আকিদায়ে খতমে নবুয়ত ও কাসেম নানতুবি ( ৩য় পর্ব)

পোষ্টটি অন্যকে পড়ার সুযোগ করে দিতে শেয়ার করুন প্লিজ।

আকিদায়ে খতমে নবুয়ত ও কাসেম নানতুবি ( ৩য় পর্ব)

খাতামুন্নবীয়্যিন অর্থ কেবল সর্বশেষ নবী- যে এ অর্থ ভিন্ন অন্য অর্থ করবে সে কাফির, তাকে হত্যা করতে হবে

……………………….

ড. এ. এস. এম. ইউসুফ জিলানী

…………………………..

কুরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণা, তাফসীরের গ্রন্থসমূহ, শত শত হাদিস, আরবি অভিধান ও উম্মতের ইজমা মতে, কুরআনের করীমের আয়াত خَاتَمَ النَّبِيِّينَ (খাতামুন্নবীয়্যিন) অর্থ: সর্বশেষ নবী, তার যুগ সর্বশেষ যুগ-এ অর্থ ছাড়া অন্য কোন অর্থ গ্রহণযোগ্য নয়, কোন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ও ভিন্নমত প্রকাশ করা চলবে না, যে এ অর্থ ভিন্ন অন্য অর্থ করবে সে কাফির, আর এর উপর অটল থাকলে তাকে হত্যা করতে হবে। এটাই উম্মতের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত। এমনকি দেওবন্দের শীর্ষ ওলামায়ে কেরামও এ ব্যাপারে একমত।

ইমাম কাযী আয়ায বলেন:

واجمعت الامة علي حمل هذا الكلام علي ظاهره وان مفهومه المراد به دون تاويل لا تخصيص فلا شك في كفر هؤلاء الطوائف كلها قطعا اجماعا وسمعا

সমস্ত উম্মত একমত হয়েছেন যে, উপরিউক্ত আয়াতকে বাহ্যিক অবস্থার উপর রাখতে হবে এবং কোন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ও ভিন্নমত প্রকাশ করা চলবে না। অতএব, উপরিউক্ত দলগুলোর কুফরীতে কোন সন্দেহ নেই। বরং ঐকমত্য এবং বর্ণনার দ্বারা তা অকাট্যভাবে প্রমাণিত। [শেফা রেরেলী থেকে মুদ্রিত: ৩৬২]

হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালীকে ইলমে জাহের ও বাতের স্বর্বজনস্বীকৃত ইমাম হিসাবে গণ্য করা হয়। তিনি কুরআনের বাণী …ওয়াখাতামুন নবীয়্যিনের ব্যাখ্যায় এমন বিষয় উল্লেখ করেছেন, যাতে কাসেমী ফিতনার দ্বারা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে।

ইমাম গাজ্জালীর এ বক্তব্য উল্লেখ করেছেন দেওবন্দীদের মুফতিয়ে আজম শফী সাহেব। তিনি তার খতমে নবুয়ত কিতাবে ইমাম গাজ্জালীর এ বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। ইমাম গাজজালী লিখেছেন:

هذا اللفظ انه افهم عدم نبي بعده ان الامة قد فهمت من بدا و عدم رسول بعده ابدا وانه ليس فيه تاويل ولا تخصيص ولا مخصوص فكلامه من انواع الهذ بان لا يمنع الحكم بتكيره لاله مكذب لهذا النص الذي اجمعت الامة على اله غير ماول (كتاب الاقتصاد بالامام الغزالي)

এটা সম্মরণ রাখা উচিত যে, সমস্ত উম্মতে মুহাম্মদী খাতামুন নবীয়্যিন দ্বারা এটাই বুঝতে পেরেছেন যে, আমাদের প্রিয় নবী এর পর কোন নবী বা রাসূল আসবেন না এবং এ বিষয়ে ইজমা ও ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, উপরিউক্ত আয়াতের ভিন্নতর ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণের অবকাশ নেই। যে ব্যক্তি এ আয়াতে কোন প্রকার বিশেষত্বের সাথে ভিন্নতর কোন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে তার সমস্ত কথা নিরর্থক। এর ফলে তার উপর কুফরীর ফতোয়া থেকে কেউ তাকে বাঁচাতে পারবে না। কেননা, তিনি এ প্রকাশ্য আয়াতের মিথ্যা ব্যাখ্যা দিয়েছেন। অথচ এ বিষয়ে উম্মতে মুহাম্মদী ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, এতে ভিন্নতর কোন ব্যাখ্যা দেওয়ার কোন অবকাশ নেই। [মুফতি শফী, খতমে নবুয়ত: ১১৩]

দেওবন্দিরে মুফতিয়ে আজম, মুফতি শফী সাহেব লিখেছেন:

اجتمعت عليه الأمة فيكفر مدعي خلافه ويقتل ان اصر-

উম্মত খাতেমের এ অর্থের উপর ইজমা (ঐকমত্য পোষণ) করেছেন। এর বিপরীত দাবি কারী কাফের, যদি এ কথার উপর অটল থাকে তাহলে তাকে হত্যা করা হবে। [হেদায়াতুল মাহদিয়্যিন, ২১।]

সার কথা

সার কথায় দেওবন্দের আরেক বড় আলেম মাওলানা ইদরিস কান্দলভী তার খতমে নুবয়ত কিতাবে লিখেছেন:

مَّا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّن رِّجَالِكُمْ وَلَٰكِن رَّسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ ۗ وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا ﴾

মুহাম্মদ তোমাদের কোন পুরুষের কোন পুরুষের পিতা নন। কিন্তু তিনি আল্লাহর রাসূল এবং সর্বশেষ নবী। [সূরা আহযাব (৩৩): ৪০।]

এখানে খাতামুন নাবিয়্যিন (خَاتَمَ النَّبِيِّينَ) এর অর্থ শেষ নবী। যে নবীর উপর এ আয়াত নাযিল হয়েছে, তিনি এ আয়াতের এ অর্থই বুঝেছেন এবং বুঝিয়েছেন। যে সকল সাহাবী নবী থেকে কুরআন ও তাফসির পড়েছেন তারাও এ অর্থই বুঝেছেন। এখন-

فَمَن شَاءَ فَلْيُؤْمِن وَمَن شَاءَ فَلْيَكْفُرْ

যার মন চায় সে মানবে আর যার মান চায় সে কুফরী করবে। [সূরা কাহাফ (১৮): ২৯।]

হক তো আলোকিত দিনের মত পরিস্কার। ইসলামের মধ্যে কোন ধরণের সংশয়ের গুনজায়েশ নেই। এর মধ্যে কোন ধরণের সন্দেহের সুযোগ ও অবকাশ নেই। তার পরেও যদি কারো মনে কোন সন্দেহ থাকে, তা হলে আমি তো সে কথাই বলবো, যা হযরতুল উস্তায আল্লামা সাইয়্যেদ মুহাম্মদ আনোয়ার শাহ কাশ্মিরি (আল্লাহ তায়ালা কেয়ামতের দিন তার চেহারাকে উজ্জ্বল সজীব করুন। আমীন) তাঁর ফার্সি রিসালা খাতামুন নাবিয়্যিনে লিখেছেন:

“এসব বদনসিব ও হতভাগা লোকদের অবস্থা দেখে মনে হয়, যদি আল্লাহ তায়ালাও কসম করে বলেন, খাতামুন নাবিয়্যিন -শেষ নবী দ্বারা আমার উদ্দেশ্য মুহাম্মদ। তার পরে কোন নবী পাঠাবো না। তা হলেও এ সব মাহরুম ও দুর্গাভাগারা জবাবে বলবে, হ্যাঁ, হ্যাঁ, খাতামুন নবিয়্যিন শব্দ তো ঠিকই আছে। কিন্তু আপনার উদ্দেশ্য হলো, নবুয়তের এ ধারাবাহিকতা অমুকভাবে জারি ও অব্যাহত রাখবেন।” [আনোয়ার শাহ কাশ্মিরি খাতামুন নাবিয়্যিন: ৬৪, মাওলানা মুহাম্মদ ইদরিস কান্ধলভী, খতমে নবুয়ত (বাংলা অনুবাদ, রাহনুমা প্রকাশনি): ৬১]

উক্ত আয়াতের ভিন্নতর ব্যাখ্যাদানকারীকে হত্যা করা হয়েছে

ইমাম শাতেবী ফাযাযী নামক এক ব্যক্তির ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, সে নবুয়তের দাবি করে এবং এমন অনেক ঘটনা প্রদর্শন করে যা কারামত ও অলৌকিক বলে মনে করা হয়। সর্বযুগেই জনসাধারণ আশ্চর্য অলৌকিক বস্তুর পূজা করে থাকে। এ সময় একদল লোক তার দলভুক্ত হয়ে যায়। এরা কুরআন অনুসরে দাবি করে। তাই তারা আয়াতে খাতামুন নবীয়্যিন-এর মাঝে এরূপ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ শুরু করেম যার ফলে আমাদের প্রিয় নবীর পর কোন নবী আগমনের অবকাশ থাকে। কিন্তু সে যুগের ওলামায়ে কেরাম সর্বসম্মতভাবে এ দাবি এবং ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ সব কিছুই কুফরী ও নাস্তিকতা বলে ঘোষণা করেন। তাই সে যুগের সর্বজনশ্রদ্ধেয় ইমাম শায়খুল মাশায়েখ আবু জাফর ইবনে যুবায়ের র. এর ফতোয়ার ভিত্তিতে তাকে হত্যা করা হয়েছে। [শাতিবি, ২: ২৬৩]

উপরিউক্ত ঘটনা বিষয়টির চুড়ান্ত মীমাংস করে দিয়েছে। এ থেকে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়েছে যে, এ উম্মতের ওলামায়ে কেরাম উপরিউক্ত আয়াতে কোন প্রকার ভিন্নতর ব্যাখ্যাবিশ্লেষণ ব্যতিক্রম প্রদশন করাকে কুফর ও নাস্তিকতা বলে ঘোষণা করেছেন এবং এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র মত পার্থক্য নেই।

চলবে—

১০/ ০৯/ ২০২৩ ইং

পোষ্টটি ভালো লেগে থাকলে আপনার মূল্যবান মতামত জানান প্লিজ!

Leave a Comment