প্রিয় নবী ﷺ এর স্বশরীরে ইসরা ও মি’রাজ

পোষ্টটি অন্যকে পড়ার সুযোগ করে দিতে শেয়ার করুন প্লিজ।

জুমার খুতবা:

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সশরীরে ইসরা ও মি’রাজ

#######################################

সৈয়দ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন আল আযহারী

(বিএ. অনার্স, আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর। এম.এ. এম.ফিল. কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়, মিশর। পিএইচ.ডি গবেষক,চ.বি.)

সহকারী অধ্যাপক, সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ. খতীব, মুসাফির খানা জামে মসজিদ, নন্দন কানন, চট্টগ্রাম।

بسم الله الرحمن الرحيم. الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيد المرسلين وعلى آله وصحبه أجمعين, أما بعد!

ইস্রা ও মি’রাজ মহামহিম আল্লাহর মহান কুদরত এবং সৈয়্যদুল আম্বিয়া হযরত মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লামার অন্যতম মুজিযা।

الاسراء (ইসরা):

রাত্রকালীন ভ্রমণ, যা বাইতুল্লাহ্ শরীফ থেকে শুরু হয়ে বাইতুল মুকাদ্দাস শরীফে সমাপ্ত হয়, যার বর্ণনা আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র ক্বোরআনে সূরা ইস্রা বা বনী ইসরাঈলে এরশাদ করেছেন-

سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ [سورة الاسراء :১ ]

তরজমা: পবিত্র ও মহিমাময় তিনি যিনি তাঁর প্রিয় বান্দাকে রাতারাতি ভ্রমণ করিয়েছেন আল্ মাসজিদুল হারাম হতে আল্ মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত যার পরিবেশ আমি করেছি বরকতময়, তাঁকে আমার নিদর্শনাবলী দেখানোর জন্য, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। [সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত-১]

المِعْرَاج (মি’রাজ):

ঊর্ধ্বগমন, যা বাইতুল মুকাদ্দাস শরীফ থেকে শুরু করে সপ্ত আসমান হয়ে ‘সিদরাতুল মুন্তাহা’ অতিক্রম করে লা-মকান ও খোদা দর্শন পর্যন্ত। যার বর্ণনা ‘সূরা নাজম’ এ বিবৃত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন:

ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّىٰ ﴿٨﴾ فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَىٰ ﴿٩﴾ فَأَوْحَىٰ إِلَىٰ عَبْدِهِ مَا أَوْحَىٰ ﴿١٠﴾ مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَأَىٰ ﴿١١﴾ أَفَتُمَارُونَهُ عَلَىٰ مَا يَرَىٰ ﴿١٢﴾ وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَىٰ ﴿١٣﴾ عِندَ سِدْرَةِ الْمُنتَهَىٰ ﴿١٤﴾ عِندَهَا جَنَّةُ الْمَأْوَىٰ ﴿١٥﴾ إِذْ يَغْشَى السِّدْرَةَ مَا يَغْشَىٰ ﴿١٦﴾ مَا زَاغَ الْبَصَرُ وَمَا طَغَىٰ ﴿١٧﴾ لَقَدْ رَأَىٰ مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَىٰ ﴿١٨﴾ [سورة النجم ০৮-১৮]

“অতঃপর তিনি নিকটবর্তী হলেন, অতি নিকটবর্তী, ফলে তাদের মধ্যে দু’ধনুকের ব্যবধান রইল অথবা তার চেয়েও কম, তখন আল্লাহ্ তাঁর বান্দার প্রতি যা ওহী করার তা ওহী করলেন। যা তিনি দেখেছেন তাঁর অন্তকরণ তা অস্বীকার করেনি। তিনি যা দেখেছেন তোমরা কি সে বিষয়ে তাঁর সাথে বিতর্ক করবে? নিশ্চয় তিনি তাঁকে আরেকবার দেখেছেন। ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ বা প্রান্তবর্তী কুল বৃক্ষের নিকট। যার নিকট অবস্থিত ‘জান্নাতুল মাওয়া’ (বাসোদ্যান)। তখন বৃক্ষটি, যা দ্বারা আচ্ছাদিত হবার তা দ্বারা আচ্ছাদিত হলো। তাঁর দৃষ্টি বিভ্রম হয়নি, দৃষ্টি লক্ষ্যচ্যুতও হয়নি। তিনি তো তাঁর প্রতিপালকের নিদর্শনাবলী দেখেছেন। [সূরা নাজ্ম, আয়াত-৮-১৮]

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সশরীরে ইসরা ও মি’রাজ

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র সশরীরে ইসরা ও মি’রাজ নিয়ে মৃদু বিতর্ক পরিলক্ষিত হলেও অধিকাংশ মুফাস্সির, মুহাদ্দিস, ফকীহ ও মুতাকাল্লিমদের মতে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র ইসরা ও মি’রাজ তাঁর জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে সংগঠিত হয়েছে, যার সপক্ষে ক্বোরআনে করীমের অসংখ্য আয়াত এবং ‘মুতাওয়াতির ফিল মা’না’ পর্যায়ের অগণিত বিশুদ্ধ হাদিস বর্ণিত হয়েছে।

বস্তুত যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর অপরিসীম কুদরতে ঈমান এনেছে এবং এ দৃঢ় বিশ্বাস রাখে যে, আল্লাহ্ ঐ মহান সত্তা যিনি كُن (কুন্) বললেই সবই হয়ে যায়, তাঁর জন্য প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ক্ষণিকের মধ্যে ‘লা মকান’ পর্যন্ত পরিদর্শন করানো অসম্ভব কোন বিষয় নয়। আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন-

إِنَّمَا أَمْرُهُ إِذَا أَرَادَ شَيْئًا أَن يَقُولَ لَهُ كُن فَيَكُونُ ﴿٨٢﴾ فَسُبْحَانَ الَّذِي بِيَدِهِ مَلَكُوتُ كُلِّ شَيْءٍ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ ﴿[سورة يس ـ ৮২-৮৩]﴾

অর্থাৎ তাঁর ব্যাপার শুধু এই, তিনি যখন কোন কিছুর ইচ্ছা করেন, তখন তিনি তাকে বলেন, ‘হও’ ফলে তা হয়ে যায়। অতএব পবিত্র ও মহান তিনি যাঁর হাতেই প্রত্যেক বিষয়ের সর্বময় কর্তৃত্ব; আর তাঁরই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। [সূরা ইয়াছিন, আয়াত-৮২-৮৩]

যে আল্লাহ্ হযরত আদম ও সৈয়্যদা হাওয়া আলাইহিস্ সালামকে ক্ষণিক সময়ের মধ্যে বেহেশত থেকে যমীনে অবতরণ করতে পারেন এবং স্বল্প সময়ে হযরত ঈসা আলাইহিস্ সালামকে আসমানে তুলে নিতে পারেন, তিনি কি তাঁর প্রিয় বান্দাকে স্বল্প সময়ে আসমান-যমীন পরিভ্রমণ করাতে পারেন না? (অবশ্যই পারেন)

যদি হযরত সুলাইমান আলাইহিস্ সালামের অনুসারী হযরত আসেফ ইবনে বরখিয়া দক্ষিণ ইয়েমেন থেকে রাণী বিলকিসের সিংহাসন চোখের পলকের মধ্যে ফিলিস্তিনের ভূমিতে নিয়ে আসতে পারেন, তাঁর যদি এতো ক্ষমতা থাকে তাহলে তাঁর স্রষ্টার ক্ষমতা কতটুকু হবে! আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেছেন-

قَالَ عِفْرِيتٌ مِّنَ الْجِنِّ أَنَا آتِيكَ بِهِ قَبْلَ أَن تَقُومَ مِن مَّقَامِكَ ـ وَإِنِّي عَلَيْهِ لَقَوِيٌّ أَمِينٌ ﴿٣٩﴾ قَالَ الَّذِي عِندَهُ عِلْمٌ مِّنَ الْكِتَابِ أَنَا آتِيكَ بِهِ قَبْلَ أَن يَرْتَدَّ إِلَيْكَ طَرْفُكَ ـ فَلَمَّا رَآهُ مُسْتَقِرًّا عِندَهُ قَالَ هَـٰذَا مِن فَضْلِ رَبِّي لِيَبْلُوَنِي أَأَشْكُرُ أَمْ أَكْفُرُ [سورة النمل : ৩৮-৪০]

তরজমা: এক শক্তিশালী জ্বিন হযরত সুলাইমান আলাইহিস্ সালামকে বলল, আপনি আপনার স্থান ত্যাগের পূর্বেই আমি তা আপনার নিকট এনে দেব এবং এ ব্যাপারে আমি নিশ্চয় ক্ষমতাবান, বিশ্বস্ত। কিতাবের জ্ঞান যার ছিল সে বলল, আপনি চক্ষুর পলক ফেলার পূর্বেই আমি তা আপনাকে এনে দেব। তিনি (হযরত সুলাইমান আলাইহিস্ সালাম) যখন তা সম্মুখে রক্ষিত অবস্থায় দেখলেন, তখন তিনি বললেন, এটা আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ, যাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করছেন- আমি কৃতজ্ঞ না অকৃতজ্ঞ। [সূরা আন্ নাম্ল, আয়াত-৩৮-৪০]

তাই বিভিন্ন রেওয়ায়েতে বর্ণিত আছে- প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরশে আযীম ও লা-মকান প্রদক্ষিণ করে এতো স্বল্প সময়ে ফিরে এসেছেন যে, তাঁর বিছানা মুবারক তখনও গরম, শিকল তখনও নড়ছে এবং ওযূর পানি তখনও প্রবাহিত হচ্ছে।

পবিত্র ক্বোরআনের আলোকে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সশরীরে ইসরা ও মে’রাজ:

১. سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِ আয়াতের بِعَبْدِهِ শব্দের ب অক্ষরটি المصاحبة والإلصاق তথা সংযুক্ত, সংলগ্ন ও সংশ্লিষ্ট করার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের দেহ ও রূহ মুবারক সহকারে। কেননা العبد মানে শুধু রূহকে বুঝায় না বরং রূহ এবং দেহ উভয়কেই বুঝায়। যেমন অন্যত্র আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন وَأَنَّهُ لَمَّا قَامَ عَبْدُ اللَّهِ يَدْعُوهُ كَادُوا يَكُونُونَ عَلَيْهِ لِبَدًا. অর্থাৎ- আর যখন عبد الله আব্দুল্লাহ্ (আল্লাহর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলায়হি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে ডাকার জন্য দাঁড়ালেন তখন তারা তাঁর নিকট ভিড় জমাল। [সূরা জ্বিন, আয়াত-১৯] অর্থাৎ প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম স্বীয় রবকে আহ্বান করার জন্য নিজ দেহ ও রূহের সমন্বয়ে দাঁড়ালেন। শুধুমাত্র রূহের মাধ্যমে নয়।

২. আল্লাহ্ তা‘আলা উপরিউক্ত আয়াতটি শুরু করেছেন سبحان শব্দটি দ্বারা অর্থাৎ সকল প্রকার অপারগতা ও দুর্বলতা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত মহান সত্তা আল্লাহ্ পাক। আর سبحان শব্দটি খুবই আশ্চর্যজনক, মহান ও অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। তাই যদি মি’রাজ নিদ্রিত অবস্থায় কিংবা শুধু রূহ দ্বারা সংগঠিত হতো তাহলে তা কোন আশ্চর্যের বা অস্বাভাবিক বিষয় হতো না। তাছাড়া, আয়াত শরীফে এরশাদ করা হয়েছে যে, ভ্রমণটি করিয়েছেন খোদ্ আল্লাহ্, সুতরাং এ ভ্রমণ করা আল্লাহর জন্য অসম্ভব নয়; কারণ সব অক্ষমতা থেকে আল্লাহ্ পবিত্র। আর নবী করীমের জন্যও ভ্রমণটি করা অসম্ভব নয়।

৩. আল্লাহ্ পাক এরশাদ করেন- مَا زَاغَ الْبَصَرُ وَمَا طَغَىٰ অর্থাৎ তাঁর দৃষ্টি বা চোখ বিভ্রম হয়নি এবং লক্ষ্যচ্যুতও হয়নি। [সূরা আন্ নাজম, আয়াত-১৭] এখানে البصر বা চক্ষু দেহের অংশ, রূহের অংশ নয়।

৪. অনুরূপভাবে আল্লাহ্ পাক এরশাদ করেন- لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا তাঁকে আমার নিদর্শনাবলী দেখানোর জন্য। [সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত-০১]

৫. وَمَا جَعَلْنَا الرُّؤْيَا الَّتِي أَرَيْنَاكَ إِلَّا فِتْنَةً لِّلنَّاسِ وَالشَّجَرَةَ الْمَلْعُونَةَ فِي الْقُرْآنِ [سورة الإسراء :৬০] “আমি যে দৃশ্য আপনাকে দেখিয়েছি তা এবং ক্বোরআনে উল্লিখিত অভিশপ্ত বৃক্ষটিও কেবল মানুষের পরীক্ষার জন্য। (আল ইস্রা-৬০)

যদি এ দৃশ্য অবলোকনটি নিদ্রিত অবস্থা বা রূহ যোগে হতো তাহলে এ বিষয়টি পরীক্ষার কারণ হতো না। ফলে দুর্বল ঈমানের মুসলমানদের সন্দেহের কারণও হতো না এবং কাফিরদের অস্বীকার করার কোন মানেই হতো না। কেননা ঘুমন্তাবস্থায় আত্মার মাধ্যমে ক্ষণিকের মধ্যে বিশ্ব পরিভ্রমণ করাটা কোন নূতন বিষয় নয়।

হাদিস দ্বারা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের সশরীরে ইসরা ও মি’রাজের প্রমাণ

প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের ইস্রা ও মি’রাজ সম্পর্কে বুখারী, মুসলিমসহ বিশুদ্ধ হাদিস শরীফের গ্রন্থগুলোতে এতো অধিক পরিমাণ বর্ণনা পাওয়া যায়, যা মুহাদ্দিসিনে কেরামের পরিভাষায় المتواتر فى المعنى (অর্থের দিক থেকে মুতাওয়াতির) পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। নিম্নে হাদিস শরীফের আলোকে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের সশরীরে ইস্রা ও মি’রাজের কয়েকটি প্রমাণ উপস্থাপন করার চেষ্টা করছি-

১. البراق (বুরাক্ব): প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের যাত্রা শুরু হয় বোরাকে আরোহণের মাধ্যমে। আর বোরাকে আরোহণ প্রমাণ করে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের ইস্রা ও মি’রাজ সশরীরে সম্পন্ন হয়েছে। কেননা বাহন প্রয়োজন হয় দেহের জন্য, রূহের জন্য নয়।

২. অনুরূপভাবে বাইতুল মুকাদ্দাস শরীফের পাথরের সাথে বোরাকের রশি বাঁধা সশরীরে মি’রাজেরই প্রমাণ।

৩. প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের দুধ পান করা: বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, যাত্রাপথে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম যখন পিপাসা অনুভব করলেন তখন জিবরাঈল আলাইহিস্ সালাম তাঁর নিকট শরাব, মধু ও দুধ পেশ করলেন। আর প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম দুধকেই নির্বাচন করলেন। তখন জিব্রাঈল আলাইহিস্ সালাম বললেন- اخترت أو أخذت الفطرة আপনি স্বভাবগত পানীয় নির্বাচন করলেন। ( )

উক্ত হাদিস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত হয় প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের মি’রাজ সশরীরে সম্পাদিত হয়েছে। কেননা খাদ্য ও পানীয় একমাত্র দেহের জন্যই প্রয়োজন, রূহের জন্য নয়।

৪. যাত্রার পূর্বে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে ঘুম থেকে জাগ্রত করা, شق صدر (বক্ষ বিদারণ) করা এবং হৃদয়কে নুর ও হিকমত দ্বারা পরিপূর্ণ করা ইত্যাদি সশরীরে ইসরা ও মি’রাজের প্রমাণ। কেননা বক্ষ দেহের অংশ, রূহের নয়। আর যদি নিদ্রিতাবস্থায় বা রূহানীভাবে হতো তাহলে জাগানোর প্রয়োজন ছিল না।

৫. তিনটি স্থানে প্রিয়নবীর যাত্রা বিরতি ও নামায আদায়: যাত্রা পথে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম أرض طيبة (মদিনা পাক) طور سيناء (সিনা পর্বত, যেখানে হযরত মূসা আলাইহিস্ সালাম আল্লাহ্ তা‘আলার সাথে কথোপকথন করার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন) এবং بيت لحم (হযরত ইসা আলাইহিস্ সালাম এর জন্ম স্থান ফিলিস্তিনের বেথেলহাম) এ যাত্রা বিরতি করেন এবং ঐ বরকতময় স্থানগুলোতে নামায আদায় করেন। সুতরাং যাত্রাবিরতি, নামাজ আদায় ও বরকত হাসিল করা দেহ ও মনন উভয়ের মাধ্যমে সম্পাদিত হয়। শুধুমাত্র রূহ দ্বারা নয়।

৬. অনুরূপভাবে বাইতুল মুকাদ্দাস শরীফে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের ইমামতিতে নামাজ সম্পন্ন করা সশরীরে মি’রাজ। কেননা নামাজ ও ইমামত দেহ ও রূহ উভয়ের কাজ। দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যতিরেকে নামাজ হয় না।

৭. আরবীতে معراج শব্দটি اسم اله বা যন্ত্র, হাতিয়ার, মেশিন ইত্যাদি বিষয়ক, আর معراج এর অর্থ হলো সিঁড়ি বা ঊর্ধ্বগমনের বাহন। জিবরাঈল আলাইহিস্ সালামের পক্ষ থেকে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের খেদমতে সিঁড়ি পেশ করা এবং رفرف (রফরফ) নামক বাহনে আরোহন করা, সশরীরে মি’রাজের প্রমাণবহ, কেননা বাহন দেহের জন্য অত্যাবশ্যক, রূহের জন্য নয়।

প্রিয় নবী ﷺ এর স্বশরীরে ইসরা ও মি’রাজ

৮. প্রতিটি আসমানের দ্বার প্রান্তে উপস্থিত হয়ে জিব্রাঈল আলাইহিস্ সালাম-আসমানের বিশেষ দরজা খুলতে বলা সশরীরে মি’রাজের প্রমাণ। কেননা দেহের জন্য এটা প্রয়োজন, রূহের জন্য নয়, রূহ সর্বদা মুক্ত।

৯. প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে অভ্যর্থনা: আসমানী জগতের ফেরেশতা ও পূর্ববর্তী নবী রাসূলগণ আলাইহিমুস্ সালাম-এর পক্ষ থেকে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে مرحبًا بالنبى الصالح (স্বাগতম হে মহান নবী, হে মহান রাসূল) مرحبًا بالابن الصالح (স্বাগতম হে প্রিয় বৎস) مرحبا بالاخ الصالح (স্বাগতম হে প্রিয়ভাই) ইত্যাদি বলে অভ্যর্থনা জানানো সশরীরে মি’রাজের প্রমাণ। কেনান নবী, রাসূল, ভাই, ছেলে ইত্যাদি শব্দ দেহ ও রূহ উভয়কে বুঝায়। শুধুমাত্র দেহকেও নয়, আবার শুধু রূহকেও নয়। ( )

১০.আল্লাহ্ তায়ালার সাথে প্রিয়নবীর সাক্ষাৎ, কথোপকথন, ৫০ (পঞ্চাশ) ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা, নামাজের ওয়াক্ত হ্রাস করণে হযরত মূসা আলাইহিস্ সালামের পরামর্শ, প্রিয়নবীর বারবার আসা-যাওয়া এবং ৫০ ওয়াক্তকে ৫ (পাঁচ) ওয়াক্তে কমিয়ে আনা ইত্যাদি প্রিয়নবীর সশরীরে মে’রাজের মাধ্যমেই সংঘঠিত হয়েছে। ( )

১১. কোরাঈশদের অস্বীকার ও হযরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর ‘সিদ্দিক’ উপাধি লাভ: প্রিয়নবীর সশরীরে ইসরা ও মি’রাজের সর্বোত্তম প্রমাণ হলো- প্রিয় নবী মি’রাজ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর এ ঘটনার বর্ণনা দিলেন। ঘটনার বিবরণ শুনে মক্কার কোরাঈশদের মধ্যে কেউ হাসাহাসি করে করতালি দিতে লাগল, আবার কেউ অবাক হয়ে মাথায় হাত মারতে লাগল ও পরস্পর পরস্পরের দিকে আশ্চর্যান্বিত হয়ে তাকিয়ে থাকল।

এদিকে দুর্বল প্রকৃতির ঈমানদারগণ এ ঘটনা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ল। সুতরাং তাদের কেউ কেউ প্রিয়নবীর কাছে বাইতুল মুকাদ্দাসের বিবরণ শুনতে চাইল এবং প্রিয়নবী তার হুবহু বর্ণনা পেশ করলেন। কিছুলোক হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু’র নিকট ঘটনার বর্ণনা দিল। আর হযরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু কোন ধরনের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছাড়াই দৃঢ় চিত্তে ঘোষণা দিলেন- لَئِنْ كَانَ قَالَ ذَلِكَ لَقَدْ صَدَقَ ، قَالُوا: وَتُصَدِّقُهُ ؟ قَالَ : نَعَمْ ، إِنِّي لأُصَدِّقُهُ بِمَا هُوَ أَبْعَدُ مِنْ ذَلِكَ : أُصَدِّقُهُ بِخَبَرِ السَّمَاءِ অর্থাৎ- ‘যদি তিনি তা বলে থাকেন তাহলে নিশ্চয় সত্য বলেছেন তারা বলল- তুমি তাঁকে একথায় বিশ্বাস করছো? তিনি বললেন- আমি প্রিয়নবীকে এর চেয়ে আরও দূরের বিষয়ে বিশ্বাস করি, আমি প্রিয়নবীকে দেয়া আসমানের সংবাদও বিশ্বাস করি।’’( ) এ দিন থেকে তিনিও ‘‘সিদ্দিকে আকবর’’ হিসেবে খ্যাতি লাভ করলেন। যদি প্রিয়নবী একথা বলতেন যে, আমি আজ রাতে স্বপ্নযোগে বা রূহানীভাবে বাইতুল মুকাদ্দাস প্রদক্ষিণ করেছি, তাহলে তা কেউ অস্বীকারতো দূরের কথা সন্দেহও করতো না। কেননা যদি কোন সাধারণ মানুষও একথা বলে যে, আমি স্বপ্নে দেখলাম কিয়ামত অনুষ্ঠিত হয়েছে। আমি বেহেশত, দোযখ, মিযান, পুলসিরাত, হাওযে কাউসার সবই দেখতে পেয়েছি…..,

আমি স্বপ্নে ইউরোপ, আমেরিকাসহ সারা বিশ্ব ভ্রমণ করেছি, আমার রূহ আসমান-জমীনের সর্বত্র ভ্রমণ করেছে……, তাহলে কি এটাকে কেউ অস্বীকার করতে পারে? মোটেই না অবশ্যই একমাত্র তখনই অস্বীকার করার সুযোগ থাকবে যখন সে দাবি করে এ সব আমি সশরীরে জাগ্রতাবস্থায় সম্পাদন করেছি। তাই কোরাইশদের অস্বীকার, হাসি-বিদ্রুপ ইত্যাদি প্রমাণ করে প্রিয়নবী সশরীরে ইসরা ও মি’রাজের কথাই ঘোষণা করেছিলেন, স্বপ্নে বা রূহানীভাবে নয়।

প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র সশরীরে মি’রাজ নিয়ে বিতর্ক ও তার অবসান:

আল্লামা ইবনে হিশাম তার রচিত ‘সিরাতে ইবনে হিশাম’ এ হযরত আয়েশা ছিদ্দিকা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ‘প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের দেহ মুবারক বিছানা থেকে পৃথক হয়নি বরং আল্লাহ্ তা‘আলা প্রিয়নবীকে রূহ যোগে ইসরা করিয়েছেন’ ( )

অনুরূপভাবে হযরত মুয়াবিয়াহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকেও একই ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়।

সন্দেহের অবসান: মুহাদ্দিসিনগণ তাঁদের এ বক্তব্যকে কয়েকভাবে খ-ন করেনঃ

প্রথমত.

এ বর্ণনাটি বিশুদ্ধ নয়, কারণ, সনদে ধারাবাহিকতা নেই, আর বর্ণনাকারীও মজহুল বা অপরিচিত, ইমাম ইবনে দেহ্য়া বলেন- হাদিস দু’টি জাল বা মাওদু’।

দ্বিতীয়ত.

হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহার বর্ণনা দর্শন সাপেক্ষে নয়, বরং তা তিনি কারও কাছ থেকে শুনেছেন। কেননা-

ক. ইসরা ও মি’রাজের সময়ে হযরত আয়েশা প্রিয়নবীর স্ত্রী হন নি; বরং হিজরতের পরেই প্রিয়নবী তাঁকে শাদী করেন।

খ. অনেক ঐতিহাসিক মি’রাজের সময়ে হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহার জন্ম হয়েছে কিনা তা নিয়েও সংশয় পোষণ করেন। তৃতীয়ত. অনুরূপভাবে হযরত মুয়াবিয়াহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু তখনও মুসলমান হননি। তিনি মক্কা বিজয়ের পরে ইসলাম গ্রহণ করেন। সুতরাং তাঁদের বর্ণনাদ্বয় এ ক্ষেত্রে কোন যথার্থ প্রমাণ বহন করে না।

মোটকথা:

প্রিয়নবীর এ ইসরা ও মি’রাজ জাগ্রতাবস্থায় সশরীরে হয়েছে। কেননা ইসরা ও মি’রাজ প্রিয়নবীর একটি অন্যতম মু’জিযা ও বিশেষ খুসুসিয়াত বা বৈশিষ্ট্য।

وصلى الله على سيدنا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين. والحمد لله رب العالمين

পোষ্টটি ভালো লেগে থাকলে আপনার মূল্যবান মতামত জানান প্লিজ!

Leave a Comment