রাসূলপ্রেম ও তাঁর অনুসরণ

পোষ্টটি অন্যকে পড়ার সুযোগ করে দিতে শেয়ার করুন প্লিজ।

রাসূলপ্রেম ও তাঁর অনুসরণ
[কলম সৈনিকের দ্বিতীয় সফর শীর্ষক ফেসবুক পেইজ হতে সংগৃহীত]

কোর’আনে কারীমের আয়াত
_______________
আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেন,
হে নবী, আপনি বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও, তবে আমাকে অনুসরণ করো।
সূরাহ আল ইমরান-৩১
এখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অনুসরণ নিয়ে প্রশ্ন।
এ অনুসরণের ফলাফল কী? এর পেছনে কী কারণ থাকে?

ইমাম আযহারীর তাফসীর
______________
ইমাম আযহারী বলেন,

محبة العبد لله ورسوله طاعته لهما واتباعه أمرهما ; قال الله تعالى :قل إن كنتم تحبون الله فاتبعوني

আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য বান্দার ভালোবাসা হচ্ছে তাঁদের উভয়ের আনুগত্য করা এবং তাঁদের নির্দেশ অনুসরণ করা। আল্লাহ তা’আলা বলেন, قل إن كنتم تحبون الله فاتبعوني
রেফারেন্স:
আল জামিউ লি আহকামিল কোর’আন লিল কুরতুবী, সুরা আল ইমরানঃ ৩১

প্রকৃত ভালোবাসা তখনই প্রকাশ পায় যখন হাবীব তার মাহবুবকে অনুসরণ করে। এই অনুসরণ-ই হচ্ছে তার ভালোবাসার প্রমাণ।

হাফিয ইবনুল কায়্যিমের আন্ডারস্ট্যান্ডিং
____________________
হাফিয ইবনুল কায়্যিম বলেন,

ভালোবাসার শর্ত হচ্ছে তুমি যাকে ভালোবাসো, কোনো রকম অবাধ্যতা ছাড়া তুমি তাকে মেনে চলবে , অনুসরণ করবে।
রেফারেন্স:
শারহুন নূনিয়্যাহঃ ২/১৩৪

ইবনুল কায়্যিম আল জাওযিয়্যা আরো বলেন,

فإن أمته يحبونه لمحبة الله له

অর্থাৎ, তাঁর (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের) উম্মতগণ তাঁকে ভালোবাসবে তাঁর প্রতি আল্লাহর ভালোবাসার কারণে।
এরপর তিনি বলেছেন,

فهي محبة من موجبات محبة الله

অর্থাৎ, এমন ভালোবাসাই আল্লাহর ভালবাসাকে আবশ্যক করে দেয়। অর্থাৎ, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালোবাসলে আল্লাহ তা’আলা ওই ব্যক্তিকে অবশ্যই ভালোবাসেন।
রেফারেন্স:
জালা উল আফহাম লি ইবনিল কায়্যিম- ২০৫

এখন সূরা আলে ইমরানের ওই আয়াতটি পড়ুন আর হাফিয ইবনুল কায়্যিমের কথাগুলো চিন্তা করুন। যা পাবেন তা হলো, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণের অর্থ হচ্ছে তাঁকে ভালবাসা।

এ গেল সুরা আলে ইমরান-এর আয়াত সম্পর্কে আলোচনা।

এবার চলুন, কোর’আনে কারীমের অন্য একটি আয়াত, যে আয়াতের তাফসীরে মুফাসসিরূনে কেরাম রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালোবাসা ওয়াজিব বলেছেন, সেটার দিকে আলোকপাত করি:

কোর’আনে কারীমের আয়াত
_______________
قُلْ إِنْ كَانَ آَبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالٌ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ

বলুন, তোমাদের কাছে যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় করো এবং তোমাদের বাসস্থান, যাকে তোমরা পছন্দ করো, তা আল্লাহ, তাঁর রসূল ও তাঁর রাহে তথা রাস্তায় জেহাদ করা থেকে অধিক মহব্বতের বা বেশি প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা করো আল্লাহর (শাস্তিমূলক) বিধান আসা পর্যন্ত, আর আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে হেদায়েত করেন না।
সূরা তাওবাহ ২৪

আয়াতের তাফসীর
___________
ইমাম কুরতুবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,

وفي الآية دليل على وجوب حب الله ورسوله ، ولا خلاف في ذلك بين الأمة

অর্থাৎ, এ আয়াতের মধ্যে আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালোবাসা যে ওয়াজিব, তার দলীল বিদ্যমান। আর উম্মতের মধ্যে এ নিয়ে কোন এখতেলাফ তথা মতপার্থক্য নেই।
রেফারেন্সঃ
আল জামিউ লি আহকামিল কোর’আন, সূরা তাওবাহঃ ২৪

ইবনু তাইমিয়্যাহ’র আন্ডারস্ট্যান্ডিং
__________________
হাফিয ইবনু তাইমিয়্যাহ বলেন,

ومن حقِّه – صلى الله عليه وسلم – أن يكون أحبَّ إلى المؤمن من نفسه وولده وجميع الخلق؛ كما دلَّ على ذلك قوله – سبحانه -: {قُلْ إِنْ كَانَ آَبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالٌ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ

(উম্মতের ওপর) রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হক তথা অধিকার হচ্ছে, মুমিনের কাছে তার নিজ সত্তা থেকে, তার সন্তান থেকে এবং সমগ্র সৃষ্টি থেকে তিনি অধিকতর প্রিয় হবেন। দলীল হচ্ছে কোর’আনের আয়াত –

(অনুবাদ) বলুন, তোমাদের কাছে যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় করো এবং তোমাদের বাসস্থান, যাকে তোমরা পছন্দ করো, এসবই আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর রাহে তথা রাস্তায় জেহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা করো আল্লাহর (শাস্তিমূলক) বিধান আসা পর্যন্ত, আর আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে হেদায়েত করেন না।
সূরা তাওবাহ: ২৪ আয়াত

রেফারেন্স:
তাকরীবুস সারিমিল মাসলূল আলা শাতিমির রাসূল লি ইবনি তাইমিয়্যাহঃ ১/২৫৯

সারকথা

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহিও ওয়া সাল্লামকে ভালোবাসার নির্দেশনা কোর’আনে কারীমেই বিদ্যমান। এ উম্মতের কেউ তা কখনো অস্বীকার করেননি। এখন এই ফেতনার যামানায় কেউ যদি তা অস্বীকার করে, তবে হয়তঃ সেটা তার না জানার কারণে হতে পারে, নতুবা জেনে শুনে রাসুল সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের ভালোবাসার বিরুদ্ধে এই কমবখত দুশমনি করছে। আর মুমিন অবস্থায় রাসুল সাল্লামকে অনুসরণ করাই হচ্ছে তাঁকে ভালোবাসা। আর এটাই হচ্ছে প্রকৃত ভালোবাসার নজীর।
______________________________
এডমিনের জরুরি জ্ঞাতব্য

হযরত আনাস (রা:) বর্ণিত, জনৈক বেদুঈন সাহাবী (রা:) হুযূর পাক (দ:)-কে জিজ্ঞেস করেন, এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! শেস বিচার দিবস কখন হবে? মহানবী (দ:) পাল্টা প্রশ্ন করেন, আফসোস তোমার জন্যে! তুমি এর জন্যে কী প্রস্তুতি গ্রহণ করেছাে? সাহাবী (রা:) জবাব দেন, তেমন কিছুই না, তবে আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (দ:)-কে ভালোবাসি। এমতাবস্থায় রাসূল (দ:) এরশাদ করেন, তুমি যাঁদের ভালোবাসো, তাঁদের সঙ্গে থাকবে। [ইমাম বুখারী, আদাব, ১৮৮]

হাদীসটিতে রাসূলুল্লাহ (দ:) ওই সাহাবী (রা:)-কে পাল্টা জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তুমি এর জন্যে কী প্রস্তুতি গ্রহণ করেছো?” উত্তরে সাহাবী (রা:) জানান, “তেমন কিছুই না।” এর মানে তিনি আমলের বাহাদুরি করেননি, বরং নিজেকে বে-আমল, দীন-হীন হিসেবে পেশ করেছেন। আরেক কথায়, তাঁর এতায়াত তথা আনুগত্য/তাবেদারি ঘাটতিপূর্ণ, এ কথা তিনি অকপটে স্বীকার করে নিয়েছেন, যা বর্তমানকালের হামবড়া ভাবের অধিকারী এক শ্রেণির মোল্লা-পুরোহিতদের ও তাদের অনুসারীদের মাঝে দেখা যায় না। অতঃপর ওই সাহাবী সার কথাটি বলেছেন। তিনি জানান, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (দ:)-কে তিনি ভালোবাসেন। এই ভালোবাসা তাঁদের সত্তার প্রতি, আখেরাতের প্রস্তুতিরূপী আমলদারি এতে অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা, তা ইতিপূর্বেই এক্সক্লুড বা বাদ পড়েছে তাঁরই “কিছুই না” বক্তব্য দ্বারা। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছেড়ে তাতে উন্নীত হওয়ার সিঁড়ি বা সোপানকে মূল লক্ষ্য নির্ধারণ করা স্রেফ বেওকুফি!

মহানবী (দ:)-এর ভালোবাসা ঈমানের সাথে সম্পৃক্ত বিষয়, আর আমল ও এবাদত-বন্দেগী মূল ঈমানের অন্তর্ভুক্ত নয়। এই দুটো বিষয়কে তালগোল পাকিয়ে ফেলা ওহাবী/মওদূদী/সালাফীদেরই গোমরাহী, যা সুন্নী আকীদার পরিপন্থী।

ওপরোক্ত রেওয়ায়াত তথা বর্ণনায় বেদুঈন আরব সাহাবী (রা:) যখন বলেন, “আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (দ:)-কে ভালোবাসি”, তখন মহানবী (দ:) তাঁকে জানান, “তুমি তাঁদের সাথে থাকবে, যাঁদের তুমি ভালোবাসো” [বুখারী, আদাব, ১৮৮]। অতএব, বার্তা একদম স্পষ্ট, আর সিদ্ধান্ত-ও ফায়সালাকারী! অর্থাৎ, তিনি আখেরাতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (দ:)-এর সাথে অবস্থান করবেন। লক্ষণীয় যে মহানবী (দ:)-ই এই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। এ ধরনের আরো বর্ণনা আছে হাদীস গ্রন্থগুলোতে।। এগুলোর সাথে আল-কুরআন কোথায় সাংঘর্ষিক, তা কিন্তু বাতেলপন্থীরা নির্দেশ করতে পারেনি। বস্তুত তারাই কুরআন মজীদের অপব্যাখ্যাকারী।

দলিলচিত্র

পোষ্টটি ভালো লেগে থাকলে আপনার মূল্যবান মতামত জানান প্লিজ!

Leave a Comment