বত্রিশতম অধ্যায়ঃ হাশর ময়দানের নতুন যমীন

পোষ্টটি অন্যকে পড়ার সুযোগ করে দিতে শেয়ার করুন প্লিজ।

প্রশ্নঃ হাশরের ময়দান কোথায় হবে এবং কেমন হবে? ঐ  ময়দানে কারা কারা থাকবে? তাদের অবস্থা কি হবে? বিচার কখন  অনুষ্ঠিত হবে? কে বিচার শুরু করার সুপারিশ করবেন? হাশরবাসীরা কার  কার কাছে সাহায্যপ্রার্থী হবে? কিজন্য সাহায্য চাইবে? কে সাহাযের জন্য এগিয়ে আসবেন? কার সাহায্য সেদিন কাজে আস্বে?

জওয়াবঃ বর্তমানের এই আসমান যমীনের পরিবর্তে অন্য আসমান  যমীন পয়দা হবে- বলে কোরআন মজিদে ঘোষিত হয়েছে। সেখানেই বিশাল একটি সাদা ও সমতল ময়দান হবে। আল্লাহ্পাক এরশাদ করেন-
يَوْمَ تُبَدَّلُ الأَرْضُ غَيْرَ الأَرْضِ وَالسَّمَاوَاتُ وَبَرَزُواْ  للّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ
অর্থাৎ- “সেদিন এ যমীনের পরিবর্তে অন্য যমীন হবে এবং আসমানও অনুরূপভাবে পরিবর্তিত হবে। আর লোকেরা এক পরাক্রমশালী আল্লাহর সামনে হাযির হবে”। (ছুরা ইব্রাহীম ৪৮ আয়াত)।

কোন কোন বর্ণনায় হাশরের ময়দান হবে শামদেশে। হযরত ইবনে আব্বাসের বর্ণনায় এই যমীনকেই আরো সম্প্রসারিত করা হবে। যমীনটি হবে সাদা রঙ্গের।

যমীন পরিবর্তিত হওয়ার দুইটি  সূরত হতে পারে। একটি সূরত হতে পারে গুণগত পরিবর্তন- অর্থাৎ এই যমীনের  আকার ও আকৃতি পাল্টে যাবে। যেমন, কোরআন মজিদের অন্যান্য আয়াত এবং  হাদীস শরীফে আছে- “সমগ্র ভূভাগকে একটি সমতল ভূমিতে পরিণত করে দেয়া হবে। এতে গৃহ, গাছপালা, পাহাড় পর্বত কোন কিছুর চিহ্নই থাকবেনা। সব একসমান হয়ে যাবে”। এ অবস্থা প্রসঙ্গে আল্লাহ্পাক  এরশাদ করেন-
لَّا تَرَىٰ فِيهَا عِوَجًا وَلَآ أَمْتًا
অর্থাৎ- (গৃহ ও পাহাড়ের কারণে  বর্তমানে রাস্তা আঁকা-বাঁকা হয়ে চলেছে। কোথাও উচু, কোথাও নীচু দেখা যায়)। “হে  হাবীব! কিয়ামতের দিনে এগুলো দেখতে পাবেন না- বরং সব সমান হয়ে একটি সমতল ভূমিতে পরিণত হবে”। এটা হবে গুণগত পরিবর্তন।

গুণগত পরিবর্তনের অন্য একটি প্রমাণ পাওয়া যায় হযরত ইবনে আব্বাছের বর্ণনায়। তিনি বলেন-
إذا كان يوم القيامة مدت الأرض مد الأديم و زيد في سعتها كذا و كذا وجمع الخلائق بصعيد واحد ، جنهم  وإنسهم-
অর্থাৎ- “যখন কিয়ামত হবে, তখন এই  যমীনকেই আটার  ন্যায় টেনে সম্প্রসারিত করা হবে।  তার প্রশস্ততাকে আরো অনেক অনেক বাড়ানো হবে এবং সমগ্র মানব ও দানবকে একটি সমতল   ভূমিতে একত্রিত করা হবে”। (মুহাসিবী কৃত তাওয়াহ্হুম ওয়াল আহ্ওয়াল)।

পৃথিবী ও আকাশ পাল্টে যাওয়ার দ্বিতীয় সূরত এমনও হতে পারে যে, এ পৃথিবীর পরিবর্তে অন্য এক পৃথিবী এবং এ আকাশের পরিবর্তে অন্য এক আকাশ তৈরী হবে। এটা হবে সত্ত্বাগত পরিবর্তন।

সত্ত্বাগত  পরিবর্তনের বিষয়টির প্রমাণ পাওয়া যায় হযরত ইবনে মাসউদের বর্ণনায়।  ইমাম বায়হাকী উপরে  আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে মাসউদ (রাঃ)-এর    বর্ণনায়    রাসুলুল্লাহ্ (ﷺ)-এর একটি উক্তি এভাবে বর্ণনা করেছেন- “হাশরের পৃথিবী হবে এক নূতন পৃথিবী। এর রং হবে রৌপ্যের মত সাদা।  এর উপর কোন গুনাহ্ অথবা অন্যায় খুনের কোন চিহ্নই থাকবেনা”। (মাযহারী)

পৃথিবী  সত্ত্বাগতভাবে অথবা গুণগতভাবে যেভাবেই হোক- পরিবর্তিত ও বৃহত্তর আকারে হবে।  এখানে সমস্ত আদম সন্তানকে জমায়েত করা হবে। ভীড় এত হবে যে, এক   একজনের অংশে শুধু দাঁড়াবার অংশটুকুই পড়বে।

সমন্বয়ঃ দুই হাদীসের মধ্যে সমন্বয় এভাবে করা যেতে পারে-

প্রথমে গুণগত  পরিবর্তন শুরু হবে। তখন পাহাড়, পর্বত, বনজঙ্গল সমান হয়ে যাবে। তখন এর পরিবর্তে অন্য একটি যমীন সৃষ্টি হবে রুটীর  মত সাদা এবং সম্প্রসারিত রূপ নিয়ে। তখন মানুষ এই যমীন থেকে ঐ যমীনে পুনর্বাসিত হবে সাত পুলসিরাত পার হয়ে। শেষ পুলসিরাত হবে জাহান্নামের উপর। বিচারের পর ঐ পুলসিরাত অতিক্রমকালে  গুনাহ্গারও কাফিরগণ জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে এবং  অন্যরা অতিক্রম করে হাউযে  কাউছার পান করে জান্নাতে প্রবেশ করবে। ইবনে আব্বাস ও ইবনে মাসউদের বর্ণনার এটা হলো সমন্বয় ও সমাধান।

মুসলিম শরীফের একটি হাদীসে বর্ণিত আছে- এক ইহুদী হুযুর (ﷺ) কে প্রশ্ন করেছিল- এই পৃথিবী যখন ধবংস হবে- তখন  মানুষ কোথায় থাকবে?  হুযুর (ﷺ) বল্লেন- মানুষ তখন পুলসিরাতের নিকটে একটি  অন্ধকারময়  জায়াগায় থাকবে। এতেই বুঝা যায় যে, এই পৃথিবী থেকে অন্য নুতন পৃথিবীতে নেয়ার জন্য  সাতটি পুলসিরাতের মাধ্যমে স্থানান্তর করা হবে। “তাফসীরে ইবনে জারীর- এর মধ্যে একাধিক সাহাবী ও তাবেয়ী থেকে বর্ণনা করা হয়েছে যে, তখন এই পৃথিবী ও তার নদ-নদী গলিত তামার ন্যায় অগ্নিতে পরিণত হবে। তখন বর্তমান বিশ্বটি  হয়ে যাবে- যেন একটি  জাহান্নাম”। আল্লাহর  কাছে ঐ দুরবস্থা থেকে পানা চাই।

গাযালীর মতামতঃ
======
ইমাম আবু হামেদ  গাযালী (রঃ) “কাশ্ফু উলুমিল আখিরাত” গ্রন্থে এক পৃথিবী থেকে  অন্য  নূতন পৃথিবীতে স্থানান্তরের  বিবরণ  এভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন।  ইমাম কুরতুবী (রহঃ) তাযকিরাহ্ গ্রন্থের ২৫৬ পৃষ্ঠায় তা উদ্ধৃত করেছেন।

ইমাম গাযালী (রহঃ) বলেন- “হযরত ইবনে আব্বাস ও দাহ্হাক বর্ণনা করেছেন যে, মানব-দানব ও সমগ্র সৃষ্টি যখন একটি  সমতল ভূমিতে একত্রিত হবে- তখন আল্লাহ্ তায়ালা প্রথম আকাশের ফিরিস্তাদেরকে নির্দেশ করবেন, তাদেরকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার জন্য। ঐ ফিরিস্তারা এক একজন করে জ্বীন, ইনসান, পশু, পাখী ধরে ধরে তাদের পিছনে ঘেরাওকারী অবস্থায় থাকবে। ঐ ফিরিস্তাদের  সংখ্যা হবে দুনিয়াবাসীর দশগুণ। এরপর দ্বিতীয় আকাশের বিশগুণ  ফিরিস্তা এসে ঐ ফিরিস্তাসহ সবাইকে বেষ্টন করে  রাখবে। এরপর তৃতীয় আকাশের ফিরিস্তা ত্রিশগুণ বেশী আকারে এসে সবাইকে বেষ্টন করবে। এর পর  ৪র্থ আকাশের চল্লিশগুন ফিরিস্তা, ৫ম আকাশের পঞ্চাশগুন ফিরিস্তা এবং ৬ষ্ঠ আকাশের ষাইটগুণ ফিরিস্তা এসে সবাইকে বেষ্টন করবে। এরপর সপ্তম আকাশের  সত্তরগুণ ফিরিস্তা এসে পুনরায় সবাইকে বেষ্টন করবে। এভাবে হাশরবাসীদেরকে কোনঠাসা করে ফেলবে। ভিড়ের চোঁটে এক কদমের জায়গায় মানুষ  হাজার কদম রাখবে। সুর্য এত নিকটে আসবে যে, ইচ্ছা করলে যে কেউ তা ধরতে পারবে। সূর্যের তাপ সত্তরগুণ বেশী হবে। কাফেরদের ও গুনাহ্গারদের শরীর থেকে ঘাম এবং মাথা হতে মগজ বের হয়ে নীচে পড়ে সাগরে  পরিণত হবে। কারো গিরা পর্য্যন্ত, কারো হাঁটু পর্য্যন্ত, কারো কোমর পর্য্যন্ত, কারো বুক পর্যন্ত, কারো গলা পর্য্যন্ত, কারো কান পর্য্যন্ত ডুবে যাবে। তখন মানুষের যে কি অবস্থা হবে- তা আল্লাহ্ই জানেন।

নেক্কার মুমিনগণ এই কষ্ট থেকে মুক্ত  থাকবেন। গুনাহ্গার মোমেনগণ গুনাহের  পরিমাণে ঘাম ও মগজের নদীতে ডুবে থাকবে। কিয়ামতের দিনে সূর্য যেভাবে উত্তাপ ছড়াবে, বর্তমানে এই দুনিয়ায় সেভাবে বিকিরণ হলে যমীন জ্বলে যেতো এবং পাথরসমূহ গলে তামার মত হয়ে যেতো। এমতাবস্থায় মানুষ গাদাগাদি ও ঠাসাঠাসি করে একজন আরেকজনের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়বে।

এমতাবস্থায়ও দেখা যাবে-  একদল লোক  ঠাণ্ডা পরিষ্কার পানি পান করছে। এই পানি  পরিবেশন করবে ছোট ছোট শিশুরা। যেসব শিশু ছোটকালে মারা যায়-  তাঁরা তাঁদের পিতামাতাকে জান্নাতের হাউযে কাউছারের পানি  গ্লাস ভরে পান করাবে- হাশরের ময়দানে”। (ইমাম গাযালীর বর্ণনা শেষ)।

ঘামের সাগরঃ
======
হাশরের ভয়াবহ অবস্থা সম্পর্কে হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) নবীজীর একটি  হাদীস বর্ণনা করেছেন- যা মুসলিম শরিফে সংকলিত হয়েছে।
أن رسول الله  صلى الله عليه وسلم قال :- ( إن العرق ليذهب يوم القيامة في الأرض سبعين باعاً , وإنه ليبلغ إلى أفواه الناس أو إلى آذانهم )
অর্থাৎ, “নবী করিম  (ﷺ) এরশাদ করেছেন- হাশরবাসীদের  ঘাম যমীনে এমনভাবে ঝরতে থাকবে যে, তা ৭০ গজ পর্য্যন্ত জায়গা ভিজিয়ে ফেলবে এবং উঁচু হবে এই পরিমানে যে- কারো মুখ পর্য্যন্ত এবং কারো কান পর্য্যন্ত ডুবে যাবে”। (কাফির ও গুনাহ্গারদের বেলায়)।

“বোখারী শরীফে হযরত ইবনে ওমর  (রাঃ) বর্ণনা করেন- নবী  করিম (ﷺ) এরশাদ করেন-  যেদিন মানুষ বিশ্বজগতের পালনকর্তার  দরবারে দণ্ডায়মান হবে, তখন এমন অবস্থা হবে যে, তার কানের নিম্নাংশ ঘামে  ও মগজের রসে ডুবে থাকবে”।

মরফু এবং মউকুফ- উভয় সুত্রে হাদীসখানা বুখারী ও তিরমিযি সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন। হে আল্লাহ্! এই কঠিন যিল্লতির মুখ আমাদেরকে দেখাইওনা।

হাশরের ময়দানে ভয়ে দৌড়া-দৌড়িঃ
======
হযরত বেলাল  ইবনে ছায়ীদ (রাঃ) বলেন, হাশরের ময়দানে লোকেরা দিশেহারা হয়ে দিকবিদিক ছুটাছুটি করতে থাকবে। এই অবস্থাকে يوم الفرار বা ছুটাছুটির দিন বলা হয়েছে। যেমন আল্লাহ্পাকের ইরশাদ-
يَقُولُ الْإِنسَانُ يَوْمَئِذٍ أَيْنَ الْمَفَرُّ – كَلَّا لَا وَزَرَ – إِلَى رَبِّكَ  يَوْمَئِذٍ الْمُسْتَقَرُّ
অর্থাৎ- “সেদিন মানুষ  বলাবলি করবে, “পলায়নের জায়গা কোথায়? না, কোথাও আশ্রয়স্থল  নেই। (হে প্রিয় হাবীব) সেদিন আপনার প্রভুর কাছেই ঠাঁই হবে”। (ছুরা কিয়ামাহ ১০-১২ আয়াত)।

দাহ্হাক বলেন, সেদিন  মানুষ পলায়নের উদ্দেশ্যে দৌঁড়া-দৌঁড়ি করতে করতে  ময়দানের শেষ মাথায় গিয়ে জাহান্নাম  দেখতে পাবে। আরও দেখতে  পাবে,সাজা দানের  ফিরিস্তারা কাতারবন্দী  হয়ে কিয়ামত ময়দান ঘেরাও করে দাঁড়িয়ে আছে। তখন তারা  থমকে দাঁড়াবে এবং বুঝতে পারবে- খোদার রাজ্য সীমা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া কোনমতেই সম্ভব নয়। এদিকে ইঙ্গিত করেই  আল্লাহ্পাক ইরশাদ করেন-
يَا مَعْشَرَ الْجِنِّ وَالْإِنسِ إِنِ اسْتَطَعْتُمْ أَن تَنفُذُوا مِنْ أَقْطَارِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ فَانفُذُوا لَا تَنفُذُونَ إِلَّا بِسُلْطَانٍ – فَبِأَيِّ آلَاء رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ
অর্থাৎ, “হে জ্বীন ও ইনসান! নভোমণ্ডল ও ভূ-মণ্ডলের সীমানা অতিক্রম করা যদি তোমাদের সাধ্যে কুলায়, তাহলে অতিক্রম কর-  দেখি! কিন্ত ছাড়পত্র ব্যতিত তোমরা তা অতিক্রম  করতে পারবে না। অতএব তোমরা উভয়জাতি তোমাদের পালনকর্তার  কোন্ কোন্ অবদানকে অস্বীকার করবে?” (ছুরা আর রহমান ৩৩-৩৪)

পোষ্টটি ভালো লেগে থাকলে আপনার মূল্যবান মতামত জানান প্লিজ!

Leave a Comment