاعۃ الشافعین ۔
অর্থাৎঃ “অনুমতিপ্রাপ্ত সুপারিশকারীদের  সুপারিশ কাফিরদের বেলায় কোনই উপকারে আসবে না- বরং মোমেন গুনাহ্গারদের  উপকারে আসবে”। (শরহে আকায়েদ ও তাফসীরে রুহুল বয়ান)।

অন্য আয়াতে  কাফিরদের বেলায় কারো সুপারিশ কাজে আসবে না  বলে আল্লাহ্পাক  জোর দিয়ে বলেছেন-
وَاتَّقُوا يَوْمًا لَا تَجْزِي نَفْسٌ عَنْ نَفْسٍ شَيْئًا وَلَا يُقْبَلُ مِنْهَا شَفَاعَةٌ وَلَا يُؤْخَذُ مِنْهَا عَدْلٌ وَلَا هُمْ يُنْصَرُونَ۔
অর্থাৎঃ “ভয় করো ঐদিনের- যেদিন কোন ঈমানদার ব্যক্তি কোন কাফের ব্যক্তিকে রক্ষা করতে পারবে না এবং কাফেরদের কোন সুপারিশই সেদিন গ্রহণ করা হবে না এবং তাঁরা সাহায্য  প্রাপ্তও হবে না”। (ছুরা বাক্কারাঃ ৪৮)।

অত্র আয়াতে প্রথম نَفْسٌ দ্বারা বুঝানো হয়েছে মোমিন ব্যক্তিকে  এবং দ্বিতীয় نَفْسٌ দ্বারা বুঝানো হয়েছে কাফের ব্যক্তিকে। কেননা, একসাথে দুটি نكرة আসলে দুটির দু’অর্থ  হয়। ইহাই   অছুলে তাফসীরের নীতিমালা।

কাফেরদের  সুপারিশ গ্রহনযোগ্য না হওয়ার আরো দলীল হচ্ছে- যথা,
مَا مِن شَفِيعٍ إِلاَّ مِن بَعْدِ إِذْنِهِ ۔
অর্থাৎঃ “আল্লাহর অনুমোদন ছাড়া কেউ সুপারিশকারী হতে পারবে না”। (ছুরা ইউনুছ)

উল্লেখ্য- নবী, রাসুল,  শহীদ, ওলী-আব্দাল- প্রমূখ ব্যক্তিগণ সুপারিশ করার অনুমোদনপ্রাপ্ত।

আল্লাহ্পাক আরো বলেন-
وَلَا تَنفَعُ الشَّفَاعَةُ عِندَهُ إِلَّا لِمَنْ أَذِنَ لَهُ
অর্থাৎঃ “আল্লাহর অনুমোদন ছাড়া কোন সুপারিশই গ্রহণযোগ্য হবে না”। (ছুরা ছাবা আয়াত ২৩)

আল্লাহ্পাক আরো বলেন-
وَلَا يَشْفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ارْتَضَى
অর্থাৎঃ “আল্লাহর পছন্দনীয় লোক ছাড়া অন্য কেউ সুপারিশ করতে পারবে না”।  (ছুরা আম্বিয়া আয়াত ২৮)।

আল্লাহ্পাক আরো বলেন-
قُل لِّلَّهِ الشَّفَاعَةُ جَمِيعًا لَّهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ
অর্থাৎঃ   “সুপারিশের মূল মালিক আল্লাহ্, তাঁর অধিকারে রয়েছে আসমান যমীনের মালিকানা”। (ছুরা যুমার ৪৪ আয়াত)। যে সে সুপারিশ করতে পারবে না।

আল্লাহ্পাক রাসুলের সুপারিশ সম্পর্কে বলেছেন-
وَلَسَوْفَ يُعْطِيكَ رَبُّكَ فَتَرْضَى
অর্থাৎঃ “হে  প্রিয়  রাসুল, আপনাকে আপনার পালনকর্তা এমন কিছু দিবেন- যাতে আপনি রাযী ও সন্তুষ্ট হয়ে যান”। (ছুরা দোহা)।

ইহা শাফাআতের   আয়াত। সুতরাং হুযুর  (ﷺ) -এর সুপারিশ কবুল করে  আল্লাহ্ তাঁকে সন্তুষ্ট করবেন। আল্লাহর  কালামের বাচনভঙ্গির দ্বারাই বুঝা যাচ্ছে- শাফাআতের অধিকার তিনি যাকে তাঁকে দেন না। পছন্দনীয় রাসুল, শহীদ, ওলী,  গাউস,  কুতুব, সিদ্দিক, উলামা, হাফেযুল কোরআন- প্রমুখ ছাড়া তিনি কাফেরদেরকে সুপারিশ করার কোন ক্ষমতাই দিবেন না। সুতরাং কাফিরও  বাতিল আক্বিদা পোষনকারী  কেউ সুপারিশ করতে পারবে না- ইহাই আয়াত সমূহের মূল কথা।

কিন্তু এক শ্রেণীর চিন্তাবিদ ও তথাকথিত মুফাসসিরগণ বলে বেড়ায়- “হাশরে কেউই সুপারিশ করার অধিকার রাখেনা”। এটা তাঁদের মনগড়া অপব্যাখ্যা। তাঁদের নেতা ইবনে কাইয়েম কিন্তু আল্লাহ্ কর্তৃক অনুমোদিত শাফাআত মানেন। তাঁর ”কিতাবুর  রূহ্” গ্রন্থে তিনি অকপটে তা স্বীকার করেছেন।

জনৈক মওদূদীপন্থী মাওলানা  আবদুর রহিম তাঁর ”কলেমা তৈয়্যেবা” বইয়ের  ৩০ পৃষ্ঠায় লিখেছে- “শাফাআত হচ্ছে সুপারিশ মাত্র। আল্লাহর ইচ্ছা হলে তা কবুল করতেও পারেন নাও করতে  পারেন”। (নাউযুবিল্লাহ্)

হাদীস শরীফে শাফাআত অধ্যায়ে বহু হাদীস রয়েছে। আমাদের প্রিয়নবীকে আল্লাহ্পাক ৬টি শাফাআতের অধিকারী করেছেন। নবী করিম (ﷺ) শাফাআত সম্পর্কে জোর দিয়ে বলেছেন- “শুধু আমিই নই- অন্যান্য  নবীগণ, সিদ্দীকগণ এবং হাক্কানী  আলেমগণও রোয হাশরে সুপারিশ করবেন এবং সে সুপারিশ গৃহীত হবে”। তদুপরি- আকায়েদ গ্রন্থ শরহে আকায়েদে নসফী- তে উল্লেখ আছে-
الشفاعۃ المقبولۃ ثابتۃ بالکتاب والسنۃ ۔
অর্থাৎঃ “আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য সুপারিশ কোরআন ও সুন্নাহ দ্বারা সুপ্রমাণিত”।

পরবর্তী অধ্যায়ে তা  বিস্তারিত বর্ণনা  করা হবে- ইন্শা-আল্লাহ্। এখানে উল্লেখ  করার কারণ হলো- শাফাআতের দ্বারা  কবর বাসীগণ যে কবর আযাব থেকে মাফ পায়- তাঁর প্রমাণ দেওয়া। সাঈদী সাহেব তাফসীরে  সাঈদীতে  শাফাআতের  ব্যাখ্যায় রাসুলেপাকের  শাফাআতকে পরিষ্কার অস্বীকার করেছে। এরা ভ্রান্ত ও ইসলাম বিকৃতকারী।

(গ) নেককার লোকের  দোয়ায় ফিরিস্তার আযাব ঠেকানো যায়-
وقال ابن  ابی الدنیا وحدثنا احمد بن یحیی قال حدثنی بعض اصحا بنا قال مات اخی فرایتہ فی النوم فقلت ماکان حالک حین وضعت فی قبرک؟ قال اتانی آت بشھاب من نار فلولا ان داعیااعالی لرأیت الہ سیضربنی بہ ۔
অর্থাৎঃ “ইবনে আবিদ দুনিয়া বলেন- আমি আহমদ ইবনে ইয়াহ্ইয়া থেকে শুনেছি- তিনি তাঁর বন্ধুর কাছ থেকে শুনা একটি ঘটনা এভাবে বর্ণনা করেছেন- ঐ বন্ধু বলেছেন- “আমার ভাইয়ের মৃত্যুর পর তাঁকে আমি জিজ্ঞাসা করলাম- ভাই, তোমাকে কবরে রাখার পর তোমার কি অবস্থা হয়েছে- তা একটু বলো। মৃত ভাই বললো- আমার কাছে একজন ফিরিস্তা আগুনের উল্কা নিয়ে এসেছিল। যদি না জনৈক দোয়াকারী  আমার জন্য দোয়া করতেন- তাহলে  ফিরিস্তা আমাকে ঐ আগুনের উল্কা দিয়ে  অবশ্যই আঘাত করতো”। (কিতাবুর রূহ্ পৃঃ ১৫৩)।

বুঝা গেল-  অলীগণের দোয়ায় কবর আযাব রহিত হয়।

(ঘ) নেক্কার লোকের  পার্শ্বে কবর দিলে জাহান্নামী ব্যক্তিও জান্নাতী হয়ে যায়। প্রমাণ-
وقد ذکر ابن ابی الدنیا حدثنی محمد بن موسی الضائغ ۔ حدثنا عبد اللّٰہ بن نافع ۔ قال مات رجل من اھل المدینۃ فراہ رجل کانہ من اھل النار فاغتم لذلک ۔ ثم انہ بعد ساعۃ او ثانیۃ راہ کانہ من اھل الجنۃ ۔ فقال الم تکن قلت انک من اھل النار ۔ قال قد کان ذلک  الا انہ دفن معنا رجل من الصالحین فشفع فی اربعین ۔ من جیرانہ فکنت انامنھم ۔
অর্থাৎ- “মোহাদ্দেস ইবনে আবিদ  দুনিয়া বলেছেন- আমি মুহাম্মদ ইবনে মুছা থেকে শুনেছি- তিনি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে নাফে’ থেকে শুনেছেন। আবদুল্লাহ্ ইবনে নাফে’ বলেন- জনৈক  মদিনাবাসী মৃত্যুমুখে পতিত হলে তাঁকে  অন্য এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন- সে জাহান্নামের শাস্তি ভোগকারী। এতে জীবিতব্যক্তি চিন্তান্বিত হয়ে পড়লেন। একঘন্টা- কি দু’ঘন্টা পর  আবার তাঁকে দেখে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন- সে এখন জান্নাতীদের  অন্তর্ভূক্ত হয়েছেন।  জীবিত ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন- ব্যাপার কী? তুমি  না এক দু ঘন্টা পূর্বে বলেছিলে যে, তুমি জাহান্নামীদের   অন্তর্ভূক্ত- আর এখন বলছো  জান্নাতীদের অন্তর্ভূক্ত? কবরবাসী বললো- ব্যাপারটি তাই ছিল। কিন্তু ইতিমধ্যে আমাদের কবরস্তানে একজন ওলী-আল্লাহ্ দাফন হয়েছেন। তিনি তাঁর  চল্লিশজন প্রতিবেশীর  মাগফিরাতের জন্য দোয়া করেছেন। আমিও সেই প্রতিবেশীর  একজন”। (ওহাবী ইবনে কাইয়েম কৃত কিতাবুর রূহ্ পৃঃ ১৫৩)।

ব্যাখ্যাঃ  পরিস্কার  বুঝা গেল- নেক্কার  এবং ওলী-আল্লাহগণের পার্শ্বে কবর দিলে এবং তারা তাঁর প্রতিবেশী হলে জাহান্নামী ব্যক্তিও ওলীর  সুপারিশে জান্নাতী হতে পারে। কবরের আযাব ক্ষনস্থায়ী হওয়ার ইহাই প্রমাণ।

(ইবনে কাইয়েম -এর কথা ওহাবী ও মওদূদীপন্থীরা নির্দ্ধিধায় মেনে নেয়- তাই বর্ণনা করলাম)।

(ঙ) রাবেয়া  বসরীয়া (রহঃ) -এর কবরে কিভাবে জীবিতদের দোয়া পৌঁছ্তো-
قال بشار بن غالب رأیت رابعۃ  فی منامی وکنت کثیرا لدعاء لھا ۔فقالت لی یا بشار بن غالب ھدایاک تأتینا علی اطباق من نور  مخمر بمنا دیل الحریر ۔ قلت کیف ذلک ۔ قالت ھکذا دعاء المؤمنین الاحیاء اذا دعوا للموتی اسجیب لھم ذالک الدعاء علی اطباق النور و خمربمنا دیل الحریر ثم اتی بھا الذی دعی لہ من الموتی فقیل ھذہ ھدیۃ فلان الیک ۔ (الروح)
অর্থাৎঃ “বাশশার ইবনে গালেব (জনৈক অলী-আল্লাহ্) বলেন- আমি রাবেয়া বসরীয়ার জন্য বেশী বেশী দোয়া করতাম। একদিন রাবেয়া (রহঃ) কে স্বপ্নে  দেখতে পেলাম। তিনি আমাকে নাম ধরে বলছেন- হে বাশশার ইবনে গালেব! তোমার প্রেরিত  দোয়ার হাদিয়া  আমাদের কাছে রেশমী রূমালে আবৃত  খাঞ্চা করে আসে।  আমি (বাশশার) বল্লাম- কিভাবে আসে? রাবেয়া  রহমতুল্লাহি আলাইহা বল্লেন- তোমার মত অন্যান্য   জীবিত মোমেনদের  দোয়াও মৃত কবরবাসীদের কাছে  পৌঁছে। জীবিতদের দোয়া কবরবাসীদের জন্য কবুল করা হয়  এবং তা নূরের খাঞ্চায় করে রেশমী  রুমালে আবৃত করে কবরে পৌঁছানো হয়। উক্ত খাঞ্চা কবরবাসীর নিকট এনে বলা হয়- ইহা তোমার  জন্য অমুকের পক্ষ হতে হাদিয়া স্বরূপ। (কিতাবুর রূহ্ পৃঃ ১৫৩)।

(চ) কবরবাসীর নিকট ইছালে ছাওয়াব পৌঁছে এবং মৃতরা দোয়া করেন

হযরত আনাছ ইবনে মালেক (রাঃ)  বলেন- রাসুল করিম  সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন-
انک لتصدق عن میتک بصدقۃ فجیئی بھا ملک من الملائکۃ فی اطباق من نور فیقوم علی راس القبر فینادی یا صاحب القبر الغریب اھلک  قاد اھدوا الیک ھذہ  الھدیۃ ۔ فاقبلھا ۔ قال: فیدخلھا الیہ فی قبرہ ویفسخ لہ فی مداخلہ وینور لہ فیہ فیقول جزی اللّٰہ اھلی عنی خیر الجزاء ۔

অর্থাৎঃ “তোমরা তোমাদের মৃতজনদের জন্য অবশ্যই কিছু দান করবে। তোমাদের উক্ত সদ্কা বা দান নূরের খাঞ্চায় করে আল্লাহর একজন নূরী ফিরিস্তা কবরবাসীর মাথার কাছে এসে এভাবে ডাক দিবে- “হে কবরের প্রবাসী। তোমার আত্মীয়স্বজনরা তোমার জন্য  এই হাদিয়া পেশ করেছেন- অতএব তুমি এই হাদীয়া গ্রহন করো”। নবীজী বলেন- উক্ত ফিরিস্তা তার জন্য প্রেরিত দান তার কবরে  পৌঁছিয়ে দেয় এবং তার কবরকে আরো প্রশস্ত ও নূরান্বিত করে দেয়। মৃতব্যক্তি তখন বলে- আমার স্বজনদেরকে আল্লাহ্ উত্তম পুরষ্কার দান করুন”। (তায্কিারাহ্ ৯৪ পৃষ্ঠা)। বুঝা গেল- সওয়াব পেয়ে মুর্দারগণ দোয়া করে এবং কবরবাসীদের দোয়া কবুল হয়।

ব্যাখ্যাঃ প্রমাণিত হল- জীবিতদের যেকোন দান অতি সম্মানের সাথে নূরের খাঞ্চায় করে ফিরিস্তা কবরবাসীর নিকট পৌঁছিয়ে দেয়- তা যত দূরেই হোক না কেন। আরো বুঝা গেল- এই হাদিয়ার বিনিময়ে কবরবাসীর আযাব মাফ হয়। আল্লাহর অসীম রহমতে বান্দাকে বিভিন্নভাবে উপকৃত করা হয়। তাই- বান্দার কী করা উচিৎ? আরো বুঝা গেল- কবরবাসীরা সদকাকারীর জন্য   উত্তম দোয়া করেন। ইছালে ছওয়াব ও যিয়ারতের মাধ্যমে মৃতজনদের দোয়া পাওয়া যায়। সুতরাং মাযারে মানুষ ছওয়াব লাভের জন্য  এবং অলীগণের দোয়া পাওয়ার উদ্দেশ্যেই গমন করে।

(ছ) জীবিতদের দোয়া অবশ্যই কবরবাসীর  কাছে পৌঁছে-
قال ابن ابی الدنیا  حدثنی ابو عبد بن بحیر قال حدثنی بعض اصحبنا قال رایت اخالی فی النوم بعد موتہ فقلت ایصل الیکم دعاء الاحیاء قال ای واللّٰہ یترفرف مثل النور ثم یلبسہ ۔
অর্থাৎঃ ইবনে আবিদ্ দুনিয়া বলেন- আমাকে  আবু আব্দ ইবনে বোহাইর বলেছেন যে, তিনি তার জনৈক বন্ধুকে  বলতে শুনেছেন- “আমার এক ভাই মারা যাওয়ার পর স্বপ্নে  তাঁকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম- আচ্ছা, জীবিত ব্যক্তিদের দোয়া  কি মৃত ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে? সে জবাব দিল- হ্যাঁ, অবশ্যই পৌঁছে। আল্লাহর শপথ, ঐ দোয়া  নূরের গতিতে রফরফের ন্যায় মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে এবং তাকে ঐ দোয়া চাদরের ন্যায় পরিধান করিয়ে দেয়া হয়”।

ব্যাখ্যাঃ  রাসুলেপাক (ﷺ) যা বলে গেছেন- পরবর্তী যুগের  ওলীগণ কাশ্ফ এবং স্বপ্নের মাধ্যমে তাঁর সত্যতার হুবহু প্রমাণ পেয়েছেন। সুতরাং ওলীগণের স্বপ্নের বিবরণ যয়ীফ হাদীসকেও শক্তিশালী করে।

বিশেষ জ্ঞাতব্যঃ একটি বিষয় স্মরণে রাখা প্রয়োজন। তাহলো- যয়ীফসহ সব হাদীস   আমলের ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু কোন অলী-আল্লাহ্ যদি কাশফের মাধ্যমে অথবা স্বপ্নযোগে ঐ জয়ীফ হাদীসের সত্যতার প্রমাণ পান, তাহলে ঐ হাদীস আর যয়ীফ থাকে না- বরং একধাপ উপরে উঠে  সবল হাসান হাদীসের পর্যায়ভূক্ত হয়ে যায়। অছুলে হাদীসের এই নীতিমালা না জানার কারণে অনেক যাহেরী ওহাবী মৌলভীরা মানুষকে ধোকার মধ্যে ফেলে দেয় এবং তাঁদের স্বার্থসিদ্ধি উদ্ধার করে নেয়। তাছাড়াও ১১টি পদ্ধতিতে  দূর্বল হাদীস সবল হয়ে যায় বলে মুফতী আহমদ ইয়ার খান (রহঃ) তাঁর “শানে হাবীব” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং যয়ীফ হাদীস বলে মানুষকে ধোকা দেয়া উচিৎ নয়।

আর একটি বিষয় জানা দরকার। তা হলো-  একটি হাদীস বিভিন্ন চ্যানেলে  আমাদের নিকট পৌঁছেছে। দেখা গেলো- একটি  চ্যানেলে বা সনদে বা রাবীর মাধ্যমে বর্ণিত হাদীসখানা জয়ীফ বলে প্রমাণিত হয়েছে সত্য-  কিন্তু  অন্য চ্যানেলে  বা সনদে উহা শক্তিশালীরূপে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং কোন বইয়ে জয়ীফ হাদীস বলে মন্তব্য করা হলেও  ঘাবড়িয়ে না গিয়ে তাকে প্রশ্ন করতে  হবে-  আপনিতো এক চ্যানেলের মুন্সী- অন্য চ্যানেলের খবর রেখেছেন কী? তখনই দেখবেন- সে থতমত খেয়ে যাবে।

”আল মাকালাতুছ ছানিয়াহ্” নামক আরবী গ্রন্থে  জালালুদ্দীন সুয়ুতির একটি উদ্ধৃতি এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে- “কোন হাদীসকে জয়ীফ বলে ফতোয়া দিতে হলে অন্ততঃ পঞ্চাশ হাজার হাদীস সনদসহ তার মুখস্ত থাকতে হবে। তাকেই শাইখুল হাদীস বলা হয়”।  আমাদের দেশের মুর্খ শাইখুল হাদীস নয়।

পোষ্টটি ভালো লেগে থাকলে আপনার মূল্যবান মতামত জানান প্লিজ!

Leave a Comment