গবেষণা: আরাফা দিবসের রোযা নিয়ে সন্দেহের নিরসনঃ সাউদী আরব ও বাংলাদেশের দুই দিনের হিসাবেই দুইটি রোযা যাবে

পোষ্টটি অন্যকে পড়ার সুযোগ করে দিতে শেয়ার করুন প্লিজ।

ড. এ. এস. এম. ইউসুফ জিলানী
…………………………………..
প্রথমে জেনে নিই ইয়াওমে আরফাহ বলতে কী বোঝায়? এটা বুঝতে পারলে সমস্যার সমধান সহজ হয়ে যায়। আরাফাহ দিবস দ্বারা ৯ ই জিলহজ্ব উদ্দেশ্য। অর্থাৎ এই দিনটি। এটি একটি পারিভাষিক নাম, যেহেতু ৯ ই জিলহজ্বে আরাফাহতে অবস্থান করা হয়, তাই এই দিনটিকে আরাফাহ দিবস বলা হয়। একইভাবে দশই জিলহজ্ব যেহেতু কুরবানি দেয়া হয়, তাই একে ‘ইয়াওমুন নাহর’ বলা হয়। উদ্দেশ্য, ১০ ই যিলহজ্ব। সুতরাং যে অঞ্চলে যেদিন যিলহজ্ব এর দশ তারিখ হবে, সে অঞ্চলে সেদিনই কুরবানি হবে। একইভাবে, যে অঞ্চলে যিল হজ্বের ৯ তারিখ যেদিন হবে, সেদিনই রোজা রাখতে হবে।
এখানে একটা বিষয় স্পষ্ট বোঝা উচিত, ৯ই যিলহজ্ব রোজা রাখা হাজীদের সাথে সম্পৃক্ত কোন আমল না। অর্থাৎ, এই আমল বরং যারা হাজী না, তাদের জন্যে। কারণ হাজীদের জন্যে এই দিনে রোজা রাখা অনুত্তম, কোন কোন তাবেয়ী তো হারামও বলেছেন। সুতরাং যেহেতু এটা হাজ্বীদের আমল নয়, সুতরাং হাজ্বীদের আমলের সাথে মিলিয়ে আমাদের ‘ইয়াওমে আরাফাহ’ নির্দিষ্ট করা ভুল পদ্ধতি।
রাসূল সা. কি আরাফাহ দিবসে রোজা রাখতেন?
হাদিসে বিভিন্ন শব্দে আরাফাহ দিবসে রোজার কথা আছে। মূলত ‘আরাফাহ দিবস’ এই শব্দটির কারণেই কেউ কেউ মনে করছেন, আমাদের আরাফাহর হাজীদের সাথে মিলিয়ে রোজা রাখতে হবে। যদি এই শব্দের জায়গায় “৯ ই জিলহজ” থাকত তবে কোন ভিন্নমতের সুযোগ থাকে না।
এবার আমরা দেখতে পাই, বিভিন্ন হাদিসে ‘৯ ই যিলহজ্ব’ শব্দটি এসেছে। সেখানে ‘ইয়াওমে আরফাহ’ শব্দটিই নেই। যেমন,
১. আবু দাউদ এর হাদিস,
عَنْ بَعْضِ، أَزْوَاجِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَتْ: «كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُومُ تِسْعَ ذِي الْحِجَّةِ، وَيَوْمَ عَاشُورَاءَ، وَثَلَاثَةَ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ، أَوَّلَ اثْنَيْنِ مِنَ الشَّهْرِ وَالْخَمِيسَ»
রাসূল সা. এর কতক স্ত্রী, উম্মাহাতুল মুমিনীন থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. ‘৯ ই যিলহজ্ব’ রোজা রাখতেন। [মুসনাদে আহমদ- ২২৬৯০, আবু দাউদ- ২৪৩৭, নাসায়ী- ২৩৭২,]
২. এছাড়াও প্রায় সকল ফকীহ, মুহাদ্দিস তাদের কিতাবে লিখেছেন ‘ইয়াওমে আরাফাহ’ দ্বারা উদ্দেশ্য ৯ তারিখ। এখানে কেবল হাম্বলী মাজহাবের শীর্ষ ফকীহ ইবনে কুদামা রহ. এর লেখা উল্লেখ করছি।
قال ابن قدامة في ” المغني ” ( 4 / 442 ) : ” فأما يوم عرفة : فهو اليوم التاسع من ذي الحجة ، سمي بذلك لأن الوقوف بعرفة فيه
ইবনে কুদামা বলেন, ইয়াওমে আরাফাহ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, যিলহজ এর নবম দিন। এইদিনকে ‘ইয়াওমে আরাফাহ’ শব্দে নামকরণ করা হয়েছে কারণ আরাফাতে এইদিনে উকুফ করা হয়। [আল-মুগনী, 4: 442]
স্পষ্টত বোঝা যাচ্ছে, ‘ইয়াওমে আরাফাহ’ একটা টার্ম, পরিভাষা মাত্র। উদ্দেশ্য ৯ তারিখ। সেটা যে অঞ্চলের ৯ তারিখই হোক, তাকেও পরিভাষা হিসেবে ‘ইয়াওমে আরাফাহ’ বলা হবে। [এছাড়া আরো দেখুন, তাবারী ২/২৯৭, বাহরুল মুহীত, ২/২৭৫, লিসানুল আরব, ৪/২৮৯৮]
৩. এ প্রয়োগের (ইয়াওমে আরাফা অর্থ ৯ই যিলহজ্ব) আরেকটি দৃষ্টান্ত ‘তাকবীরে তাশরীক’। এটি আরাফা বা উকুফে আরাফার বিশেষ আমল নয়। এটি শুরু হয় নয় যিলহজ্ব ফজর থেকে, অথচ যে দলীল দ্বারা নয় তারিখ থেকে তাকবীরে তাশরীক শুরু হওয়া প্রমাণিত তাতেও কিন্তু ‘ইয়াওমে আরাফা’ শব্দটাই এসেছে।
عن علي رضي الله عنه : أنه كان يكبر بعد صلاة الفجر يوم عرفة، إلى صلاة العصر من آخر أيام التشريق، ويكبر بعد العصر رواه ابن أبي شيبة في مصنفه وإسناده صحيح كما في الدراية ..
[আলমুসান্নাফ, ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ৫৬৭৭, ৫৬৭৮]
এখানে সবাই একমত যে ৯ তারিখ উদ্দেশ্য। সেটা যার যার অঞ্চলের ৯ তারিখ। এখানে যদি ‘ইয়াওমে আরাফা’ অর্থ নয় যিলহজ্ব করা হয়, তাহলে রোজা রাখার ক্ষেত্রে কেন ভিন্ন ব্যাখ্যা করা হবে?
৪. গোটা মুসলিম উম্মাহর ইজমা আছে যে, ইয়াওমে আরাফার পরের দিনটিই ইয়াওমুন নাহর। অর্থাৎ কুরবানির দিন।
এটি প্রমাণ করে, ‘ইয়াওমে আরাফা’ একটি তারিখের নাম, আর তা হচ্ছে নয় যিলহজ্ব, যেমন ‘ইয়াওমুন নাহর’ একটি তারিখের নাম, আর তা হচ্ছে দশ যিলহজ্ব।
যদি ভিন্নমতটা ধরে নিয়ে, বলা হয়, আমাদের দেশের ৮ তারিখই ‘ইয়াওমে আরফাহ’। তাহলে পরেরদিন ৯ তারিখে আমাদের এখানে কুরবানি করতে হবে। কারণ আরাফাহর পরদিনই কুরবানি অর্থাৎ ‘ইয়াওমুন নাহর’!
আর যদি বলা হয়, পরদিন কুরবানি নয়, বরং একদিন পর ১০ তারিখে কুরবানি করা হবে। তাহলে ৮ তারিখের ‘ইয়াওমে আরাফাহ ও ১০ তারিখের ইয়াওমে নাহর’ এর মাঝে আরেকটা নতুন দিনের প্রবর্তন করতে হয়, যা ইজমাবিরোধী এবং হাস্যকর। কারণ ইয়াওমে আরাফহর পরদিনই ইয়ামুন নহর।
৫. ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) তার যামানার একটা ঘটনা উল্লেখ করেছেন, একবার কেও খবর দিল আরাফাহর দিন সৌদিতে ছিল সোমবার, অথচ কায়রোতে সবাই রবিবার রোজা রেখেছে। বাদশাহ রাগান্বিত হলেন এই ভেবে যে, যারা চাঁদ দেখেছে তারা ভুল তথ্য দিয়েছে। ঠিকভাবে চাঁদ দেখে নাই।
فعرفه بعض الناس أن ذلك يقع كثيراً بسبب اختلاف المطالع
অত:পর বাদশাহকে বোঝানো হলো, ‘উদয়াস্থলের ভিন্নতার’ কারণে এমনটা প্রচুর ঘটে। অর্থাৎ, অঞ্চলভেদে চাদের ভিন্নতায় আরাফাহর দিবসও ভিন্ন হতে পারে।
দেখুন, এই ডিজিটাল যুগের পূর্বে দেড় হাজার বছর সাহাবা, তাবেয়ী যারা মক্কা মদীনা থেকে যোজন যোজন দূরে বাস করতেন, তাদের কর্মপদ্ধতি কী ছিল? তারা কি নিজেদের অঞ্চলের চাঁদ দেখে ৯ তারিখে রোজা রাখতেন? নাকি আরাফাহর সাথে মিলিয়ে? যেহেতু যোগাযোগব্যবস্থা বর্তমানের মত ছিল না, তাই ধরে নেয়া যায় সে সময়ে তারা নিজ অঞ্চলের চাঁদ দেখে সে অনুযায়ী আরাফাহর রোজা রাখতেন। স্বভাবতই প্রশ্ন আসে, তাহলে এই দেড় হাজার বছর যারা ভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের চাঁদ দেখে রোজা রাখলেন, তারা আদৌ আরাফাহর সওয়াব পেয়েছেন তো? যদি সৌদির সাথে মিলে না থাকে?
যদি উত্তর হয়, তারা সঠিক ছিলেন। তাহলে আমাদের কর্মপদ্ধতি সালাফের মতই হওয়া উচিত।
৬. সালাফী উলামাদের অনেকেই মত ব্যক্ত করেছেন যে, আরাফার রোজা যার যার অঞ্চলের যে দিন ৯ তারিখ হবে, সেদিনই রাখতে হবে। সৌদির সাথে মিলিয়ে রাখবে না। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন,

  • শায়খ সালেহ আল উসামিন,
  • শায়খ সালেহ আল মুনাজ্জিদ
  • শায়েখ আব্দুল্লাহ বিন জিবরীন
  • ড. হানী বিন আব্দুল্লাহ আল জুবাইর
  • ড. আহমদ আলহাজ্জী
  • পাকিস্তান এর আহলে হাদিস আলেম, শায়খ আবু যায়েদ
  • শাইখ মাকবুল আহমেদ আস সালাফী প্রমুখ।
    এছাড়াও, islamqa ও islamweb এর ফতোয়া মতেও, যার যার অঞ্চল অনুযায়ী ৯ তারিখে রোজা রাখবেন।
    আবার অন্য আলেমদের মতে, হাদীসে আরাফার রোজার কথা এসেছে, জিলহজ্ব মাসের নয় তারিখের কথা আসেনি। তাই কিছু আলেম সাউদী আরবে হাজীরা যেইদিনে আরাফার মাঠে অবস্থান করবেন, সেই দিনেই এ রোজা রাখা উচিত বলে মত প্রকাশ করেছেন। কারণ, আরাফাহ ছাড়া অন্য কোন রোজা স্থানের সাথে সম্পৃক্ত নয়।
    উপরের দালিল-প্রমাণগুলো থেকে প্রমাণিত হয়, নিজ নিজ দেশের ৯ জিলহজ হচ্ছে আরাফার দিন, এটাই সঠিক এবং যুক্তিযুক্ত মত। কারণ আমরা বাংলাদেশে আছি বলে যেদিন হাজীরা আরাফার মাঠে সমবেত হচ্ছেন, ঠিক ঐ দিনই রোজা রাখতে পারব। কিন্তু আমেরিকা এবং ইউরোপ সহ পশ্চিমের অধিকাংশ দেশে তখন রাত। আর আমরা জানি, রাতে রোজা রাখার কোন সুযোগ নেই। আর ইসলামে এমন কোন বিধান নেই, যেটা পূর্বের বাসিন্দারা করতে পারবেন, কিন্তু পশ্চিমের বাসিন্দারা পারবেন না।
    আবার যদি কেউ মতবিরোধের মাঝে না গিয়ে সউদী আরব ও বাংলাদেশের দুই দিনের হিসাবেই দুইটি রোযা রাখে এতে কোন ক্ষতি নেই, বরং যিলহজ্জ মাসের ১ থেকে ৯ তারিখ পর্যন্ত সবগুলো দিনেই রোজা রাখতে পারেন, এটা সুন্নাত এবং অনেক সওয়াবের ইবাদত। এর দ্বারা উভয় মতের উপর আমল করা যয়। (পুনঃ পোস্ট, পূর্বে প্রকাশিত)
পোষ্টটি ভালো লেগে থাকলে আপনার মূল্যবান মতামত জানান প্লিজ!

Leave a Comment