প্রশ্নঃ ঈদে মিলাদুন্নবী [ﷺ]-এর মর্মার্থ, ও মর্যাদা, গুরুত্ব, ফজিলত পবিত্র ক্বোরআন করিম ও নির্ভরযোগ্য তাফসিরের বর্ণনার আলোকে আলোচনা করার অনুরোধ রইল। যেহেতু নবী বিদ্বেষী অনেকেই এ কথা বলে সরল প্রাণ মুসলমানদেরকে ধোঁকা দেয়ার অপচেষ্টা করে যে, ঈদে মিলাদুন্নবী বলতে কোন কিছু পবিত্র ক্বোরআন মজিদ ও নির্ভরযোগ্য তাফসির গ্রন্থে উল্লেখ নেই। ঈদে মিলাদুন্নবীর নামে যা কিছু করা হয় তা সম্পূর্ণ মনগড়া এবং পবিত্র ক্বোরআন শরীফে-এর কোন ভিত্তি নেই। সুতরাং এ বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণ বর্তমান প্রেক্ষাপটে জরুরি মনে করি।

পোষ্টটি অন্যকে পড়ার সুযোগ করে দিতে শেয়ার করুন প্লিজ।

মুহাম্মদ সৈয়দ আহমদ রেজা (প্রশ্নকারী)

মসজিদে রহমানিয়া গাউসিয়া, বায়েজিদ, চট্টগ্রাম।

✍🏻উত্তরঃ মাহে রবিউল আউয়াল শরীফে রাসূলে আক্রাম [ﷺ]-এর বেলাদত শরীফ ও শুভাগমনকে কেন্দ্র করে জশনে জুলুস (শোভাযাত্রা), আলোচনা, সেমিনার, খানাপিনা, সদকাহ-খায়রাত, দরূদ-সালাম, দু‘আ-মুনাজাতসহ জাঁক জমকপূর্ণ দ্বীনি অনুষ্ঠানসমূহের আয়োজনের মাধ্যমে প্রিয়নবীর শুভাগমনের ঘটনাবলী ও তাঁর জীবনাদর্শ আলোচনার মাধ্যমে সাধারণত: নূরুন্নবীর শুভাগন উদ্যাপনকে ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ বলা হয়। ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে নিঃসন্দেহে এটা ‘মুস্তাহাব’, ক্বোরআন-হাদীস সমর্থিত পুণ্যময় ইবাদত। সলফে সালেহীন ও বুযুর্গানে দ্বীনের সুন্নাত এবং উত্তম তরীকা। এ ব্যাপারে প্রতিটি যুগে বিশ্ব বরেণ্য ইমামগণ ইসলামী স্কলারগণ আরবী, উর্দু, ফার্সী, বাংলা সহ বিভিন্ন ভাষায় নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহ রচনা করেছেন।

এখানে ভণ্ড ও কুচক্রীদের ভণ্ডামী নিরসনে প্রিয় নবীর মিলাদুন্নবী [ﷺ] তথা শুভাগমনে খুশী উদযাপন করার বৈধতার উপর পবিত্র ক্বোরআনের কিছু প্রমাণাদি উল্লেখ করা হল-

□ এক. মানুষ যখন কোন নিয়ামত ও রহমতপ্রাপ্ত হয়, তখন আনন্দোৎসব করা যেমন স্বভাবজাত কাজ, তেমনি আল্লাহ্ তা‘আলার নির্দেশ। যেমন ইরশাদ হচ্ছে-

[ قُلْ بِفَضْلِ اللهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَالِكَ فَلْيْفْرَحُوْا هُوَ خَيْرٌمِمَّا يَجْمَعُوْنَ- ]

‘‘অর্থাৎ হে হাবীব! আপনি (বিশ্ববাসীকে) বলুন, আল্লাহরই অনুগ্রহ ও তাঁর দয়াকে স্মরণ করে সেটার উপর তারা যেন অবশ্যই আনন্দ প্রকাশ করে; তা তাদের সঞ্চয়কৃত সমস্ত ধন-সম্পদ অপেক্ষা অধিক শ্রেয়।’’[সূরা ইউনুস: আয়াত-৫৮]

উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী [رحمه الله عليه] ‘আদ্দুররুল মানসুর’ তাফসির গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ‘‘হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস [رضي الله عنه] এ আয়াতের তাফসিরে বলেন, এখানে ‘আল্লাহর অনুগ্রহ’ বলতে ইলমে দ্বীনকে বুঝানো হয়েছে আর ‘রহমাত’ দ্বারা বুঝানো হয়েছে আমাদের প্রিয়নবী নূরে মুজাচ্ছাম সরকারে দো‘আলম রহমাতুল্লালি আলামীন [ﷺ]’কে। যেমন আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন-

[ وَمَا اَرْسَلْنَاكَ اِلَّا رَحْمَةَ لِلْعَالَمِيْنَ- ]

‘‘অর্থাৎ হে হাবীব, আমিতো আপনাকে জগতসমূহের জন্য ‘রহমত’ রূপেই প্রেরণ করেছি।’’ [সূরা আম্বিয়া: আয়াত-১০৭]

ইমাম আলুসী ‘রূহুল মাআনী’ ১০ম খণ্ডের ১৪১ পৃৃষ্ঠায়, আবু সাঊদ তাঁর তাফসির গ্রন্থে আর ইমাম রাজী ‘তাফসিরে কাবীর’ গ্রন্থে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।

[ইমাম সুয়ূতী (رحمه الله عليه) কৃত, ‘তাফসসিরে আদ-দুররুল মানসুর’ ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৬৭।]

□ দুই. আল্লাহ্ পৃথিবীর বুকে হুযূর আকরাম [ﷺ]-এর আগমনকে মানবজাতির জন্য বড় ইহসান (দয়া) হিসেবে উল্লেখ করে এরশাদ করেন-

[ لَقَدْ مَنَّ اللهُ عَلَى الْمُؤْمِنِيْنَ اِذْ بَعَثَ فِيْهِمْ رَسُوْلًا مِنْ اَنْفُسِهِمْ يَتْلُوْ عَلَهْمِ اَيَاتِهِ وَيُزَكِّيْهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَة وَاِنْ كَانُوْا مِنْ قَبْلُ لَفِى ضَلَالٍ مُبِيْنٍ- ]

‘‘অর্থাৎ নিশ্চয়ই আল্লাহ্ মুমিনগণের উপর বড়ই ইহসান (অনুগ্রহ) করেছেন যে, তিনি তাদের মাঝে নিজেদের মধ্য হতে (মানব বংশে) তাদের কাছে একজন সম্মানিত রাসূল প্রেরণ করেছেন। যাতে তিনি তাদের নিকট আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করেন, তাদেরকে যাবতীয় পাপ ও গুনাহ এবং নাপাকী থেকে পবিত্র করেন এবং তাদেরকে ক্বোরআন হাদীসের শিক্ষা দান করেন। যদিও তারা তাঁর শুভাগমনের পূর্বে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে ছিল।’’ [সূরা আল ইমরান: আয়াত-১৬৪]

এ আয়াতে আল্লাহ্ তা‘আলা আমাদের প্রিয় রাসূলের শুভাগমনকে মুমিনের জন্য বিশেষ ‘অনুগ্রহ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সাধারণত পার্থিব নেয়ামত বা অনুগ্রহ লাভ করার দরুন যদি ঈদ বা খুশী করা যেতে পারে তবে, সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ অর্থাৎ মহান রাসূলের আগমনের মুহূর্তে, মাস, দিন, ক্ষণকে স্মরণ করে খুশী আনন্দোৎসব করা যে উত্তম কাজ, এতে সন্দেহের অবকাশ নেই। তদুপরি সূরা আল্ ইমরানের উপরিউক্ত আয়াতে করিমায় মহান রাব্বুল আলামীন রাসূলে দো‘জাহান [ﷺ]’র ধরাবুকে শুভাগমনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ব্যক্ত করেছেন। যা সরকারে দো‘আলম [ﷺ]-এর শুভাগমনের তথা মিলাদুন্নবীর মাহফিল সমূহে বর্ণিত হয়।

□ তিন. পবিত্র ক্বোরআনে আরো এরশাদ হচ্ছে-

[ وَمَا اَرْسَلْنَاكَ اِلَّا رَحْمَةَ لِّلْعَالَمِيْنَ- ]

‘‘অর্থাৎ হে হাবীব, আমিতো আপনাকে জগতসমূহের জন্য ‘রহমত’ রূপেই প্রেরণ করেছি।’’ [সূরা আম্বিয়া: ১০৭]

এই পবিত্র আয়াতে মহান আল্লাহ্ তা‘আলা প্রিয় নবীর ‘ইরসাল’ তথা পৃথিবীর বুকে তাঁকে পাঠানোর কথা এবং তিনি যে রহমাতুল্লিল আলামীন- তার সুস্পষ্ট বিবরণ তুলে ধরেছেন। এ আয়াতে করিমার ব্যাখ্যায় ইমাম ফখরুদ্দীন রাজী [رحمه الله عليه] বলেন-

‘‘তিনি (নবী করিম ﷺ) দ্বীন এবং দুনিয়া উভয় ক্ষেত্রে ‘রহমত’। দ্বীনের ব্যাপারে হুযূর রহমাতুল্লিল আলামীন [ﷺ] ‘রহমত’ হওয়ার কারণ/হেতু তাঁর শুভাগমন এমন সময় হয়েছিল যখন মানবজাতি জাহিলিয়াত ও গোমরাহীর মধ্যে নিমজ্জিত ছিল। তাঁর শুভাগমনে মানবজাতি দ্বীন ও ঈমান লাভে ধন্য হয়েছে। আর দুনিয়া বা পৃথিবীর জন্য তিনি ‘রহমত’ এজন্য যে, তাঁর আগমন ও পদার্পণের কারণে গোটা অশান্ত পৃথিবী শান্তির ছায়া লাভে ধন্য হয়েছে।’’

[ইমাম ফখরুদ্দীন রাজী কৃত- তাফসিরে কাবীর, খণ্ড-২২ ২৩০ পৃ.]

□ চার. মহান আল্লাহ্ এরশাদ করেছেন-

[ لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُوْلٌ مِنْ اَنْفُسِكُمْ عَزِيْزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيْصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِيْنَ رَؤُفٌ رَّحِيْم-]

অর্থাৎ নিশ্চয়ই তোমাদের কাছে তাশরীফ এনেছেন তোমাদের বংশ হতে এমন সম্মানিত রাসূল যাঁর কাছে তোমাদের কষ্টে পড়া বড়ই কষ্টদায়ক, তিনি তোমাদের কল্যাণ অতিমাত্রায় কামনাকারী, মুমিনদের জন্য পূর্ণ দয়ার্দ্র আর বড়ই দয়ালু। [সূরা তাওবা:১২৮]

এ আয়াতে পাকেও মহান আল্লাহ্ মক্কাবাসী তথা বিশ্ববাসীকে সম্বোধন করে রাসূলে আক্রাম [ﷺ] ভূমণ্ডলে আগমন করাকে তাঁর অনেক গুণাবলী ও মর্যাদা সহকারে বর্ণনা করেছেন। এ আয়াতে করিমার ব্যাখ্যায় ইমাম ফখরুদ্দীন রাজী [رحمه الله عليه] বলেন-

[ وارسله صلى الله عليه وسلم من هذه الحالات والصفات يكون من اعظم نعم الله عليكم —— وقال ابن عباس سمّاه الله تعالى باسمين من اسمائه اى رؤوف رحيم- (التفسير الكبير- ج ৮- صفه ২৩৬-২৩৭) ]

‘‘অর্থাৎ প্রিয় নবী আকা ও মাওলা সায়্যিদুল মুরসালীন [ﷺ]’কে এই সব অবস্থা ও গুণাবলী দ্বারা জগতে প্রেরণ করাটা তোমাদের জন্য আল্লাহর সর্বাপেক্ষা বড় নেয়ামত বা সর্বশ্রেষ্ঠ অনুগ্রহ।

উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত ইবনে আব্বাস [رضي الله عنه] বলেন, আল্লাহ্ তা‘আলা রাসূল [ﷺ]’কে আপন দু’টি নাম ‘রউফ’ প্রিয় দয়ার্দ্র ও রহীম (অসীম দয়ালু) দ্বারা নামকরণ করে নেহায়ত সম্মানিত করেছেন।’’

[ইমাম রাজী: কৃত ‘তাফসির কাবীর, ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৩৬-২৩৭]

□ পাঁচ. পরম করুণাময়ের এরশাদে আ‘লা-

[ يايها الناس قد جاءكم برهان من ربكم وانزلنا اليكم نورًا مبينا- ]

অর্থাৎ ‘হে বিশ্ববাসী নিশ্চয়ই তোমাদের নিকট তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে সুষ্পষ্ট প্রমাণ এসেছে এবং আমি তোমাদের প্রতি উজ্জ্বল আলো অবতীর্ণ করেছি।’ [সূরা নিসা: ১৭৪]

উক্ত আয়াতে করিমায় ‘বোরহান’ শব্দের ব্যাখ্যায় তাফসিরে কাবীর, তাফসিরে রূহুল বয়ান ও তাফসিরে জালালাঈন শরীফে বর্ণনা করা হয়েছে-

[ وهو النبى صلى الله عليه وسلم قدجائكم برهان من ربكم- ]

‘অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট বোরহান তথা অকাট্য প্রমাণ এসেছে। এখানে ‘বোরহান’ থেকে উদ্দেশ্য হুযূর আকরাম [ﷺ]।’ বিশ্বখ্যাত তাফসিরে বিশারদ ইমাম ফখরুদ্দীন রাজী [رحمه الله عليه] বলেন-

[ وانما سماه برهانا لان حرفة اقامة البرهان على تحقيق الحق وابطال الباطل- ]

‘‘অর্থাৎ উক্ত আয়াতে প্রিয় রাসূল [ﷺ]কে ‘বোরহান’ বলা হয়েছে। যেহেতু তাঁর দায়িত্ব হক্ব এবং ন্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করা এবং বাতিল ও অন্যায়কে খণ্ডন করার জন্য অকাট্য প্রমাণ পেশ করা।’’

[তাফসিরে কাবীর: সূরা নিসা; তাফসিরে জালালাঈন: হাশিয়া পৃষ্ঠা- ৯৩]

□ ছয়. আল্লাহ্ জাল্লাশানুহু এরশাদ করেন-

[ قدجائكم من الله نور وكتاب مبين- ]

অর্থাৎ ‘‘নিশ্চয় তোমার নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে মহান ‘নূর’ এসেছে এবং ‘সুস্পষ্ট কিতাব’। [সূরা মা-ইদাহ্: আয়াত-১৫]

তাফসিরে জালালাঈনের ৯৭ পৃষ্ঠায়; তাফসিরে কবীর ৩য় খণ্ডের ৩৯৫ পৃষ্ঠা; তাফসিরে খাজেন ১ম খণ্ডের ৪৪৭ পৃষ্ঠা; তাফসিরে আবু সাঊদ ৪র্থ খণ্ডের ৩৬ পৃষ্ঠা তাফসিরে বায়জাভী, তাফসিরে রূহুল মা’আনী, তাফসিরে রূহুল বয়ান, ২ খণ্ডে, ২৬৯ পৃষ্ঠা সহ সকল নির্ভরযোগ্য তাফসিরের ব্যাখ্যা মতে আয়াতে বর্ণিত, ‘নূর’ ও ‘বোরহান’ দ্বারা হুযূর পাক [ﷺ]কে বুঝানো হয়েছে। এসব আয়াত শরীফে সৃষ্টিকুল সর্দার হুযূরে আনওয়ার [ﷺ]-এর শুভাগমনকে অর্থাৎ তাঁর বরকতময় দুনিয়ায় তাশরীফ আনার বিবরণ রয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয় যে, প্রিয় নবীর বরকতময় ‘মিলাদ’ এর উৎস পবিত্র ক্বোরআন থেকেই প্রমাণিত।

□ সাত. সামান্য জাগতিক নেয়ামত লাভ করলেও তার জন্য ঈদ উৎসব করার সরাসরি উদাহরণ আল্ ক্বোরআনে দেখতে পাই যেমন এরশাদ হচ্ছে-

[ قاَلَ عِيْسَى ابن مَريَمَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا اَنزِل عَلَيْنَا مَائِدَةً مَن السَّمَاءِ تَكُوْنُ لَنَا عِيْدًا لِاَوَّلِنَا وَاَخِرِنَا وَاَيَةً مِنْكَ وَارزُقْنَا وَأنْتَ خَيْرُ الرَّازِقِيْنَ- ]

অর্থাৎ ‘‘ঈসা ইবনে মারয়াম [عليه السلام] বললেন, হে আল্লাহ্, আমাদের পালনকর্তা, আমাদের জন্য আকাশ থেকে খাদ্য ভর্তি খাঞ্চা অবতরণ করুন, যা আমাদের ও আমাদের পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সকলের জন্য হবে ঈদ তথা (আনন্দ উৎসব) প্রকাশের মাধ্যম আর আপনার তরফ থেকে অন্যতম নিদর্শন এবং আপনি জীবিকা দান করুন, আর আপনিই তো সর্বোত্তম জীবিকা দানকারী।’’ [সূরা মায়েদা: আয়াত-১১৪]

এ আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ্ তা‘আলার পক্ষ থেকে খাঞ্চা ভরা খাদ্য আসলে তা যদি হযরত ঈসা [عليه السلام]’র ভাষায় সৃষ্টির আদি হতে অন্ত পর্যন্ত সকলের জন্য আনন্দ-উৎসবের উসিলা ও আল্লাহর নিদর্শন হয়, তাহলে সৃষ্টির সর্বোত্তম সৃষ্টি, রহমতের ভাণ্ডার আমাদের আক্বা ও মাওলা রহমাতুল্লিল আলামীন [ﷺ]-এর মত মহান নেয়ামতের শুভাগমনের দিন-মাস কতই না মর্যাদাবান, গুরুত্ববহ ও আনন্দের দিন, যা বলার অপেক্ষা রাখে না।

□ আট. আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন-

[ واعتصموا بحبل الله جميعا ولاتفرقوا الاية- ]

অর্থাৎ এবং তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আকঁড়ে ধরো। আর পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়োনা এবং নিজেদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহকে স্মরণ করো, যখন তোমাদের মধ্যে শত্র“তা ছিল, তিনি তোমাদের অন্তরগুলোতে সম্প্রীতি সৃষ্টি করে দিয়েছেন। সুতরাং তাঁর অনুগ্রহক্রমে তোমরা পরস্পর ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গেছ এবং তোমরা দোযখের গর্তের প্রান্তে ছিলে তখন তিনি তোমাদেরকে তা থেকে রক্ষা করেছেন। আল্লাহ্ তোমাদের নিকট এভাবেই স্বীয় নিদর্শনাদি বর্ণনা করেন; যাতে তোমরা হিদায়ত প্রাপ্ত হও।’’[সূরা আল ইমরান: আয়াত-১০৩]

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম নাছিরুদ্দীন বায়জাভী [رحمه الله عليه] বলেন-

[ قيل كان الاوس والحزرج اخوين لا بوين فوقع بين اولادهم العدوا وتطاولت الحروب ما ئة وعشرين حتى اطفا الله بالاسلام والف بينهم رسوله صلى عليه واله سلم- ]

‘‘অর্থাৎ বর্ণিত আছে যে, ‘আউস’ ও ‘খাযরাজ’ উভয় গোত্র বৈমাত্রেয় ভাই সম্পর্কীয় গোত্র ছিল। তাদের উভয়ের সন্তানদের মধ্যে দুশমনি ও শত্র“তামী সৃষ্টি হল। এবং তাদের সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে একশ বিশ বছর যাবত দীর্ঘকাল যুদ্ধ অব্যাহত ছিল। সৃষ্টিকুল সর্দার হুযূর সায়্যিদুল মুরসালীনের আগমনে প্রিয় নবী [ﷺ] তাদের মধ্যে ঈমানের মাধ্যমে বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে দিয়েছেন এবং আল্লাহ্ ইসলামের মাধ্যমে তাদের মধ্যে যুদ্ধের আগুন নিভিয়ে দিয়েছেন।

[তাফসিরে বায়জাভী: সূরা আলে ইমরান- পৃষ্ঠা ৮৪]

পবিত্র ক্বোরআনের ‘নিয়া‘মাতুল্লাহ্’ এর তাফসির করতে গিয়ে বিশ্বখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম বুখারী [رحمه الله عليه] হযরত ইবনে আব্বাস [رضي الله عنه]’র সূত্রে বর্ণনা করেন- ‘হযরত ইবনে আব্বাস [رضي الله عنه] বলেন, ‘‘যারা আল্লাহ্’র নিয়ামতকে পরিবর্তন করেছে।’’ এ আয়াতের ব্যাখ্যা সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, ‘আল্লাহর নিয়ামত’ হলেন, সরওয়ার-এ দো‘জাহাঁ সায়্যিদুল মুরসালীন [ﷺ]। [সহীহ বুখারী শরীফ, ২য় খণ্ড, কিতাবুল মাগাযী, পৃষ্ঠা-৫৬৬]

□ নয়. আল্লাহ্ জাল্লানুহু এরশাদ করেন-

[ وَذَكرهُمْ بِأيَّامِ اللهِ اِنَّ فِى ذلك لاَيَاتِ لِكُلِّ صَبَّارِ شَكُوْر- ]

‘‘অর্থাৎ এবং তাদেরকে আল্লাহর দিবসসমূহ স্মরণ করিয়ে দিন, নিশ্চয়ই সেটার মধ্যে নিদর্শনাদি রয়েছে প্রত্যেক বড় ধৈর্যশীল, কৃতজ্ঞ বান্দাদের জন্য।’’ [সূরা ইবরাহীম: আয়াত-৫]

উপরিউক্ত আয়াতে করিমায় বিশেষ বিশেষ আল্লাহর নেয়ামত ও ঘটনাসমূহ অবতীর্ণের দিবসগুলোকে ‘আইয়্যামিল্লাহ’ তথা ‘আল্লাহর বিশেষ দিবস’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং উক্ত বিশেষ দিবসগুলোকে বিশেষভাগে স্মরণ করার জন্য আদেশ প্রদান করা হয়েছে। উল্লেখ্য, এ ধরাবুকে প্রিয়নবী রহমাতুল্লিল আলামীন [ﷺ]-এর শুভাগমনের দিবসের চেয়ে সর্বোত্তম বিশেষ পুণ্যময় দিবস আর কোনটি হতে পারে? যেমন- ‘আল্ হাবী লিল্ ফাতাওয়া’য় ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী [رحمه الله عليه] উল্লেখ করেন-

[ واى نعمة اعظم من بروز هذا النبى نبى الرحمة الخ-]

রহমাতুল্লিল আলামীন নবীয়ে দো’জাহাঁ [ﷺ] পৃথিবীর বুকে আগমন করার চেয়ে অন্য কোন্ নেয়ামত সর্বোত্তম অনুগ্রহ বা নেয়ামত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে? অর্থাৎ কখনো হতে পারে না।

এ ধরনের আরো বহু আয়াতে করিমায় পরম করুণাময় আল্লাহ্ তা‘আলা সরকারে দো’আলম [ﷺ]-এর মিলাদ তথা পৃথিবীর বুকে তাঁর শুভাগমন তাঁর অসংখ্য গুণাবলী ও আল্লাহ্ প্রদত্ত শান-মানসহ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। মুসলিম-আশেকে রাসূল পাঠকগণের অবগতি এবং বিভ্রান্তিকারীদের বিভ্রান্তির নিসরনের জন্য কয়েকটি আয়াতে করিমা ব্যাখ্যা সহ উল্লেখ করা হয়েছে মাত্র।

উপরিউক্ত আয়াতে করিমার আলোকে সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, ধরাবুকে প্রিয় নবী [ﷺ]-এর শুভাগমন মহান আল্লাহর এক মহান, সর্বোত্তম নেয়ামত ও সর্বশ্রেষ্ঠ অনুগ্রহ।

উক্ত মহান অনুগ্রহকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করার জন্য নূরুন্নবী [ﷺ]-এর স্মরণে মিলাদ, মাহফিল, জসনে জুলুসের মাধ্যমে প্রিয় নবী [ﷺ]-এর শুভাগমনের মাস, দিন, মুহূর্তকে স্মরণ করা ইসলামী ঐতিহ্য, ধর্মীয় সংস্কৃতি, যুগ যুগ ধরে চলে আসা সলফে-সালেহীন ও বুযুর্গানে দ্বীনের প্রচলিত নীতি। যা বিশ্বেবরেণ্য ফোকাহায়ে কেরামের দৃষ্টিতে ‘মুস্তাহাব’ ও অনেক সাওয়াবজনক ইবাদত এবং পবিত্র ক্বোরআনের অসংখ্য আয়াতের উপর বাস্তব আমল। সর্বোপরি সুন্নাতে মালা-ইকাহ্ ও সুন্নাতে ইলাহী। যেহেতু মহান প্রভু প্রিয় রাসূল [ﷺ] ধরাবুকে আগমনের অনেক অনেক পূর্বে আলমে আরওয়াহ্ তথা উর্ধ্ব ও আত্মা জগতে সম্মানিত নবীগণের আত্মাসমূহকে একত্রিত করত ধরাবুকে সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূলের শুভাগমনের ঘটনা উল্লেখ পূর্বক সকল নবী-রাসূলের রূহ মোবারকসমূহের সামনে আমাদের প্রিয় নবী [ﷺ]’র শ্রেষ্ঠত্ব, শান-মান ও বিশাল মর্যাদার কথা তুলে ধরেছেন, যা পবিত্র কোরআনে করিম দ্বারা প্রমাণিত। সুতরাং ঈদে মিলাদুন্নবী [ﷺ]’কে অস্বীকার করা চরম গোমরাহী। পরম করুণাময় সকল ঈমানদারকে যথাযথ মর্যাদা ও ভক্তি-শ্রদ্ধা সহকারে মিলাদুন্নবী [ﷺ] অনুষ্ঠান সমূহ পবিত্র পরিবেশে আদায় করার তাওফিক দান করুন। আ-মী-ন।

।।।

মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ অছিয়র রহমান আলকাদেরী

প্রধান ফকিহ্-জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া, চট্টগ্রাম।

মাসিক তরজুমান-Monthly Tarjuman (প্রশ্ন-উত্তর বিভাগ)

প্রকাশনায় : আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট

৩২১ দিদার মার্কেট, দেওয়ান বাজার, চট্টগ্রাম।

পোষ্টটি ভালো লেগে থাকলে আপনার মূল্যবান মতামত জানান প্লিজ!

Leave a Comment